ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সরকারি পরিষেবায় কাটছাঁটের প্রতিবাদে নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। একই সঙ্গে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক অস্থিরতা নিয়ে বিদেশি নেতাদের মন্তব্যকে ‘বোকামিপূর্ণ’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে সমালোচনা করেছেন তিনি।
গত সপ্তাহান্তে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ নগর সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ১৭ অক্টোবরের ওই অস্থিরতায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর পর থেকেই নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার।
বুধবার, ২১ অক্টোবর কাতার সফরের সময় ম্যাক্রোঁ বলেন, আগামী শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, তাদের তা করতে দেওয়া হবে না। সংকট মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করার কথাও জানান তিনি।
শনিবার নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউএনইএফ। একই দিনে রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রে মিছিল করার পরিকল্পনা জানিয়েছে ২০১৮ সালে আত্মপ্রকাশ করা সরকারবিরোধী আন্দোলন ‘ইয়েলো ভেস্টস’ গোষ্ঠী। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ থেকে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন অতীতেও ফরাসি সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
বিদেশি নেতাদের বক্তব্য নিয়ে ক্ষুব্ধ ম্যাক্রোঁ

ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে কয়েকজন বিদেশি নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করে ম্যাক্রোঁ অভিযোগ করেন, ঘটনাগুলো সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তাঁর মতে, কিছু বিদেশি রাজনীতিক ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চাইছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশেষভাবে অভিবাসী ও উগ্র ইসলামপন্থীদের দায়ী করে ফ্রান্সের অস্থিরতাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে মন্তব্য করেছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ম্যাক্রোঁ বলেন, “তাঁদের মধ্যে অন্যরাও রয়েছেন।” বিদেশি নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অস্থিরতার পর বিদেশি অপতথ্য ছড়িয়েছে এবং অনেকের মন্তব্য ছিল একই সঙ্গে অগ্রহণযোগ্য ও বোকামিপূর্ণ।
আলোচনা ব্যর্থ, ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের প্রস্তুতি
বিক্ষোভের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে অসন্তোষ কাজ করছে। শ্রমিক ও তরুণদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংকট প্রশমনে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তবে আলোচনায় কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, মজুরি বৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবা রক্ষার দাবিতে সরকার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সিজিটি-এর প্রধান সোফি বেনে বলেন, তাঁদের দাবিগুলো বিবেচনায় নেওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি। তিনি আন্দোলন আরও জোরদার করার আহ্বান জানান এবং নিশ্চিত করেন, আগামী ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হবে।
সরকারের জন্য এটি নতুন চাপ তৈরি করছে। একদিকে রাজপথের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট ও জনঅসন্তোষ সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে প্রশাসনকে।
নিরাপত্তা জোরদার, গ্রেপ্তার প্রায় আড়াই হাজার
শনিবারের সম্ভাব্য বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা। আগের দফার অস্থিরতা মোকাবিলায় ঘাটতি ছিল বলে স্বীকার করার পর এবার অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সেনাসদস্যদেরও দায়িত্ব পালনের জন্য মোতায়েন করা হতে পারে।
বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ বুধবার জানান, ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের পর প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯১৭ জনের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং ১৭৪ জনকে ইতিমধ্যে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, অস্থিরতায় আক্রান্ত এলাকাগুলোতে টানা দ্বিতীয় রাতের স্থানীয় কারফিউ বড় ধরনের ঘটনা ছাড়াই পার হয়েছে। এতে সরকার কিছুটা স্বস্তি পেলেও আসন্ন বিক্ষোভ নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে
আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ফ্রান্সের অস্থিরতা রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। জনমত জরিপগুলোতে কট্টর ডানপন্থী ও কট্টর বামপন্থী প্রার্থীদের সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে আসছে।

কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরিন ল্য পেন ফ্রান্সের একটি রেডিওকে বলেন, সরকার সবকিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। অন্যদিকে, কট্টর বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবোডের সদস্যরা রাজপথে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বিক্ষোভকারীরা দেশের ভেতরের শত্রু নন এবং সরকারের উচিত নয় নিজেদের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মতো অবস্থান নেওয়া।
সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, ফ্রান্স আনবোডের ভূমিকা অস্থিরতা উসকে দিতে সাহায্য করেছে। তবে দলটি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইউরোপের অন্য দেশেও বিক্ষোভ
ফ্রান্সের পরিস্থিতির পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য দেশেও জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি ব্যয় এবং জনসেবার মান নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক দেশই বাজেটের চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে সামাজিক অসন্তোষ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গ্রিসে বুধবার হাজারো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রাস্তায় নেমে শিক্ষাখাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার উন্নতি এবং শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ইতালি মঙ্গলবার নতুন কিছু নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে বিক্ষোভে সহিংসভাবে অংশগ্রহণের জন্য নতুন অপরাধের বিধান এবং দাঙ্গায় জড়িত ব্যক্তিদের জন্য কঠোরতর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। গত সপ্তাহান্তের অস্থিরতার প্রতিক্রিয়ায় এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সে শনিবারের বিক্ষোভ কতটা শান্তিপূর্ণ থাকে, তা এখন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একই সঙ্গে মজুরি, জ্বালানির মূল্য, সরকারি পরিষেবা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের অসন্তোষ কতটা প্রশমিত করা যায়, তার ওপরও নির্ভর করছে পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ।












