প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর ভালো আর্থিক ফলাফলও এশিয়ার শেয়ারবাজারে স্থায়ী স্বস্তি আনতে পারেনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের লাভজনকতা নিয়ে উদ্বেগ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কায় ২২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার সকালে এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে দরপতন দেখা গেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জাপান বাদে অন্যান্য দেশের শেয়ারবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি পরিমাপকারী এমএসসিআই সূচক ০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এ নিয়ে সূচকটি টানা চতুর্থ সপ্তাহের মতো পতনের পথে রয়েছে। জাপানের নিক্কেই সূচক দিনের শুরুতে কিছুটা বাড়লেও পরে ০ দশমিক ৪ শতাংশ কমে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারের সূচক কমেছে ১ শতাংশেরও বেশি।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ লেনদেনের সূচকগুলোতেও দুর্বলতা দেখা গেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের সঙ্গে সম্পর্কিত ফিউচার চুক্তি ০ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৭ হাজার ৭৬৫ দশমিক ৮ পয়েন্টে নেমে আসে।
প্রযুক্তি কোম্পানির ভালো ফলেও কাটেনি উদ্বেগ
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় লেনদেন শেষ করে। এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যয় কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সংশয় কিছুটা কমাতে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আর্থিক ফলাফল ভূমিকা রাখে।
মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স জনসমক্ষে শেয়ার ছাড়ার পর প্রথমবারের মতো মুনাফা অর্জনের কথা জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মেটা তৃতীয় প্রান্তিকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আয় করেছে। এআই সার্ভার নির্মাতা সুপার মাইক্রোও আগামী প্রান্তিকের আয় ও মুনাফার হার নিয়ে এমন পূর্বাভাস দিয়েছে, যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এসব ইতিবাচক খবরের পরও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। বিশেষ করে এআই খাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মেটার ভোটাধিকারহীন ‘ক্লাস সি’ সাধারণ শেয়ার ইস্যু করার পরিকল্পনাও বিনিয়োগকারীদের নজরে এসেছে। এআই অবকাঠামোতে ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে কোম্পানিটি কীভাবে অর্থায়ন করবে, তা নিয়ে বাজারে আলোচনা চলছে।
বিনিয়োগ ও আর্থিক বাজার বিশ্লেষক কাইল রোডা বলেন, বর্তমানে বাজারে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা সদ্য প্রকাশিত কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফল বিশ্লেষণ করছেন। তাঁর মতে, কোম্পানিগুলোর আয়ের প্রতিবেদন প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময় এখনো শুরু পর্যায়ে রয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আসন্ন সিদ্ধান্ত, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়েও বিনিয়োগকারীদের ভাবতে হচ্ছে।
উপসাগরীয় উত্তেজনায় বাড়ছে তেলের দাম
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১০ দশমিক ০৩ ডলারে পৌঁছেছে। এটি গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি।
সৌদি আরবে হুতিদের হামলার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে অবস্থানরত কূটনীতিকদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী দেশটির ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার জন্য নির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এসব খবর উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উঁচু থাকলে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর পড়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার কমানোর সুযোগও সীমিত করতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীরা একদিকে কোম্পানিগুলোর আয়ের প্রবৃদ্ধি দেখছেন, অন্যদিকে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় ও সুদের হারের সম্ভাব্য প্রভাব হিসাব করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজারেও সতর্কতার ইঙ্গিত
বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডবাজারে। দেশটির ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মুনাফার হার ৪ দশমিক ২ বেসিস পয়েন্ট কমে ৫ দশমিক ১০৬৫ শতাংশে নেমেছে। ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের মুনাফার হারও এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে ৫ দশমিক ৩৯৬৮ শতাংশ হয়েছে।
বন্ডের মুনাফার হার কমে যাওয়া বাজারে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ সম্পদের প্রতি আগ্রহ কিংবা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে।
মুদ্রাবাজারে সীমিত পরিবর্তন, স্বর্ণ ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে নিম্নমুখী প্রবণতা
বৈশ্বিক প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন ডলারের শক্তি পরিমাপকারী ডলার সূচক কমে ১০২ দশমিক ২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ইউরোর বিনিময়মূল্য প্রায় অপরিবর্তিত থেকে প্রতি ডলারে ১ দশমিক ১২৩১ ডলারে অবস্থান করেছে।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর রিয়োজো হিমিনো ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেওয়ার পরও ইয়েনের বিনিময়মূল্যে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর ছিল ১৫৮ দশমিক ১২৫। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৃহস্পতিবার নীতি সুদের হার ৩ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার পর দেশটির মুদ্রা ওনও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখায়নি। ডলারের বিপরীতে এর দর ছিল ১ হাজার ৩২৫ দশমিক ৯ ওন।
স্বর্ণের দাম কিছুটা কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১১৫ দশমিক ৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিটকয়েনের দাম ০ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৮৪ হাজার ২৮৪ দশমিক ০৫ ডলারে নেমেছে। ইথারের দাম কমেছে ০ দশমিক ৬ শতাংশ, প্রতি কয়েনের মূল্য দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৭৬ দশমিক ৩৪ ডলার।
সব মিলিয়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভালো আয় সাময়িক আশাবাদ তৈরি করলেও এআই খাতে ব্যয়ের টেকসইতা, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের আশঙ্কা বৈশ্বিক বাজারকে চাপে রেখেছে। আগামী দিনগুলোতে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফল, তেলের দামের গতিপথ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মনোভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।












