আফ্রিকায় ইবোলা সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। এক দশকেরও বেশি সময় পর নাইজেরিয়ায় আবারও ইবোলা রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কঙ্গো, উগান্ডা ও কেনিয়ার পর আফ্রিকার চতুর্থ দেশ হিসেবে নাইজেরিয়ায় এই ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ল। জনসংখ্যার দিক থেকে আফ্রিকার বৃহত্তম দেশটিতে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় আঞ্চলিকভাবে রোগটি আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে।
গত মে মাসে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে নতুন করে ইবোলা সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৬৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংক্রমণের বিস্তার ও মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনায় এটি ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যথাযথ পদক্ষেপের অভাব, ভুল তথ্যের বিস্তার এবং অর্থায়নের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলতে পারে।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ইবোলা ভাইরাসের ধরনটি সংক্রমিত ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেকের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। এই ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে অনুমোদিত চিকিৎসা বা টিকা নেই। ফলে দ্রুত রোগী শনাক্ত করা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা এবং সংস্পর্শে আসা মানুষদের পর্যবেক্ষণে রাখা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আফ্রিকা রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের মহাপরিচালক জ্যঁ কাসেয়া বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ইবোলা এখন আফ্রিকার তিনটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন।
কীভাবে শনাক্ত হলো নাইজেরিয়ার রোগী
নাইজেরিয়ার রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা ওডিয়ানোসেন এহিয়াখামেনের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত নারী উগান্ডার নাগরিক। গত ৫ অক্টোবর তিনি ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা হয়ে নাইজেরিয়ার রাজধানী আবুজায় পৌঁছান।
দুই দিন পর, অর্থাৎ ৭ অক্টোবর, তাঁর শরীরে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেয়। ১১ অক্টোবর ম্যালেরিয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে তিনি আবুজার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। তবে চিকিৎসার পরও তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি।
পরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানতে পারেন, ওই নারী সম্প্রতি উগান্ডায় ভ্রমণ করেছিলেন। দেশটিতে তখন ইবোলার প্রাদুর্ভাবের ইতিহাস থাকায় তাঁর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ১৯ অক্টোবর তাঁকে ইবোলা পরীক্ষা করা হয় এবং মঙ্গলবার পরীক্ষার ফল সংক্রমণ নিশ্চিত করে।
অসুস্থ হওয়ার পর ইবোলা শনাক্ত করতে ১২ দিন লেগে যাওয়ায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ওই নারী অন্য অনেক মানুষের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংক্রমণ শনাক্তে বিলম্ব হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
নাইজেরিয়ার চিকিৎসক ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগবিষয়ক জি৭ কমিটির সহসভাপতি আয়োয়াদে আলাকিজা বলেন, পূর্ব আফ্রিকা থেকে পশ্চিম আফ্রিকায় সংক্রমণ পৌঁছানোর ফলে পরিস্থিতি এখন আর কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পুরো আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার মতো সংকটে পরিণত হতে পারে।
আবুজা আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর একটি। সড়ক ও আকাশপথে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে শহরটির নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। ফলে সেখানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে তা অন্য দেশেও পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আলাকিজা।
৪৪ জনকে শনাক্ত, নজরদারিতে স্বাস্থ্যকর্মীরা
নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আক্রান্ত নারীর সংস্পর্শে আসা ৪৪ জনকে শনাক্ত করেছে। তাঁদের বেশির ভাগই স্বাস্থ্যকর্মী। তালিকায় রয়েছেন ওই নারীর স্বামীও, যিনি সুইজারল্যান্ডের নাগরিক এবং আবুজায় তাঁর সঙ্গে বসবাস করেন।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আক্রান্ত নারীর সঙ্গে উগান্ডা থেকে নাইজেরিয়ায় একই যাত্রাপথে আসা অন্য যাত্রীদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে তাঁদের ধারণা, বিমানে ভ্রমণের সময় ওই নারীর শরীরে ইবোলার উপসর্গ ছিল না।
নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ আলী পাতে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম এনটিএকে জানান, আক্রান্ত নারীকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে এবং তাঁর চিকিৎসা চলছে। সংক্রমণ যাতে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য কর্তৃপক্ষ নজরদারি জোরদার করেছে।
উগান্ডার দাবি, দেশে বর্তমানে সক্রিয় রোগী নেই
উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আক্রান্ত নারী কঙ্গোতে ভ্রমণ করেছিলেন। দেশটির আটটি প্রদেশে এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৫০০-এর বেশি ইবোলা সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে ওই নারী কঙ্গোর ঠিক কোন এলাকায় গিয়েছিলেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। নাইজেরিয়ার কর্তৃপক্ষও তাঁর কঙ্গো সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, কোনো ব্যক্তি উগান্ডার মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করেছেন বলেই তাঁর সংক্রমণ সেখানে ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। দেশটির দাবি, বর্তমানে উগান্ডায় ইবোলার কোনো সক্রিয় রোগী নেই।
চলতি বছরের মে ও জুনে উগান্ডায় ২০ জনের ইবোলা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। তাঁদের বেশির ভাগের সংক্রমণ কঙ্গো থেকে ছড়িয়েছিল। পরে আগস্টে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উগান্ডাকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা করে।
তবে চলতি মাসের শুরুতে কেনিয়ায় প্রথম ইবোলা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। কঙ্গো থেকে উগান্ডা হয়ে কেনিয়ায় পৌঁছানো এক ভ্রমণকারীর মাধ্যমে সেখানে সংক্রমণ ছড়ায় বলে জানা যায়। ওই রোগীর সঙ্গে সম্পর্কিত সংক্রমণের সংখ্যা বেড়ে নয়টিতে পৌঁছেছে।
কেনিয়ায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা সীমান্তে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভ্রমণকারীদের পরীক্ষা, উপসর্গ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানে ঘাটতি থাকলে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
২০১৪ সালের অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা নাইজেরিয়ার
২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার ইতিহাসের বৃহত্তম প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। সে সময় নাইজেরিয়াও আক্রান্ত হয়েছিল। তবে দেশটি সফলভাবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী পাতে।
তিনি বলেন, নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নাইজেরিয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এবার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার সময়, আক্রান্ত ব্যক্তির ভ্রমণপথ এবং একাধিক দেশের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত পরীক্ষা, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের পর্যবেক্ষণ, কার্যকর আইসোলেশন এবং জনসাধারণকে সঠিক তথ্য দেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ইবোলার মতো প্রাণঘাতী রোগের ক্ষেত্রে সংক্রমণ শনাক্তে বিলম্ব হলে তা নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তুলতে পারে। তাই নাইজেরিয়ার নতুন রোগী শনাক্তের ঘটনা শুধু দেশটির জন্য নয়, পুরো আফ্রিকার জনস্বাস্থ্যের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।












