বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একদিকে কমে আসছে প্রবৃদ্ধির গতি, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে ক্ষয় হচ্ছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের বাড়তি দায়। অর্থাৎ অর্থনীতিকে একই সঙ্গে সামলাতে হচ্ছে প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের ঝুঁকি। এই তিন চ্যালেঞ্জের প্রতিটিই গুরুতর; আবার একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্কও গভীর। ব্যাংককের বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা শেষে প্রকাশিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস বাংলাদেশের এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে। আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সরকারের জন্য বড় নীতিগত পরীক্ষায় পরিণত হচ্ছে। এগুলো নিছক কিছু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, শিল্পের উৎপাদন, নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিগত দুর্বলতা ও সংস্কার বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা চলতে থাকলে সংকটের চাপ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর সংস্কারের মাধ্যমে এই চাপ সামাল দেওয়ার সুযোগও রয়েছে। চার দশকের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির শঙ্কা আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরের পর দেশের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হবে। ওই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.১১ শতাংশ। এমনকি কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০১৯-২০ অর্থবছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৪৫ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাস অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে এসেছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সেই গতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়লে শুধু জাতীয় আয়ের সম্প্রসারণই ব্যাহত হয় না, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতাও চাপে পড়ে। অবশ্য প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস মানেই অর্থনীতির প্রতিটি খাত সমানভাবে সংকুচিত হবে, এমন নয়। তবে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও চাহিদায় দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা দিলে তার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের মন্থরতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের ব্যয়, নীতিগত অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা কিংবা বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেই অর্থনীতির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, প্রকৃত আয় এবং আয়বণ্টনের সম্পর্ক থাকতে হয়। বিনিয়োগ বাড়লেও যদি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হয়, তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বড় অংশের কাছে পৌঁছাবে না। অতএব, বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। প্রবৃদ্ধিকে কর্মসংস্থানমুখী ও উৎপাদনশীল করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, রপ্তানিমুখী উৎপাদন এবং শ্রমঘন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ রয়েছে। অর্থনীতির সংকটে মানুষের জীবনেও দুর্ভোগ প্রবৃদ্ধির মন্থরতার পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় মূল্যস্ফীতি। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশে উঠতে পারে। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৮.৭ শতাংশ। পূর্বাভাসটি বাস্তবায়িত হলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে। মূল্যস্ফীতির অর্থ শুধু বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া নয়; এর অর্থ একই পরিমাণ আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কিনতে পারা। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ খাদ্য, বাসস্থান, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় হয়, তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির অভিঘাত বেশি পড়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়িত্ব নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে। আয় যদি পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তাহলে পরিবারগুলোকে ব্যয় সংকোচন করতে হয়। পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা কিংবা শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় কমানোর প্রবণতাও তৈরি হতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি কেবল সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্যা থাকে না; তা দারিদ্র্য ও বৈষম্য বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করে। গত চার বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এই চাপ আরও তীব্র হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কাজটিও সহজ নয়। বাংলাদেশ জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে কিংবা টাকার বিনিময়মূল্য কমলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। সেই বাড়তি ব্যয় উৎপাদন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে অন্যান্য পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতির সব দায় আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এবং কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পথে অতিরিক্ত ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। এ কারণে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির পাশাপাশি সরকারের রাজস্বনীতি, আমদানি ব্যবস্থাপনা, বাজার তদারকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সমন্বয় জরুরি। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো, কৃষককে উৎপাদনে সহায়তা দেওয়া, বাজারে অস্বাভাবিক মুনাফা ও কারসাজি প্রতিরোধ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়াতে হবে। ২৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধের দায় বাংলাদেশের অর্থনীতির তৃতীয় বড় চ্যালেঞ্জ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে মূল ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ১৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ বাবদ ব্যয় প্রায় ৭.৬ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই পরিমাণ ৪.৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর প্রাক্কলন ছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪.৮৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। আর ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের দায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। ঋণ পরিশোধের এই চাপ বাড়ার পেছনে বড় অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূমিকা রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল এবং বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া বা শেষ হওয়ার পর্যায়ে থাকায় মূল ঋণ পরিশোধের দায় বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তের উন্নয়ন ঋণ এবং স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ঝুঁকিও এক নয়। তাই প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধের দায়কে সরাসরি ঋণসংকট কিংবা রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কিন্তু এই অঙ্ক ভবিষ্যৎ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্তে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে। কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে তার ঋণ পরিশোধের দায় ভবিষ্যৎ বাজেট ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অতএব, নতুন ঋণ গ্রহণের আগে প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ, বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ পরিশোধের সময়সূচি কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে চলমান প্রকল্পগুলো থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।রিজার্ভে স্বস্তি আছে, কিন্তু ঝুঁকি শেষ হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬.৩৯ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফ-র বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১.৫৮ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভের এই অবস্থান কিছুটা স্বস্তি দিলেও ভবিষ্যৎ বৈদেশিক লেনদেনের চাপ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ, রিজার্ভের স্থিতিশীলতা শুধু এর বর্তমান পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং আমদানি ব্যয়, ঋণ পরিশোধ, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় ও অন্যান্য বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ওপরও নির্ভরশীল। আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের দায় বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে। একই সময়ে রপ্তানি আয় বা প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। এখানে নির্বিচারে আমদানি সংকোচন কোনো টেকসই সমাধান নয়। বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকলেও শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, কৃষি উপকরণ ও প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। এতে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আমদানি ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়ানো, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, নতুন পণ্য রপ্তানি এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও বিনিয়োগের স্থবিরতা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এই চাপের সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা গভীরভাবে সম্পর্কিত। ব্যাংক খাতের ঝুঁকি, খেলাপি ঋণ, তারল্যসংকট এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার ঘাটতিকে বড় উদ্বেগ হয়ে দাড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব এবং ঋণ আদায়ে দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। আবার ব্যাংকে তারল্য থাকলেও বিনিয়োগের পরিবেশ অনিশ্চিত হলে উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নিতে চাইবে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু সুদের হার কমানো কিংবা নতুন ঋণ কর্মসূচি চালু করাই যথেষ্ট নয়। ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই, খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ, ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। একই সঙ্গে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নীতির ধারাবাহিকতা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া, করব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বিনিয়োগের জন্য অপরিহার্য। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কুটির শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে তুলনামূলক দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে। এখানে বড় প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে প্রকল্প নির্বাচনে অর্থনৈতিক সুফল, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় বিনিয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত করা বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর মতোই গুরুত্বপূর্ণ। বাড়াতে হবে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রাজস্ব ব্যবস্থাপনা। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং সরকারের নিজস্ব আয় শক্তিশালী করা না গেলে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও ঋণ পরিশোধের দায় সামাল দেওয়া কঠিন হবে। রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা থাকলে সরকারকে ঘাটতি অর্থায়নের জন্য আরও ঋণ নিতে হতে পারে। আবার রাজস্ব বাড়ানোর নামে হঠাৎ করের চাপ বাড়ানো হলে ব্যবসা ও ভোক্তার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। তাই করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, কর প্রশাসনের অটোমেশন এবং করদাতাদের হয়রানি কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। যেসব প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে কিন্তু প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলোর মূল্যায়ন করতে হবে। অগ্রাধিকারহীন ব্যয় কমিয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতি, অপচয় ও অর্থ পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে অর্থনীতির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সংস্কার বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা তুলে ধরেছে। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দেশীয় সম্পদের সদ্ব্যবহার এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। নিজস্ব সংস্কারের রূপরেখা থাকা ইতিবাচক। কারণ, প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, সামাজিক বাস্তবতা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার এক নয়। তবে আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্তের বাইরে গিয়ে নিজস্ব সংস্কারের কথা বললেই সংকটের সমাধান হবে না। সংস্কারের লক্ষ্য, সময়সীমা, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই সহায়তার কার্যকারিতা নির্ভর করবে অর্থায়নের শর্ত, প্রকল্পের মান এবং বাস্তবায়নের ওপর। ভর্তুকি কমানো, মুদ্রানীতি কঠোর করা কিংবা জ্বালানি ও পরিষেবার দাম বাড়ানোর মতো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সামাজিক অভিঘাত বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এসব সিদ্ধান্তের ব্যয় যদি প্রধানত নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর পড়ে, তাহলে অর্থনৈতিক সংস্কারের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সহায়তা না নেওয়া কিংবা সংস্কার পিছিয়ে দেওয়াও সমাধান নয়। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি বাস্তবভিত্তিক নীতি, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেবে। সংকট উত্তরণে এখনই যা করা প্রয়োজন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো তিনটি চ্যালেঞ্জকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে না দেখে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং সরবরাহব্যবস্থার অদক্ষতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আগামী বছরগুলোতে কোন ঋণের আসল ও সুদ কত পরিশোধ করতে হবে, কোন প্রকল্প থেকে কী সুফল আসবে এবং নতুন ঋণ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ওপর কতটা দায় তৈরি করবে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস সম্প্রসারণ করতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি নতুন রপ্তানি খাত গড়ে তোলা, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় বৈধ পথে আনার সুবিধা বাড়ানো এবং বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ মূল্যায়ন, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং ঋণ বিতরণে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে অর্থায়ন বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, রাজস্ব আহরণ ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়াতে হবে। কর ফাঁকি বন্ধ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর মাধ্যমে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। ষষ্ঠত, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষাকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে রাখতে হবে। প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে যেসব জনগোষ্ঠী সাময়িকভাবে বেশি চাপে পড়তে পারে, তাদের জন্য সুরক্ষাব্যবস্থা রাখতে হবে। শেষ কথা বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভা বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে নতুন কোনো সংকট তৈরি করেনি; বরং বিদ্যমান সমস্যাগুলোর মাত্রা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে। ৩.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস, ১০.৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা এবং পাঁচ বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায়—এই তিনটি সূচকই নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা। তবে এসব পূর্বাভাসকে অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখারও কারণ নেই। যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, নীতির ধারাবাহিকতা, আর্থিক খাতে সুশাসন এবং সংস্কার বাস্তবায়নে দৃঢ়তা। বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু কীভাবে রিজার্ভ ধরে রাখা কিংবা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হবে, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে এমন একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা যাবে, যেখানে উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে এবং উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে। অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব দিয়ে নির্ধারিত হয়। প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ কিংবা ঋণ ব্যবস্থাপনার সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা পাবে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কমবে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন সেই কঠিন পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক












