যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এর মধ্যেই ডিজেলের লাগামছাড়া দাম কমাতে একের পর এক ব্যয়বহুল পদক্ষেপ নিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কৃষকদের জন্য ৮০০ কোটি ডলারের সহায়তা, ট্রাকে রঙিন ডিজেল ব্যবহারের নিয়ম শিথিল, রুশ ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইউরোপীয় মিত্রদের জরুরি জ্বালানি মজুত ছাড়ার চাপ—কোনো উদ্যোগই এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত স্বস্তি দিতে পারেনি। উল্টো ডিজেলের দাম আবার বেড়েছে, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের নির্বাচনী উদ্বেগ।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ১০ সেন্ট বেড়ে ৬.২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। টানা দুই সপ্তাহ দাম কমার পর এই বৃদ্ধি জ্বালানিটিকে আবারও রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি নিয়ে গেছে। অক্টোবরে রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে প্রায় ৮০ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের ধারণা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্প দায়ী।
নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসে নিজেদের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চায় রিপাবলিকানরা। কিন্তু ডিজেল, সার ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি বিশেষ করে কৃষিনির্ভর অঙ্গরাজ্যগুলোতে ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।
ডিজেলের দাম থেকে খাদ্য ও পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধি
কৃষি, নির্মাণ ও পণ্য পরিবহনে ডিজেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। ফলে এর দাম বাড়লে শুধু ট্রাক চালানো বা জমিতে চাষের খরচ বাড়ে না, খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়েও ব্যয় বেড়ে যায়। মার্কিন সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পণ্য সরবরাহ, খাদ্য উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায় এবং এমনকি খেলনার দাম বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রেখেছে।
আইওয়া ও কানসাসের মতো রিপাবলিকান-সমর্থিত কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্যে পরিস্থিতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। জ্বালানি ও সারের বাড়তি দাম, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং কৃষিপণ্যের দুর্বল বাজার কৃষকদের আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প নেব্রাস্কায় এক অনুষ্ঠানে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে মহাসড়কে রঙিন ডিজেল ব্যবহারের অনুমতি দেন। সাধারণত এ ধরনের ডিজেল কৃষিযন্ত্রসহ মহাসড়কের বাইরের যানবাহনে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত। তবে নতুন ব্যবস্থায় ডিজেলের ওপর আরোপিত ফেডারেল কর বাতিল করা হয়নি; অভ্যন্তরীণ রাজস্ব পরিষেবা (আইআরএস) শুধু বছরের শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা ও জরিমানা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাকস্টপ পরিচালনাকারীদের সংগঠন ন্যাটসোর প্রধান লবিস্ট ডেভিড ফিয়ালকভের মতে, নতুন নির্দেশনার ব্যাখ্যা এখনো অস্পষ্ট এবং এতে জ্বালানি বিক্রেতাদের ঝুঁকি রয়েছে। তাঁর ধারণা, রঙিন ডিজেল ব্যবহারের এই উদ্যোগ দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে না।
কৃষকদের সহায়তা ৫৫৪০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে
কৃষকদের ক্ষতি সামাল দিতে ট্রাম্প কানসাসে এক সমাবেশে নতুন করে ৮০০ কোটি ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছেন। এর ফলে চলতি বছরে কৃষকদের জন্য সরকারি অর্থপ্রদান রেকর্ড ৫৫৪০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর আগে ২০২০ সালে মহামারিকালীন সহায়তাসহ কৃষকদের সরকারি অর্থপ্রদানের পরিমাণ ছিল ৪৫০০ কোটি ডলার।
চলতি বছর কৃষকদের সহায়তার পরিমাণ আগে থেকেই ৪৭০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস ছিল। এর মধ্যে মার্কিন কৃষি বিভাগ এ বছরের শুরুতে শুল্কসংক্রান্ত ক্ষতি সামাল দিতে ১২০০ কোটি ডলার দিয়েছে।
তবে নতুন সহায়তা কৃষকদের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ কমাতে পারে, কিন্তু জ্বালানি ও সারের দাম বাড়ানোর মূল কারণগুলো দূর করবে না। ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট রব লারিউ বলেছেন, চলতি বছর কৃষকদের ক্ষতি সামাল দিতে এটি দ্বিতীয় জরুরি সহায়তা কর্মসূচি। তাঁর মতে, বাণিজ্য বিঘ্ন ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত জ্বালানি ব্যয় পরিবারভিত্তিক কৃষকদের সংকটে ফেলেছে; এককালীন অর্থ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নতুন সহায়তার অর্থ ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে কৃষকদের হাতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই। মার্কিন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা রিচার্ড ফোর্ডাইস রয়টার্সকে জানিয়েছেন, অর্থ বছরের শেষ দিকে পাওয়া যেতে পারে।
রুশ ডিজেল নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্ক
ডিজেলের সরবরাহ বাড়াতে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তও বিতর্ক তৈরি করেছে। এসব নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ছিল মস্কোর জ্বালানি আয় কমিয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা সীমিত করা। ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলেরই রাজনীতিকেরা। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এই পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম আদৌ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে কি না।
ট্রাম্পের যুক্তি, রুশ জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় আনা সহজ হবে এবং মার্কিন বন্দি স্টিফেন হাবার্ডের মুক্তির পথ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির বড় কারণ ইরান সংঘাত, যা বৈশ্বিক তেল পরিবহন ও পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। রুশ শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলাও সরবরাহ সংকুচিত করেছে, তবে তার প্রভাব তুলনামূলক কম। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের এডওয়ার্ড ফিশম্যান মনে করেন, নির্বাচনের আগে দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা হিসেবেও ইউক্রেনকে দোষারোপ করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস অবশ্য ডিজেলের উচ্চমূল্যের জন্য আগের বছরগুলোর শোধনাগার বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের মতো কারণকে দায়ী করেছে। কিন্তু নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে না পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যয়বহুল পদক্ষেপগুলো রাজনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।












