বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহে অনিশ্চয়তার প্রভাবে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসিএল) মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২.৫ শতাংশ কমেছে। শুক্রবার প্রকাশিত আর্থিক ফলাফলে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম পরিশোধন সক্ষমতাসম্পন্ন তেল শোধনকারী প্রতিষ্ঠানটি।
৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া তিন মাসে কোম্পানিটির স্বতন্ত্র নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৪৯৯৩ কোটি রুপি। আগের বছরের একই প্রান্তিকে এ মুনাফা ছিল ৬৪৪২ কোটি রুপি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা কমেছে প্রায় ১৪৪৯ কোটি রুপি।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বাড়ল তেলের দাম
প্রান্তিকজুড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট তেলের গড় দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার কারণে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি তেল পরিশোধন ও জ্বালানি বিপণন ব্যবসায় ব্যয়ের হিসাবকে আরও কঠিন করে তোলে।
অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে পেট্রোল ও ডিজেল বিক্রির ক্ষেত্রে বিপণন মুনাফার ওপর চাপ পড়ে। কারণ, জ্বালানি সংগ্রহের খরচ দ্রুত বাড়লেও খুচরা বিক্রির মাধ্যমে সেই বাড়তি ব্যয় পুরোপুরি সমন্বয় করা সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে প্রতি লিটার জ্বালানি বিক্রি থেকে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান সংকুচিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত কোম্পানির মুনাফায় প্রভাব ফেলে।
ব্যয় বেড়েছে আয়ের চেয়ে দ্রুত
মুনাফা কমার পাশাপাশি ভারত পেট্রোলিয়ামের মোট ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির মোট ব্যয় আগের বছরের তুলনায় ৩২.৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি রুপিতে। এ সময়ে ব্যবহৃত কাঁচামালের ব্যয় বেড়েছে ৪৪.২ শতাংশ।
অন্যদিকে, কোম্পানিটির পরিচালন আয় ২৯.৮ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। তবে আয় বাড়লেও ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি বিপণনে মুনাফার সংকোচন কোম্পানিটির আর্থিক ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
এলপিজিতে সরকারি ক্ষতিপূরণে সহায়তা
ভারত সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ক্ষতিপূরণও কোম্পানিটির আয়ে ভূমিকা রেখেছে। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বিক্রিতে ব্যয় ও আদায়ের মধ্যে ঘাটতি পূরণে সরকার ভারত পেট্রোলিয়ামকে ৩ হাজার ৭৯৭ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দিয়েছে।
এই অর্থ কোম্পানিটির পরিচালন আয়ে সহায়তা করেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং কাঁচামালের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপের মধ্যে তা মুনাফার পতন ঠেকাতে যথেষ্ট হয়নি।
ভারত পেট্রোলিয়ামের আর্থিক ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে, আয় বৃদ্ধি পেলেও জ্বালানি খাতের ব্যয়গত চাপ মুনাফা কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থির থাকলে পরিশোধন ও খুচরা বিপণন—উভয় ক্ষেত্রেই কোম্পানিগুলোকে ব্যয় এবং বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।
ভারত পেট্রোলিয়ামের দ্বিতীয় প্রান্তিকের ফলাফলে সেই চাপই স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কোম্পানিটির ব্যয় বাড়িয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নিট মুনাফায়।
ভারত পেট্রোলিয়ামের মুনাফা কমার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং কাঁচামালের ব্যয় বেড়ে যাওয়াই প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।












