রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মাছের আড়ত থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর বিরুদ্ধে সামনে আসছে আরও নানা অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিং এলাকায় নালা ও পানি নিষ্কাশন লাইনের সংস্কারকাজ জোর করে নিজেদের লোক দিয়ে করিয়ে ভবনমালিকদের কাছ থেকে বাড়িপ্রতি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন তাঁর অনুসারীরা। এ ছাড়া চাঁদাবাজি, নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণ এবং বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়। এরপর আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিং এলাকায় খোঁজ নিয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে তাঁর ও অনুসারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া যায়।
জোর করে নালার কাজ, বাড়তি টাকা আদায়
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের ৬ নম্বর সড়কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে। এই সড়কের ৫০ থেকে ৬০টি ভবনের পানি ও নালা নিষ্কাশন লাইনের কাজ নিজেদের লোক দিয়ে করাতে ভবনমালিকদের বাধ্য করেন নয়নের অনুসারীরা। কাজ শেষে নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত বিল দাবি করা হয় এবং তা আদায়েও চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা।
সড়কের ৬৯ ও ৭০ নম্বর বাড়ির নালার কাজের জন্য ৫৫ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। ভবনমালিক পরিচিত ও অভিজ্ঞ মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করাতে চাইলে চার-পাঁচজন ব্যক্তি নিজেদের ছাত্রদল নেতা নয়নের লোক পরিচয় দিয়ে বাধা দেন। অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়।
একই সড়কের আরেকটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মীর অভিযোগ, অন্য মিস্ত্রি দিয়ে যে কাজ ১০ হাজার টাকায় করানো সম্ভব ছিল, সেই কাজের জন্য তিন ধাপে জোর করে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে।
দোকান ও নির্মাণাধীন ভবনেও চাঁদাবাজির অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেন এবং সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিমের নেতৃত্বে এলাকায় এমব্রয়ডারি কারখানা, ফুটপাতের দোকান ও নির্মাণাধীন ভবন থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হতো। তাঁদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থাপনার কাজ নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় আদাবর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম বাবুলের একটি বাড়ি দখলের চেষ্টার অভিযোগ ওঠে নয়ন ও জসিমের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। বাড়িটি দখল করতে না পেরে সেখানে ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে হামলার সময় ছাত্রদলের একাধিক স্থানীয় নেতাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার, তদন্ত করছে ডিবি
চাঁদাবাজি ও বাড়ি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিম। তাঁর দাবি, তিনি বিষয়টি মীমাংসা করতে সেখানে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এর আগে গত মাসে মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনায় ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের আওতাধীন আদাবর থানা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরাম আহমেদ দাবি করেন, নয়নকে আদাবরের কথা বলে আটক করা হলেও পরে কারওয়ান বাজারের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাঁর মতে, এর পেছনে চক্রান্ত রয়েছে।
তবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও সন্দেহের ভিত্তিতে নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদাবরে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য চাঁদাবাজির অভিযোগও যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে অন্য কারও নাম বা সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আদাবরে নালা সংস্কারের নামে অর্থ আদায়, চাঁদাবাজি ও বাড়ি দখলের অভিযোগগুলো এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।












