দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ দেশের তুলনায় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বাংলাদেশের সরকারি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যভিত্তিক ২০২৬ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশে থাকতে পারে। বিপরীতে, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশের ঋণের অনুপাত অনেক বেশি।
বাংলাদেশের তুলনামূলক কম ঋণের হার দেশের সরকারি অর্থব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে এই অবস্থান ধরে রাখতে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ঋণের চিত্র
২০২৬ সালের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ভারতের সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ৮৩ শতাংশ হতে পারে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এ হার ৭০ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে ৯৫ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
অন্যদিকে, মালদ্বীপের সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ১৩১ শতাংশ এবং ভুটানের ১১৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। নেপালের ক্ষেত্রে সরকারি ঋণের অনুপাত প্রায় ৪৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ হতে পারে।
এই হিসাব অনুযায়ী, জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ভারতের অর্ধেকেরও কম। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার তুলনায়ও বাংলাদেশের ঋণের হার যথেষ্ট কম। মালদ্বীপ ও ভুটানের ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের আকারকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কম ঋণের অনুপাত কেন গুরুত্বপূর্ণ
জিডিপির তুলনায় সরকারি ঋণের অনুপাত কম থাকলে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কিছুটা বাড়তি নমনীয়তা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও অন্যান্য উন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকতে পারে।
তবে ঋণের অনুপাত কম হলেই সরকারি অর্থব্যবস্থা পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ঋণ গ্রহণের শর্ত, সুদ ও আসল পরিশোধের সক্ষমতা এবং ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উন্নয়ন ব্যয়ের চাপের মধ্যে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য বজায় রাখা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি তা ব্যবহারের কার্যকারিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঋণ ব্যবস্থাপনায় যেসব বিষয়ে গুরুত্ব প্রয়োজন
বাংলাদেশের তুলনামূলক কম ঋণের অনুপাত ধরে রাখতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ঋণের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা বিবেচনা করা এবং ভবিষ্যতে সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখাও প্রয়োজন। ঋণের অর্থ এমন খাতে ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ, যেখান থেকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক উৎপাদন ও আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বর্তমানে মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং উন্নয়ন চাহিদা পূরণের চাপ মোকাবিলা করছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য ঋণ গ্রহণে সতর্কতা বজায় রাখা, সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় টেকসই নীতি অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।












