ওষুধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিক্ষা ও শিশুযত্নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে করছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে বাংলাদেশের করব্যবস্থায় ছাড়ের পরিধি কমানো, ভ্যাট কাঠামো সহজ করা এবং জ্বালানি ভর্তুকি আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার সুপারিশও রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এসব প্রস্তাবের মধ্যে একটি বৈপরীত্য দেখা যায়—একদিকে কিছু খাতে করছাড়ের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে করছাড় কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর চাপ রয়েছে।
এই দ্বৈত অবস্থানের ব্যাখ্যা বুঝতে হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও সীমিত ক্রয়ক্ষমতা সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আদায় প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় করা কঠিন হচ্ছে।
আইএমএফের প্রস্তাবগুলো এখনো চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত নীতি নয়। ঋণ নিয়ে পরবর্তী আলোচনা এবং রাজস্ব সংস্কারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু কোন পণ্যে কর কমবে বা বাড়বে, তা নয়; বরং সংস্কারের ফলে বাজারদর, পরিবহন ব্যয়, সরকারি সেবা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় কী পরিবর্তন আসতে পারে।
ওষুধ ও নিত্যপণ্যে করছাড়: কতটা স্বস্তি মিলবে?
আইএমএফের প্রস্তাব অনুযায়ী, ওষুধ, কৃষিজমি, কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং নির্দিষ্ট সেবায় ভ্যাট অব্যাহতির বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাব্যয়ের ক্ষেত্রে মাসে শিক্ষার্থীপ্রতি সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ভ্যাটমুক্ত সুবিধা এবং স্বীকৃত প্রাক্-প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানের শিশুযত্ন সেবায় মাসে শিক্ষার্থীপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড়ের প্রস্তাবও এসেছে। ধর্মীয় উৎসবসংশ্লিষ্ট কিছু সেবায় করছাড়ের বিষয়টিও রয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের করছাড়। ওষুধের ওপর বর্তমানে সম্মিলিত করের বোঝা প্রায় ১৭ শতাংশ বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস। এই কর উঠে গেলে উৎপাদনকারী বা আমদানিকারকের ব্যয় কমতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সেই সুবিধার কিছু অংশ ক্রেতার কাছে পৌঁছালে রোগীর চিকিৎসাব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে করছাড় মানেই বাজারে দাম সমপরিমাণ কমে যাওয়া নয়। উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, বিপণন ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যয়ও ওষুধের দামে প্রভাব ফেলে। কর কমার সুবিধা ক্রেতার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজার তদারকি প্রয়োজন।
সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন রয়েছে। এসব পণ্যে কর কমলে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমতে পারে। কিন্তু সরকার যদি কর আদায়ের বড় একটি উৎস হারায় এবং সেই ঘাটতি পূরণে অন্য পণ্য বা সেবায় কর বাড়ায়, তাহলে এক খাতের স্বস্তি অন্য খাতের বাড়তি ব্যয়ে আংশিকভাবে নষ্ট হতে পারে। এনবিআর কর্মকর্তাদের উদ্বেগও এখানেই—ওষুধ ও সয়াবিন তেল থেকে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে। তাই হঠাৎ কর তুলে দিলে সরকারের আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
করছাড় কমানোর চাপ কেন?
বাংলাদেশের রাজস্বসংকটের গভীরতা বোঝার জন্য বিশ্বব্যাংকের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকার যে পরিমাণ কর সংগ্রহ করে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বিশ্বব্যাংকের মতে, জটিল করব্যবস্থা, বিভিন্ন হারে ভ্যাট, ব্যাপক করছাড় এবং দুর্বল প্রশাসনিক সক্ষমতা রাজস্ব সংগ্রহের পথে বড় বাধা।
এই দুর্বল রাজস্বব্যবস্থার কারণে সরকারকে উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয়ের জন্য সীমিত অর্থের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকলে সরকারি সেবার মান উন্নত করা এবং দরিদ্র মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
আইএমএফের বৃহত্তর সংস্কার প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো করব্যবস্থাকে সহজ করা, করছাড় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং কর প্রশাসনকে কার্যকর করা। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট আদায়ের খণ্ডিত পদ্ধতি পর্যায়ক্রমে তুলে দিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইনপুট কর-রেয়াত ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার সুপারিশ রয়েছে। এতে করের হিসাব আরও স্বচ্ছ হতে পারে এবং উৎপাদন ও সরবরাহের বিভিন্ন ধাপে একই মূল্যের ওপর বারবার কর আরোপের সমস্যা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু করছাড় কমানোর সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া নেওয়া হলে তার চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়তে পারে। বর্তমানে কম হারে ভ্যাট আরোপ করা হয় বা কর অব্যাহতি দেওয়া হয়—এমন পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ছাড় তুলে নেওয়া হলে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের ব্যয় বাড়তে পারে। সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে যুক্ত হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও যাতায়াতে ব্যয় হয়।
জ্বালানি কর ও ভর্তুকির পরিবর্তনে কী হবে?
আইএমএফ জ্বালানিতে আবগারি শুল্ক আরোপ এবং ভর্তুকি তুলনামূলকভাবে দরিদ্র পরিবারের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করার পরামর্শও দিয়েছে। এর যুক্তি হলো, সবার জন্য একই ধরনের ভর্তুকি চালু থাকলে বেশি জ্বালানি ব্যবহারকারী সচ্ছল পরিবারও সুবিধা পায়। সীমিত সরকারি অর্থ দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা পরিবারের জন্য নির্দিষ্টভাবে বরাদ্দ করা গেলে সহায়তার কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
কিন্তু জ্বালানির ওপর কর বাড়ানো বা ভর্তুকি কমানোর প্রভাব শুধু গাড়ির জ্বালানির দামেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন, কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। ব্যবসায়ীরা সেই ব্যয় পণ্যের দামে যুক্ত করলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জ্বালানির মূল্যনীতি বদলানোর আগে সম্ভাব্য পরোক্ষ প্রভাব হিসাব করা জরুরি।
ভর্তুকি লক্ষ্যভিত্তিক করার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত দরিদ্র ও সহায়তাপ্রাপ্য পরিবারকে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। অর্থাৎ সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। এই অবস্থায় সার্বজনীন ভর্তুকি কমিয়ে নির্দিষ্ট পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্তের আগে উপকারভোগী শনাক্তকরণ, অর্থ বিতরণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
সংস্কার চাই, তবে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে কঠোর শর্তগুলোর বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া বা পর্যায়ক্রমে কার্যকর করার বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করে বাস্তবসম্মত সময়সীমা ও উপযুক্ত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা।
অন্যদিকে রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার শুধু বিদেশি ঋণের শর্ত পূরণের বিষয় নয়। কর ফাঁকি কমানো, করের আওতা বাড়ানো, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং করদাতাদের হয়রানি কমানো—এসব পদক্ষেপ দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও প্রয়োজন। করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা গেলে একই সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার সুযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। আইএমএফ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ করেছে এবং মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দিয়েছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক একই অর্থবছরের জন্য ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।
এ অবস্থায় সংস্কারের সাফল্য শুধু কত টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হলো বা কতগুলো করছাড় তুলে নেওয়া হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়ের সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছানো, করের বোঝা ন্যায্যভাবে বণ্টন, দরিদ্র পরিবারকে সুরক্ষা এবং সরকারি সেবার অর্থায়ন—সবগুলো লক্ষ্য একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
আইএমএফের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কিছু খাতে মানুষের ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হবে, আবার অন্য খাতে করছাড় প্রত্যাহার ও জ্বালানি নীতির পরিবর্তনে ব্যয় বাড়তেও পারে। কোন প্রভাবটি শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য পাবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধরন, বাজার তদারকি, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা এবং সামাজিক সুরক্ষার কার্যকারিতার ওপর। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ হলো সংস্কার থেকে পিছিয়ে না গিয়ে তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা এবং প্রতিটি পদক্ষেপের কেন্দ্রে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও সুরক্ষাকে রাখা।












