ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা এবং অবাধ চলাচলব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ পথে এগোলে বিভক্ত মন্ত্রিসভার সদস্যদের তাঁর পরিকল্পনার প্রতি আনুগত্য দেখাতে ও প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে হবে। তবে সরকারের ভেতরে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে থাকলেও অন্যদের আশঙ্কা, ব্রেক্সিট নিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক বিরোধ আবার সামনে এলে লেবার পার্টি ও দেশ—দুই ক্ষেত্রেই বিভাজন বাড়তে পারে।
বার্নহ্যাম বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অবাধ চলাচল পুনর্বহালের সম্ভাব্য সুবিধা নিয়ে জনগণের সঙ্গে ‘সৎ আলোচনা’ করতে চান তিনি। তাঁর মতে, ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যে অভিবাসনের ধরনে পরিবর্তন এসেছে; এখন আরও বেশি বিদেশি নাগরিক স্থায়ীভাবে দেশটিতে বসবাস করতে আসছেন।
প্রধানমন্ত্রী আগামী ২০ নভেম্বর যুক্তরাজ্য-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য একাধিক বিকল্প তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন। এসব বিকল্পের মধ্যে ইইউর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং জোটটিতে পুনরায় যোগ দেওয়ার বিষয়ও থাকতে পারে।

মন্ত্রিসভায় সমর্থন বাধ্যতামূলক হতে পারে
আবাসনমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার বলেছেন, ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পরিকল্পনা, যার মধ্যে অবাধ চলাচল ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনাও রয়েছে, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার বর্তমান ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট নয়। যুক্তরাজ্যের রপ্তানি ২০ শতাংশ কমেছে এবং বাণিজ্যিক জটিলতা ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক বিধিনিষেধের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ইউরোপের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে প্রত্যাশিতভাবে ব্যবসা করতে পারছে না।
রেনারের মতে, সম্ভাব্য সুবিধা ও বিনিময়ে কী ধরনের ছাড় দিতে হতে পারে, তা নিয়ে জনগণের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনী ইশতেহারে পরিকল্পনাটি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
তবে প্রধানমন্ত্রী পরিকল্পনার বিকল্পগুলো ঘোষণা করার পর মন্ত্রিসভার সদস্যদের ওপর যৌথ দায়িত্বের নীতি প্রযোজ্য হবে। ফলে তাঁরা প্রকাশ্যে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারবেন না এবং শেষ পর্যন্ত বার্নহ্যামের নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
লেবার পার্টির পরবর্তী সম্মেলনে ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রস্তাব আসতে পারে বলেও সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছেন। এতে দলটির মধ্যে পুনরায় ইইউতে যোগ দেওয়ার পক্ষে সমর্থন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সমর্থক ও সংশয়বাদীদের দ্বন্দ্ব

মন্ত্রিসভার একাংশ ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পক্ষে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং, জ্বালানিমন্ত্রী মিয়াট্টা ফানবুলেহ, ওয়েলস-বিষয়ক মন্ত্রী স্টিফেন কিনক এবং লেবার পার্টির চেয়ার ব্রিজেট ফিলিপসন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন।
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ আগে সতর্ক করেছেন, ইইউতে পুনরায় যোগ দেওয়ার মূল্য যুক্তরাজ্যের জন্য গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। সংস্কৃতিমন্ত্রী লিসা ন্যান্ডি বলেছেন, ব্রেক্সিট নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু করা এবং ইইউতে ফিরে যাওয়া মানুষের বর্তমান প্রত্যাশা থেকে অনেক দূরের বিষয়।
শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল মনে করেন, ইইউর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বর্তমান পরিকল্পনাই সরকারের জন্য বড় কাজ। এর চেয়ে আরও দূর এগোনো সম্ভব বা কাম্য—এমনটা তিনি মনে করেন না। ব্যবসামন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডসও ইইউর সঙ্গে কাস্টমস ইউনিয়নে ফেরার পক্ষে জোরালো যুক্তি দেখেননি। তাঁর আশঙ্কা, এতে ব্রেক্সিট-পরবর্তী রাজনৈতিক অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতি আবার তৈরি হতে পারে।
ইইউর সদস্যপদে ফিরতে হলে অবাধ চলাচলব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ, পুঁজি, পণ্য ও সেবার অবাধ চলাচল ইউরোপীয় ইউনিয়নের চারটি মৌলিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অংশ। জোটটি এ ব্যবস্থাকে সদস্যপদের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে।
বিরোধীদের কঠোর আপত্তি

কনজারভেটিভ পার্টি ও রিফর্ম ইউকে—দুই দলই বার্নহ্যামের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে।
কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনক বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি এবং এর পরিণতি যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি। তাঁর দাবি, ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দেওয়া অনেক মানুষের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অবাধ চলাচল বন্ধ করা এবং অভিবাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজের অভিযোগ, অবাধ চলাচল ফিরলে কম মজুরির বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ বাড়বে এবং তাতে যুক্তরাজ্যের শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর মতে, এই উদ্যোগ ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দেওয়া জনগণের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
সাবেক কনজারভেটিভ অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্টও অবাধ চলাচল পুনর্বহালের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, ইউরোপের ৪৫ কোটি মানুষের শ্রমবাজার থেকে অবাধে কর্মী নিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে তরুণদের কর্মসংস্থানে যুক্ত করা আরও কঠিন হবে। তিনি আরও যুক্তি দিয়েছেন, যুক্তরাজ্যের ন্যূনতম মজুরি ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন ও বেলজিয়ামের তুলনায় বেশি হওয়ায় শ্রমিকদের চলাচলের প্রবণতা একদিকে বেশি হতে পারে।
বার্নহ্যামের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কতটা এগোবে, তা নির্ভর করবে ইইউর সঙ্গে আলোচনার শর্ত, লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য এবং নির্বাচনে জনগণের সমর্থনের ওপর। তবে প্রস্তাবটি ইতিমধ্যেই ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটিশ রাজনীতিতে পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।












