পাকিস্তানে শিয়া মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক ৩ কোটি থেকে ৪ কোটির বেশি হতে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও জনসংখ্যাভিত্তিক অনুমান অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিয়া মুসলিম। তবে কিছু সূত্রে এই হার আরও বেশি বলা হয়েছে। পাকিস্তানের ২০২৩ সালের আদমশুমারিতে সুন্নি ও শিয়া মুসলিমের পৃথক সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে দেশটিতে শিয়া জনগোষ্ঠীর সঠিক সংখ্যা জানা কঠিন।
পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায় দেশটির ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। করাচি, লাহোর ও পেশোয়ার থেকে উত্তরাঞ্চলের গিলগিট-বালতিস্তান এবং আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী কুররাম জেলা পর্যন্ত তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি দেশটির রাজনীতি, আঞ্চলিক সম্পর্ক ও সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনায় এই জনগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ।
সংখ্যার হিসাব: ৪ কোটি কি নির্ভরযোগ্য অনুমান?
ইউরোপীয় ইউনিয়ন অ্যাসাইলাম এজেন্সির ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত পাকিস্তানবিষয়ক প্রতিবেদনে শিয়া মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক ৪ কোটি বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেশটির মোট জনসংখ্যার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিয়া মুসলিম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৩ সালের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের মোট মুসলিম জনসংখ্যার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিয়া বলে অনুমান করা হয়েছে। কিছু গবেষণায় এই হার আরও বেশি পাওয়া যায়। এসব পার্থক্যের একটি প্রধান কারণ হলো, আদমশুমারিতে সুন্নি ও শিয়াদের পৃথকভাবে গণনা করা হয় না এবং বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
তাই কোনো একটি সংখ্যাকে চূড়ান্ত সরকারি হিসাব হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় ৪ কোটি একটি বহুল উদ্ধৃত সাম্প্রতিক অনুমান, যদিও প্রকৃত সংখ্যা কম বা বেশি হতে পারে।
কোন কোন অঞ্চলে শিয়া মুসলিমদের বসবাস বেশি
পাকিস্তানের শিয়া জনগোষ্ঠী কোনো একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। তবে কয়েকটি অঞ্চলে তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
গিলগিট-বালতিস্তান: পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে শিয়া মুসলিমের উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা রয়েছে।
সিন্ধু: করাচি, সাংঘার, নওয়াবশাহ ও হায়দরাবাদে শিয়া সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বসবাস করেন।
পাঞ্জাব: লাহোরসহ বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে শিয়া মুসলিমদের বসবাস রয়েছে।
খাইবার পাখতুনখোয়া: পেশোয়ার, হাঙ্গু, কোহাট, ডেরা ইসমাইল খান ও কুররাম জেলায় শিয়া সম্প্রদায়ের উপস্থিতি রয়েছে।
বেলুচিস্তান: কোয়েটাসহ বিভিন্ন এলাকায় শিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। বিশেষ করে হাজারা সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য অংশ শিয়া মুসলিম।
ধর্মীয় পরিচয় ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
পাকিস্তানের শিয়া জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি বুঝতে হলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়। দেশটিতে শিয়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর খাইবার পাখতুনখোয়ার কুররাম জেলায় শিয়া মুসলিমদের একটি যাত্রীবাহী বহরে হামলায় ৫২ জন নিহত হন। ওই ঘটনার পর শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ২৪ নভেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। এসব ঘটনা সীমান্তবর্তী এলাকায় ধর্মীয় নিরাপত্তার দুর্বলতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঝুঁকি তুলে ধরে।
তবে পাকিস্তানের শিয়া ও সুন্নি জনগোষ্ঠীর সম্পর্ককে কেবল সংঘাতের মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। দেশটির বিভিন্ন শহরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেন। একই সঙ্গে সহিংসতার ঝুঁকি কমানো, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
পাকিস্তানের জনসংখ্যায় শিয়াদের গুরুত্ব
২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ কোটি ১৫ লাখ। ২০২৬ সালের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেশটির জনসংখ্যা ২৪ কোটি ১০ লাখ ধরে শিয়া মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি বলা হয়েছে। এই হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের শিয়া জনগোষ্ঠী বিশ্বের বৃহত্তম শিয়া জনগোষ্ঠীগুলোর একটি হতে পারে।
সার্বিকভাবে, পাকিস্তানে শিয়া মুসলিমের সংখ্যা আনুমানিক ৪ কোটি বলে ধারণা করা হয়। তবে এটি একটি জনসংখ্যাগত অনুমান, সরকারি আদমশুমারিতে নিশ্চিত করা সংখ্যা নয়। তাদের ভৌগোলিক বিস্তার, ধর্মীয় বৈচিত্র্য এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বাস্তবতা পাকিস্তানের সমাজ ও আঞ্চলিক সম্পর্ক বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।












