ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সামনে এবার কঠিন পরীক্ষা। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে শুধু তাঁর লিকুদ পার্টির ভাগ্য নয়, নির্ধারিত হতে পারে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা, গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা—সব মিলিয়ে ভোটারদের কাছে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী থাকা নেতানিয়াহু প্রায় ১৯ বছর দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। এত দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে শক্তিশালী অবস্থানে রেখেছে। দেশটির রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থী শক্তির প্রভাবও এখনো যথেষ্ট। পাশাপাশি ইসরায়েলের বিভক্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জোট গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে নির্বাচনে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়লেও নেতানিয়াহুর সরকার গঠনের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
নেতানিয়াহুর সামনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকট
নির্বাচনী জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার ডানপন্থী মিত্রদের সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের ব্যবধান খুব বেশি নয়। সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত আইজেনকট ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী—দুই ধরনের ভোটারেরই সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
নেতানিয়াহু তাঁর নির্বাচনী প্রচারে যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে অংশ নেওয়ায় এই সম্পর্ক তাঁর প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
রোববার নেতানিয়াহু দাবি করেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলেই ট্রাম্প ইরানের হুমকি চূড়ান্তভাবে দূর করতে আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইরানকে মোকাবিলায় নিজের নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরতে চেয়েছেন।
তবে আইজেনকট নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভয় দেখানো, মিথ্যা প্রচার ও হুমকির ওপর নির্ভর করার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইসরায়েলের জনগণ যাঁকেই নেতা হিসেবে বেছে নিক, ট্রাম্প তাঁর সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন।
কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থন কি আবারও ক্ষমতায় রাখবে নেতানিয়াহুকে?
নির্বাচনের পর সরকার গঠনের জন্য নেতানিয়াহুকে আবারও কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। তাঁদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তিগুলো নেতানিয়াহুর জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে বেন-গভির ও স্মোট্রিচকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিতর্ক রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অন্যদিকে, বেন-গভিরের ‘জিউইশ পাওয়ার’ পার্টির প্রতি জনসমর্থন জনমত জরিপে বেড়েছে বলে দেখা যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করেছে। কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থন তাঁকে ক্ষমতায় ফেরার পথ দেখাতে পারে। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে জোটের কারণে মধ্যপন্থী ভোটারদের একাংশের সমর্থন হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
অন্যদিকে, আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটও সরকার গঠনের ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন। আরেকটি নির্বাচন আগামী বছর অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের সময় নির্ধারিত হয়েছে।
৭ অক্টোবরের হামলার জবাবদিহি নিয়ে ভোটারদের প্রশ্ন
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটি পেরিয়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলা, এরপর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকারের নীতিকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ বিভাজন—সবকিছুই নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের কাছে নির্বাচনের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতার জবাবদিহি। ওই হামলায় ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়। ইসরায়েলের ইতিহাসে ওই দিনটিকে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নেতানিয়াহুর সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, হামলার আগে ও সময়ে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা কীভাবে ঘটেছিল, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ করা জরুরি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মী ও আইজেনকটের সমর্থক মালি হাজাজ বলেন, একটি জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এই তদন্তের মধ্য দিয়েই দেশবাসীর মানসিক ক্ষত সারিয়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
ভোটার লিসা টর্টরও নেতানিয়াহুর বিদায় চান। তাঁর আশা, নতুন সরকার গঠিত হলে ইসরায়েলের ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তি পুনর্গঠন এবং ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর নেতানিয়াহুর নীতির প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করা সম্ভব হবে। নেতানিয়াহুকে তাঁর পরিচিত ডাকনাম ‘বিবি’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে নেতানিয়াহুর সমর্থকদের সবাই ৭ অক্টোবরের ঘটনার জন্য তাঁকে দায়ী মনে করেন না। ১৮ বছর বয়সী লিকুদ সমর্থক নোফ গ্যাবাই বলেন, নেতানিয়াহুই ইসরায়েলের জন্য সঠিক নেতা। তাঁর মতে, নেতানিয়াহু যুদ্ধ পরিচালনায় সর্বোত্তম ভূমিকা রেখেছেন।
ভোটারদের এই বিপরীত অবস্থানই নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। একদিকে নিরাপত্তাব্যর্থতার জবাবদিহি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি, অন্যদিকে যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের প্রতি আস্থা—দুই প্রবণতার মধ্যে ইসরায়েলের ভোটারদের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
যুদ্ধের সাফল্য ও ব্যর্থতার হিসাব
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। ওই অভিযানে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭৪ হাজারে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল। ইরানের সঙ্গেও পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে। ২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ১২ দিনের বিমান অভিযান চালানো হয়। এরপর ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়।
নেতানিয়াহু তাঁর যুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ডকে নেতৃত্বের সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, সামরিক অভিযান ও নিরাপত্তা নীতির মাধ্যমে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেছে কি না।
আইজেনকট বলেছেন, নতুন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, ইরান যেন সামরিক উদ্দেশ্যে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে। তাঁর মতে, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।
অর্থাৎ ইরান প্রশ্নে আইজেনকটও কঠোর অবস্থানের পক্ষে। তবে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য মূলত নিরাপত্তা নীতি পরিচালনা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সরকারের অন্যান্য অংশীদারদের ভূমিকা নিয়ে।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে আইজেনকটের অবস্থান
ইসরায়েলের প্রধান ইহুদিপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মতো আইজেনকটও ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধিতা করেন। এই সমাধানে ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।
তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার সমালোচনা করেছেন আইজেনকট। ২০২৩ সালের পর থেকে এ ধরনের সহিংসতা বেড়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এর ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়েছে।
আইজেনকট নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোটসঙ্গী বেন-গভির ও স্মোট্রিচের বিরোধিতা করছেন। ফলে তাঁর অবস্থান পুরোপুরি মধ্যপন্থী না হলেও বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে একটি বিকল্প নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগ ও আরব ভোটারদের ভূমিকা
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দুর্নীতির অভিযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি ফৌজদারি বিচারে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। লিকুদ পার্টির কিছু সমর্থকও তাঁর নেতৃত্বে অসন্তুষ্ট হয়ে অন্য ভোটারদের নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভোট দিতে উৎসাহিত করছেন।
ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু ভোটারদের উপস্থিতিও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাঁরা নাগরিকত্বের দিক থেকে ইসরায়েলি হলেও তাঁদের অনেকের পারিবারিক ও জাতিগত পরিচয় ফিলিস্তিনি।
এই ভোটারদের মধ্যে বেশি মানুষ ভোট দিতে এলে জোট গঠনের হিসাব আইজেনকটের পক্ষে যেতে পারে। তবে তিনি আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তাঁর যুক্তি, এসব দলের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক মূল্যবোধের মিল নেই।
তবু বিশ্লেষকেরা এমন একটি পরিস্থিতির সম্ভাবনা দেখছেন, যেখানে আরব দলগুলো আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে। এতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে, যদিও এ ধরনের সমর্থন শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা অনিশ্চিত।
শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল মনে করেন, নির্বাচনে কোনো পক্ষই বিপুল ব্যবধানে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁর ধারণা, দুই পক্ষের মধ্যে যে কেউ সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে এই নির্বাচন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব, ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তাব্যর্থতার জবাবদিহি, দুর্নীতির অভিযোগ, কট্টর ডানপন্থীদের প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সবকিছুর হিসাব দিতে হচ্ছে তাঁকে। তবে ভোটের ফলই শেষ কথা নয়; পার্লামেন্টে জোট গঠনের সক্ষমতা নির্ধারণ করবে, শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের ক্ষমতায় কে থাকবেন।












