দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিচিত ছকে আবর্তিত হয়েছে। সীমান্তে সামরিক সংঘাত বা সন্ত্রাসী হামলার পর উত্তেজনা বেড়েছে, তারপর এসেছে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা ও আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা। কিছুদিনের বিরতির পর আবারও নতুন সংঘাত সেই প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু এখন এই পুরোনো ছক আর কার্যকর নেই। ২০১৬ সালের পর দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কোনো সংলাপ হয়নি। পরিস্থিতিটি সাময়িক কূটনৈতিক অচলাবস্থার চেয়ে অনেক বেশি গভীর। ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থার কাঠামোকেই নতুনভাবে নির্ধারণ করছে।
এই পরিবর্তন বুঝতে হলে অতীতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলোর ব্যর্থতা এবং পাকিস্তানের নিরাপত্তা কৌশলের বিবর্তন—দুটিই বিবেচনায় নিতে হবে। ১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের প্রচলিত যুদ্ধে পাকিস্তান কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে দেশটির ভাঙন ঘটে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট মুজাহিদিনদের সাফল্য পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বকে ভিন্ন কৌশলের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। সরাসরি যুদ্ধে ভারতের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার পরিবর্তে তারা অসম যুদ্ধের পথ বেছে নেয়, যার কেন্দ্রে ছিল সন্ত্রাসবাদ।
আশির দশকের শেষভাগ থেকে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভারতে ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলা ও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এই কৌশলের বিপজ্জনক দিকটি স্পষ্ট করে। পাকিস্তানের সামরিক মহলে তখন ভারতের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতির কৌশল নিয়ে আত্মবিশ্বাসও প্রকাশ করা হয়েছিল।
শান্তি উদ্যোগের বারবার ব্যর্থতা

ভারতের নেতারা দীর্ঘদিন বিশ্বাস করেছেন, ধারাবাহিক ও কাঠামোবদ্ধ আলোচনার মাধ্যমে পাকিস্তানকে এই পথ থেকে সরানো সম্ভব। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে শুরু হওয়া যৌথ সংলাপের কাঠামোতে কাশ্মীর, বাণিজ্য ও মানবিক বিষয়সহ বিভিন্ন বিরোধকে আলাদা করে বিবেচনার চেষ্টা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, একটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি থেমে গেলেও অন্য ক্ষেত্রের আলোচনা যেন চালু থাকে।
কিন্তু প্রতিটি বড় শান্তি উদ্যোগের পরই কোনো না কোনো সামরিক বা সন্ত্রাসী উসকানি দেখা গেছে। ১৯৯৯ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি বাসে করে লাহোরে গিয়ে শান্তি ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছিলেন। অথচ একই সময়ে পাকিস্তানি সেনারা কারগিল অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করছিল, যা শেষ পর্যন্ত কারগিল যুদ্ধে গড়ায়।
২০০৮ সালে কাশ্মীর সমস্যার একটি অ-ভূখণ্ডগত সমাধান নিয়ে গোপন কূটনৈতিক আলোচনা অগ্রসর হওয়ার মুখে মুম্বাইয়ে সমন্বিত সন্ত্রাসী হামলায় ১৬৬ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এসব ঘটনা দুই দেশের শান্তি প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক দুর্বলতা সামনে আনে। পাকিস্তানের বেসামরিক সরকার আলোচনার টেবিলে প্রতিশ্রুতি দিলেও সেগুলো বাস্তবায়নের মতো কর্তৃত্ব বা স্থায়িত্ব তাদের ছিল না। অন্যদিকে, দেশটির সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামো ভারতের সঙ্গে শান্তিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রথম দিকে পূর্ববর্তী শান্তি উদ্যোগের পথেই এগিয়েছিলেন। ২০১৪ সালে নিজের শপথ অনুষ্ঠানে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে আমন্ত্রণ জানান। পরের বছর লাহোর সফরও করেন। পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে হামলার পরও তিনি তদন্তে পাকিস্তানের অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের যৌথ তদন্ত দল হামলাটিকে ভারতের সাজানো নাটক বলে দাবি করলে ভারতের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর দিল্লির অবস্থান বদলে যায়। ভারতের নতুন নীতি দাঁড়ায়—সন্ত্রাসবাদ চলতে থাকলে আলোচনা স্বাভাবিক হতে পারে না। পাকিস্তানকে রাষ্ট্রসমর্থিত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে ফেলার বিশ্বাসযোগ্য ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে; তার আগে আলোচনার টেবিলে ফেরার সম্ভাবনা সীমিত।

সামরিক প্রতিরোধের নতুন হিসাব
কূটনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের পাশাপাশি ভারতের সামরিক নীতিতেও রূপান্তর ঘটেছে। প্রায় তিন দশক ধরে পাকিস্তান ধারণা করেছিল, তাদের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার ভারতের প্রচলিত সামরিক পাল্টা আক্রমণকে নিরুৎসাহিত করবে। ভারত এখন সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
গত বছরের ‘অপারেশন সিঁদুর’-সহ সীমান্ত পেরিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা এবং পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসী অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলার মাধ্যমে ভারত দেখিয়েছে, উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকি নিয়েও তারা সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত। এর মাধ্যমে দিল্লি বোঝাতে চাইছে, রাষ্ট্রসমর্থিত সন্ত্রাসী হামলার জবাবে প্রচলিত সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হতে পারে।
এই নীতি ভারতের প্রতিরোধক্ষমতার হিসাব বদলানোর চেষ্টা হলেও এর ঝুঁকি কম নয়। পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশীর মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ না থাকলে কোনো সংকটের সময় ভুল বোঝাবুঝি বা ভুল হিসাবের পরিণতি বিপর্যয়কর হতে পারে। বাণিজ্য, মানবিক সহযোগিতা ও পানি বণ্টনের মতো বিষয়ও এখন নিরাপত্তা ও জাতীয়তাবাদের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচিত হচ্ছে। উত্তেজনা কমানোর জন্য কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পথ না থাকায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
সমঝোতার সম্ভাবনা কেন ক্ষীণ

নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা কম। পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের রাজনৈতিক বৈধতার একটি অংশ এখনও ভারতের সঙ্গে বৈরিতার ওপর নির্ভরশীল, যদিও দেশটি গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রচলিত সামরিক শক্তিতে ভারতের অগ্রগতি দিল্লিকে তার মূল নিরাপত্তাগত অবস্থান থেকে সরে আসার তাগিদ কম দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিও এই অচলাবস্থা ভাঙতে সহায়ক হচ্ছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে ভারতের কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে আগের মতো গুরুত্ব দিচ্ছে না; একই সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছে। অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংক্রান্ত একটি লাভজনক চুক্তি এবং ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
ভারতের বর্তমান অবস্থানকে তাই কেবল শান্তি আলোচনার মধ্যবর্তী বিরতি হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছিন্নতার একটি কৌশল হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন না এলে, যা ভারতের সঙ্গে সংঘাতকে দেশটির নিরাপত্তা ও ক্ষমতার স্বার্থের জন্য অপরিহার্য মনে করার প্রবণতা বদলে দেয়, এই অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তবে এই নীরবতা স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা নয়। বরং দুই পারমাণবিক শক্তির মধ্যে যোগাযোগের অভাব সংকটকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। নতুন কোনো ঘটনা দুই দেশকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে পারে, কিন্তু তেমন পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকা কোনো নিরাপদ কৌশল নয়। বৈরিতার কাঠামো যত দৃঢ় হবে, ভুল সিদ্ধান্তের মূল্যও তত বাড়বে।
শশী থারুরের আরও লেখা
চীনের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অন্ধ নির্ভরতাও নয়: ভারতের সামনে তৃতীয় পথের চ্যালেঞ্জ
নতুন সমঝোতার পথে ওয়াশিংটন-তেহরান: কেন কূটনীতির ভাষাই হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় বাধা











