প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার চার দিনের জাপান সফর শেষ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল তার তৃতীয় কোন দেশ সফর। সফর শেষে এখন শুরু হয়েছে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছিল। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার এবং বড় অংকের বিনিয়োগের আশ্বাসের মধ্য দিয়ে সফরটি শুরু হলেও, শেষ পর্যন্ত বড় বড় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি আর বাস্তব প্রাপ্তির সমীকরণে এক বিশাল ফারাকই ফুটে উঠেছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষণাপত্র আর রাজনৈতিক সদিচ্ছার বড়াই থাকলেও দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এই সফর খুব একটা দৃশ্যমান বা তাৎক্ষণিক সুফল বয়ে আনতে পারেনি। বড় অংকের বিনিয়োগের মারপ্যাঁচ ও বাস্তব চিত্র সফরের অন্যতম প্রধান চমক হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি ইয়েন (প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার) বিনিয়োগের ‘সম্ভাবনা’ ও দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সফরে এ বিষয়টি কেবল আলোচনাই হয়েছে। কোন প্রতিশ্রুতি বা আশ্বাস মেলেনি। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের আহন্বান জানিয়েছেন।

একই সাথে জ্বালানি, প্রযুক্তি, মহাকাশ সহযোগিতা, উড়াল সড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক উন্নয়নে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও সহযোগিতা চেয়েছেন। কিন্তু এই আলোচনায় জাপানি বিনিয়োগকারীরা কতটা সাড়া দিয়েছে তার কোন প্রতিফলন দেখা যায়নি। কিংবা কোন বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগের কোন অঙ্কও ঘোষণা করেনি। এমনকি বাংলাদেশে অবস্থিত জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলেও তারা নতুন কোন বিনিয়োগের সুষ্পষ্ট ঘোষণা দেয়নি। এই আলোচনাকেই যদি প্রতিশ্রুতি হিসাবে ধরে নেই, তাহলেও অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের প্রতিশ্রুতিগুলোর বড় অংশই কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা, সময়সীমা বা বাধ্যতামূলক কোনো চুক্তি না থাকায় এই বিশাল অংকের বিনিয়োগের বাস্তবায়ন নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গ্যাস-বিদ্যুতের চরম সংকট এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাস্তবে কতটা এগিয়ে আসবেন, তা নিয়ে গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে। বিশেষ করে, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার হলেও বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে জাপানি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আশানুরূপ নয়। বিগত পাঁচ বছরে বার্ষিক সর্বোচ্চ বিনিয়োগ ছিলো ১০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। এই স্থবিরতা ভাঙতে প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে জাপানের কাছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি কৌশলগত ও সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাব দেয়ার কথা ছিল। সফরে সেই বিষয়টি নিয়ে কোন আলোচনা দেখা যায়নি। মাতারবাড়ী ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি বঙ্গোপসাগর ঘিরে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় নানা পরিকল্পনা নিচ্ছে চীন, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ। এমন প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়াতে দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্‘ (বিগ-বি) উদ্যোগ নতুন কাঠামোয় সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করেছে বাংলাদেশ ও জাপান। এরই অংশ হিসেবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে শিল্প, জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা কথা জানিয়েছে জাপান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বিগ-বির নতুন নাম ঘোষণা করা হয়, ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’। নতুন কাঠামোর লক্ষ্য, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা। এতে যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়লে বাংলাদেশের বন্দর ও পরিবহন অবকাঠামো ব্যবহারের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিগ-বির নতুন কাঠামোয় ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করার ঘোষণা যৌথ বিবৃতিতে নেই। বিগ-বি উদ্যোগকে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ নামে নতুন রূপ দেওয়ার কথা বলা হলেও এতে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে জ্বালানি ও শিল্প হাব গড়ে তোলার কথা বলা হলেও বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বা আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করার বিষয়টি যৌথ বিবৃতিতে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বা চূড়ান্ত কোনো রূপ পায়নি। বড় বড় পরাশক্তির ভূরাজনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েনে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট সুফল পাবে, নাকি কেবল ট্রানজিট ও যোগাযোগের করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হবে, সেই উত্তর মেলেনি। ঋণ ও সহযোগিতার প্রকৃতরূপ সফরে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় দলিল ও সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ৪৬.৫৬ বিলিয়ন ইয়েন) ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলেছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশই হলো উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের মতো গতানুগতিক কাজের জন্য। দেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট বা জ্বালানি খাতের হাহাকারের তুলনায় এই ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। তাছাড়া, জাপান যে ৫ হাজার কোটি ইয়েনের (প্রায় ৩২ কোটি ডলার) ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের জরুরি সহায়তার কথা বলেছে, তাও মূলত সম্ভাব্যতা যাচাই ও দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে, যা চলমান তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনে কোনো কাজে আসছে না। অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় অর্জন হলো অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে বর্তমান পর্যায় থেকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার মূল চাবিকাঠি হলো এই ইপিএ। কিন্তু চুক্তির পর কী অগ্রগতি হয়েছে, কোথায় আটকে আছে, এ বিষয়টি এখন অন্ধকারেই রয়ে গেছে। দুই জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার ও শুল্কসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়েও দুই পক্ষের বিস্তারিত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন ছিলো, যেন ব্যবসায়ীরা জানতে পারে তাদের জন্য কী ধরনের সুযোগ রয়েছে।

ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ইপিএ-এর অনুমোদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য দুই দেশের উচ্চপর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক নির্দেশনা ও রূপরেখা আসবে। সেই সঙ্গে চুক্তিটি দ্রুত বাস্তবায়িত হলে প্রায় সাত হাজারের বেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। কিন্তু সফরে এ বিষয়ে বাস্তব বা সুস্পষ্ট কোন ঘোষণা আসেনি। কবে নাগাদ এই চুক্তি কার্যকর হবে, সেই বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়নি। অবশ্য সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন। তার মতে, জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা চীনের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নয়। একইভাবে চীনের সঙ্গে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্কও জাপানের সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্বের বাধা হওয়া উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ঝালাইয়ের জন্য হয়তো একটি নিয়মিত কূটনৈতিক ধাপ ছিল, কিন্তু এটিকে গণমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি বা দৃশ্যমান পরিবর্তনের মাপকাঠিতে সফলতা বলা চলে না। জনগণের মনে যে আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি করা হয়েছিল, তার বিপরীতে প্রাপ্তিতে বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। তাই কথার আড়ম্বর আর প্রতিশ্রুতির মোহজাল কাটিয়ে দেশের স্বার্থ রক্ষা এবং বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সফল না হতে পারলে এ ধরনের সফর শুধুই আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক













