বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাকে নতুন করে সামনে এনেছে। কিন্তু মজুরি বোর্ড গঠন করলেই কি শ্রমিকদের আয় বাড়বে? বোর্ডের সুপারিশ, সরকারের পর্যালোচনা, গেজেট প্রকাশ এবং নতুন মজুরি বাস্তবে কার্যকর—প্রতিটি ধাপেই সময় লাগতে পারে। ফলে প্রশ্নটি শুধু নতুন ন্যূনতম মজুরি কত হবে, তা নিয়ে নয়; বরং বর্তমান বাজারদর, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর মতো আয় শ্রমিকেরা কবে পাবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি উঠেছে। এই দাবিকে কেবল একটি সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বিচার করলে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা চাপে পড়েছে। ফলে ৩০ হাজার টাকার দাবি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নির্ধারণের আগে দেখতে হবে একজন পোশাকশ্রমিকের পরিবারের ব্যয় মেটাতে মাসে কত টাকা প্রয়োজন এবং বর্তমান মজুরিতে সেই ব্যয়ের কতটুকু মেটানো সম্ভব।
মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত পেতে কত দিন লাগতে পারে?
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, মজুরি বোর্ড গঠনের পরই নতুন মজুরি কার্যকর হয়ে যায় না। ২০০৬ সালের শ্রম আইনের ১৩৮, ১৩৯ ও ১৪০ ধারায় এ বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।
আইনের ১৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারের নির্দেশ পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে মজুরি বোর্ডকে সুপারিশ জমা দিতে হবে। তবে বোর্ডের অনুরোধে সরকার এই সময়সীমা বাড়াতে পারে। বোর্ডকে জীবনযাত্রার ব্যয়, জীবনযাত্রার মান, উৎপাদনব্যয়, উৎপাদনশীলতা, মুদ্রাস্ফীতি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।
সুপারিশ জমা পড়ার পরও প্রক্রিয়া শেষ নয়। ১৪০ ধারা অনুযায়ী, সরকার সুপারিশ গেজেট আকারে প্রকাশ করে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে পারে। কোনো সুপারিশ মালিক বা শ্রমিকের কাছে ন্যায়সংগত মনে না হলে সরকার ৪৫ দিনের মধ্যে সেটি পুনর্বিবেচনার জন্য বোর্ডে ফেরত পাঠাতে পারে। ফলে বোর্ডের ছয় মাসের সময়সীমা এবং চূড়ান্ত মজুরি কার্যকর হওয়ার সময় এক বিষয় নয়।
অতীত অভিজ্ঞতা কী বলছে?
২০২৩ সালের মজুরি বোর্ডের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ওই বছরের ৯ এপ্রিল মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। ৬ নভেম্বর বোর্ড ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ চূড়ান্ত করে। ১২ নভেম্বর গেজেট প্রকাশিত হয়। নতুন মজুরি ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয় এবং শ্রমিকেরা জানুয়ারিতে নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পাওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ বোর্ড গঠন থেকে গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত প্রায় সাত মাস লেগেছিল। কার্যকর হওয়ার পর নতুন কাঠামোয় বেতন পাওয়ার জন্য আরও সময় প্রয়োজন হয়েছিল।
২০২৬ সালের ১ নভেম্বর সরকার নতুন ছয় সদস্যের পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এতে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিরা রয়েছেন। বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ আশফাকুর রহমান দায়িত্ব পেয়েছেন। শ্রমিক প্রতিনিধিরা হলেন বাবুল আখতার ও আনোয়ার হোসেন। মালিক প্রতিনিধিরা হলেন এ বি এম শামসুদ্দিন ও আসিফ আইয়ুব। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।
অতীতের অভিজ্ঞতা এবং আইনের সময়সীমা বিবেচনায় বোর্ডের সুপারিশ, সরকারের পর্যালোচনা ও গেজেট প্রকাশ মিলিয়ে কয়েক মাস লাগতে পারে। বোর্ড দ্রুত কাজ করলে ২০২৩ সালের মতো ছয়-সাত মাসে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়া সম্ভব। তবে এটি কোনো নিশ্চিত সময়সূচি নয়। বিশেষ করে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে কিংবা সরকার সুপারিশ পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠালে সময় আরও বাড়তে পারে।
১২ হাজার ৫০০ থেকে ৩০ হাজার: ব্যবধানটি কত বড়?
বর্তমানে পোশাকশ্রমিকের প্রবেশ-পর্যায়ের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি পূরণ হলে বর্তমান মজুরির তুলনায় ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বাড়বে। অর্থাৎ বৃদ্ধি হবে ১৪০ শতাংশ।
এই ব্যবধানকে শুধু মালিকদের উৎপাদনব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না। দেখতে হবে, একজন শ্রমিকের পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটাতে কত টাকা প্রয়োজন। ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা চাওয়ার অর্থ শুধু বেশি আয় করার আকাঙ্ক্ষা নয়; বর্তমান আয় দিয়ে জীবনধারণের সক্ষমতা কতটা কমে গেছে, সেই প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত।
বাজারদর ও আবাসন ব্যয়: মজুরির বড় অংশ কোথায় চলে যায়?
পোশাকশিল্পের অধিকাংশ শ্রমিকের বসবাস শিল্পাঞ্চলের আশপাশে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কাজের কাছাকাছি থাকতে গিয়ে তাঁদের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় বাসাভাড়া ও যাতায়াত খাতে। পরিবার নিয়ে থাকলে খাবার, শিশুর পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনের ব্যয়ও যুক্ত হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাজারদর বাড়লে সব পণ্যের খরচ একই অনুপাতে বাড়ে না। নিম্ন আয়ের পরিবারের বাজেটে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, ডিম ও অন্যান্য খাবারের অংশ তুলনামূলক বেশি। ফলে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তাঁদের ওপর মধ্যবিত্ত বা উচ্চ আয়ের পরিবারের তুলনায় বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মজুরি নির্ধারণের হিসাবেও শুধু সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ব্যবহার যথেষ্ট নয়। শ্রমিক পরিবারের প্রকৃত ভোগব্যয়, খাদ্য ও বাসাভাড়ার মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা বিবেচনা করতে হবে।
৩০ হাজার টাকার দাবির পক্ষে আন্তর্জাতিক গবেষণার কী তথ্য আছে?
শ্রমিকদের দাবির যৌক্তিকতা যাচাই করতে ২০২৫ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আনকার রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও গ্লোবাল লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশনের প্রকাশিত Living Wage Update Report: Dhaka and Satellite Cities, Bangladesh, 2025 শীর্ষক প্রতিবেদনে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্য জীবনধারণের উপযোগী মজুরির হিসাব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকায় একজন শ্রমিকের জীবনধারণের উপযোগী মাসিক মজুরি ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা। ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে এই হিসাব ২৫ হাজার ১৬৬ টাকা। অন্যদিকে, চার সদস্যের একটি পরিবারের মৌলিক প্রয়োজনসহ সম্মানজনক জীবনযাপনের আনুমানিক মাসিক ব্যয় ঢাকায় ৪৮ হাজার ২২ টাকা এবং আশপাশের শহরগুলোতে ৩৯ হাজার ৭৬২ টাকা।
এই গবেষণার তাৎপর্য হলো, শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবিটি কোনো ভিত্তিহীন বা কল্পনাপ্রসূত অঙ্ক নয়। বরং এটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় নির্ধারিত ঢাকার জীবনধারণের উপযোগী মজুরির কাছাকাছি।
তবে এখানে একটি পার্থক্য বোঝা জরুরি। জীবনধারণের উপযোগী মজুরি এবং পরিবারের মোট প্রয়োজনীয় আয় এক বিষয় নয়। গবেষণার ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা একজন শ্রমিকের জীবনধারণ উপযোগী মজুরির হিসাব। চার সদস্যের পরিবারের সব ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আরও বেশি।
অর্থাৎ ৩০ হাজার টাকা পেলেই একটি পরিবারের সব সমস্যা মিটে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকার তুলনায় এটি শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি ও বিদ্যুতের বিল: বাড়তি আয়ের বড় অংশ কোথায় যাবে?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর হিসাবে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। শহরাঞ্চলে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
এখানে শুধু মূল্যস্ফীতির বার্ষিক হার দেখলে শ্রমিকদের প্রকৃত দুরবস্থা পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ আগের বছরগুলোতে পণ্যের দাম যে পর্যায়ে বেড়েছে, তার ওপর নতুন মূল্যবৃদ্ধি যোগ হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণত পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের ব্যয়। ২০২৬ সালের ৩ জুন ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় খুচরা মূল্য প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে। বৃদ্ধির হার ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আবাসিক গ্রাহকদের বিভিন্ন ব্যবহারের স্তরেও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।
পোশাকশ্রমিকের পরিবারের জন্য বিদ্যুতের বিল শুধু একটি পরিষেবা ব্যয় নয়। ঘরের আলো, পাখা, রান্নার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি এবং সন্তানদের পড়াশোনার প্রয়োজনেও বিদ্যুৎ লাগে। একই সঙ্গে গ্যাসের দাম, পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের খরচ বাড়ায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারদরেও পড়ে।
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যায়। সরকার ভর্তুকি দিয়ে সেই চাপের একটি অংশ সামাল দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তার আর্থিক প্রভাব থাকে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়লে কারখানার উৎপাদনব্যয়ও বাড়ে। অর্থাৎ শ্রমিক একই সঙ্গে দুই দিক থেকে চাপে পড়েন—নিজের পরিবারের বিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিল দিতে হয়, আবার উৎপাদনব্যয় বৃদ্ধির যুক্তিতে মালিকপক্ষ মজুরি বৃদ্ধিতে আপত্তি তোলে।
শ্রমিকের আয় বাড়লেও দারিদ্র্য কেন দূর হচ্ছে না?
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এন্টারপ্রেনারশিপ ডেভেলপমেন্টসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ২০২৪ সালে প্রকাশিত যৌথ গবেষণায় ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকদের আয়-ব্যয়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, একক উপার্জনকারী পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল ১৮ হাজার ৫২৪ টাকা। এর বিপরীতে পরিবারের গড় মাসিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ১৯৩ টাকা।
গবেষণায় একক উপার্জনকারী পরিবারের গড় মাসিক বাড়িভাড়া ৩ হাজার ৪৮১ টাকা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় ৬ হাজার ৭৩০ টাকা, চিকিৎসা ব্যয় ১ হাজার ২৩১ টাকা এবং শিক্ষার ব্যয় ৯৬৯ টাকা পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে একক উপার্জনকারী পরিবারের নিত্যপণ্যের ব্যয় বেড়েছিল ৩০ শতাংশ এবং চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছিল ৩০ শতাংশ।
অর্থাৎ আয় বাড়লেও ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলানো যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকেরা খাবারের পরিমাণ ও মান কমিয়ে সংসার চালান। গবেষণাটিতে খাবার কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতিরিক্ত কাজের (ওভারটাইমের) আয়কে নিয়মিত মজুরির বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অতিরিক্ত কাজ সব সময় পাওয়া যায় না। অসুস্থতা, কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়া কিংবা অর্ডার না থাকলে শ্রমিকের আয়ও কমে যায়। অথচ বাসাভাড়া, খাবার ও অন্যান্য ব্যয় কমে না।
মালিকদের আপত্তি কতটা যৌক্তিক?
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির বিপরীতে পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষেরও কিছু বাস্তব উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের কাছ থেকে পোশাকের দাম প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। উৎপাদনব্যয়, জ্বালানি, কাঁচামাল আমদানি ও পরিবহন খরচ বেড়েছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে চীন, ভিয়েতনাম, ভারতসহ অন্যান্য উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।
রয়টার্সের ১ নভেম্বরের প্রতিবেদনেও মালিকপক্ষের বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। মালিকপক্ষের মতে, সীমিত মুনাফা ও উৎপাদনব্যয়ের চাপে এক ধাপে এত বড় মজুরি বৃদ্ধি দেওয়া কঠিন। একই সঙ্গে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মজুরি এমন পর্যায়ে নির্ধারণ করা দরকার, যাতে শ্রমিকের জীবনধারণ নিশ্চিত হয় এবং শিল্পের উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
তবে মালিকদের উৎপাদনব্যয়ের যুক্তি দিয়ে শ্রমিকের জীবনধারণের প্রয়োজনকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে রাখাও গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পোশাকের ক্রয়মূল্য নির্ধারণের সময় শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, পরিবেশগত মান ও উৎপাদনব্যয়ের বাস্তব হিসাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। শুধু কম দামে পণ্য কেনার প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে উৎপাদনকারী দেশের শ্রমিকদের ওপরই শেষ পর্যন্ত ব্যয়ের চাপ পড়ে।
সরকার ৩০ হাজার টাকা না দিলে কী হবে?
সরকার যদি ৩০ হাজার টাকার দাবি পুরোপুরি গ্রহণ না করে, তাহলে নতুন ন্যূনতম মজুরি কত নির্ধারণ করা হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে সামান্য বৃদ্ধি শ্রমিকদের জীবনযাত্রার সংকট দূর করতে পারবে না।
মজুরি বোর্ডের সামনে অন্তত পাঁচটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
প্রথমত, ঢাকাসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুধু খাদ্য নয়, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের খরচ হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। তৃতীয়ত, বিভিন্ন গ্রেডের শ্রমিকদের মজুরির ব্যবধান যৌক্তিক রাখতে হবে। চতুর্থত, নতুন মজুরি ঘোষণার পর তা বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর তদারকি থাকতে হবে। পঞ্চমত, প্রতি তিন বছর অন্তর মজুরি পুনর্নির্ধারণের আইনি বিধান যথাসময়ে কার্যকর করতে হবে।
সরকার ও মালিকপক্ষের বিবেচনায় একবারে ৩০ হাজার টাকা কার্যকর করা কঠিন হলে বাস্তবসম্মত বাস্তবায়নসূচি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে সেই প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের জীবনধারণের প্রয়োজনকে প্রধান বিবেচনায় রাখতে হবে। কোনো ধাপে মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলে পরবর্তী ধাপের সময়সীমা ও অঙ্কও স্পষ্ট করতে হবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য মজুরি বাড়ানোর আশ্বাস শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান নয়।
মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি
শুধু মজুরি বাড়িয়ে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার সংকট পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, গণপরিবহনের ব্যয় কমানো এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যয় সহনীয় রাখার উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ ছাড়া শ্রমিকদের জন্য টিসিবির পণ্য সরবরাহ আরও সহজ করা, শিল্পাঞ্চলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুদের জন্য সাশ্রয়ী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মজুরির ওপর চাপও কিছুটা কমবে।
মজুরি বোর্ডের পরীক্ষা শুধু কত টাকা নির্ধারণ হলো, তা নয়
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত। এই শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী আয় নিশ্চিত করা। এক পক্ষের স্বার্থকে অন্য পক্ষের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া যাবে না।
২০২৬ সালের ১ নভেম্বর গঠিত নতুন মজুরি বোর্ডের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বর্তেছে। তারা শুধু নতুন একটি বেতনকাঠামো নির্ধারণ করবে না, বরং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শ্রমিকের ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান কী হওয়া উচিত, সেটিও বিবেচনা করবে।
৩০ হাজার টাকার দাবিটি গ্রহণ করা হবে কি না, সেটি বোর্ডের আলোচনার বিষয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক জীবনধারণ মজুরির গবেষণা, দেশের মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং শ্রমিক পরিবারের আয়-ব্যয়ের তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট—১২ হাজার ৫০০ টাকার মজুরিতে একজন শ্রমিকের পক্ষে সম্মানজনক জীবনযাপন করা অত্যন্ত কঠিন।
মজুরি বোর্ড যদি কেবল মালিকদের সামর্থ্য ও শিল্পের উৎপাদনব্যয়কে বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার সংকট অমীমাংসিত থেকে যাবে। আবার শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা না করে সিদ্ধান্ত নিলেও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
প্রকৃত সমাধান হলো, শ্রমিকের জীবনধারণের ব্যয়কে ভিত্তি ধরে মালিক, শ্রমিক ও সরকারের মধ্যে একটি কার্যকর সমঝোতা তৈরি করা। কারণ যে শিল্পের সাফল্যের পেছনে লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রম রয়েছে, সেই শিল্পের শ্রমিকদের নিজেদের জীবনধারণের সামর্থ্য না থাকলে তার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।












