আজকের যানজট, জনঘনত্ব ও ব্যস্ত নগরজীবনের ঢাকা থেকে কয়েক শতাব্দী পেছনে তাকালে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শহর। মোগল আমলে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা সেই ঢাকা ছিল প্রশাসন, বাণিজ্য, কারুশিল্প ও নদীকেন্দ্রিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশেষ করে মোগল সুবাদার শায়েস্তা খাঁর শাসনামলে শহরটির পরিচিতি ও সমৃদ্ধি নতুন মাত্রা লাভ করে। বাংলার রাজধানী হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব, মসলিনের খ্যাতি, নদীপথের বাণিজ্য এবং নতুন স্থাপনা—সব মিলিয়ে তখনকার ঢাকা হয়ে উঠেছিল উপমহাদেশের উল্লেখযোগ্য নগরকেন্দ্রগুলোর একটি।
শায়েস্তা খাঁর সময়ের ঢাকাকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর শাসনকাল বিবেচনা করলেই হবে না; শহরটির ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক শক্তি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনও দেখতে হয়। বুড়িগঙ্গার তীর, নদীপথে পণ্য পরিবহন, তাঁতিদের বসতি, বাজার ও প্রশাসনিক স্থাপনা—এসবের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল মোগল ঢাকার স্বতন্ত্র পরিচয়।
রাজধানীর মর্যাদা ও নদীপথের গুরুত্ব
ঢাকাকে মোগল বাংলার রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার কৃতিত্ব মূলত সুবাদার ইসলাম খাঁর। ১৬০৮ থেকে ১৬১০ সালের মধ্যে তিনি বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্র রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। পরে সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম অনুসারে শহরটির নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীরনগর। বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থান এবং আশপাশের নদ-নদীর মাধ্যমে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা ঢাকাকে প্রশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল।

শায়েস্তা খাঁ ১৬৬০-এর দশকে বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর শাসনামলে ঢাকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়ে। চট্টগ্রাম মোগলদের নিয়ন্ত্রণে আসার পর উপকূলীয় অঞ্চলে পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের তৎপরতা মোকাবিলার ক্ষেত্রেও ঢাকার কৌশলগত গুরুত্ব বেড়ে যায়। নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা ছিল মোগল শাসনের অন্যতম লক্ষ্য।
তখনকার ঢাকা আজকের মতো পরিকল্পিত নগরী ছিল না। শহরটি বুড়িগঙ্গার তীর ধরে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছিল। নদীর কাছাকাছি উঁচু ও তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর স্থানে বসতি গড়ে উঠত। নদীপথ ছিল যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের প্রধান অবলম্বন। ফলে ঢাকার নগরজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বসতির বিন্যাস—সবকিছুর সঙ্গেই বুড়িগঙ্গার গভীর সম্পর্ক ছিল।
মসলিনের খ্যাতি, বাজারের ব্যস্ততা
শায়েস্তা খাঁর আমলে ঢাকার অর্থনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল বস্ত্রশিল্প। বিশেষ করে সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে তৈরি মসলিন তখন দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছিল। ঢাকার পাশাপাশি সোনারগাঁ, ধামরাই, বিক্রমপুর এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় মসলিন ও অন্যান্য সূক্ষ্ম কাপড় তৈরি হতো। তাঁতি, সুতা প্রস্তুতকারক, রংকার, নকশাকার ও ব্যবসায়ীদের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল একটি বিস্তৃত উৎপাদনব্যবস্থা।
মোগল প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় বিশেষ কর্মশালা বা উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। রাজপরিবারের জন্য উৎকৃষ্ট মানের কাপড় তৈরির ব্যবস্থাও ছিল। ইউরোপীয় বণিকদের আগমন এই শিল্পের বাজার আরও বিস্তৃত করে। ডাচরা ১৬৬৩ সালে ঢাকায় বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে; পরে ইংরেজ ও ফরাসি বণিকেরাও এখানে ব্যবসা শুরু করে। আরব, পারস্য, আর্মেনীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বণিকদের উপস্থিতিও ঢাকাকে বহুজাতিক বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করেছিল।

শুধু মসলিন নয়, পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাল, তেল, চিনি, মধু, মসলা, পাট ও নানা ধরনের পণ্য ঢাকার বাজারে আসত। এসব পণ্যের একাংশ শহরের মানুষের চাহিদা মেটাত, বাকিগুলো অন্য অঞ্চলে পাঠানো হতো। মোগল আমলে ঢাকায় মুদ্রা তৈরির টাকশালও ছিল। এসব কার্যক্রম শহরের বাণিজ্যিক গুরুত্বের পরিচয় বহন করে।
লালবাগ কেল্লা: শাসন ও স্থাপত্যের স্মারক
শায়েস্তা খাঁর সময়ের ঢাকার স্থাপত্যের কথা উঠলে লালবাগ কেল্লার প্রসঙ্গ আসবেই। তবে ১৬৭৮ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে শাহজাদা মুহাম্মদ আজম কেল্লাটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। পরে শায়েস্তা খাঁ নির্মাণকাজ এগিয়ে নেন। ১৬৮৪ সালে তাঁর কন্যা পরী বিবির মৃত্যুর পর কেল্লার কাজ বন্ধ হয়ে যায় বলে প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ফলে কেল্লাটির নির্মাণকাজ অসমাপ্ত থেকে যায়।
কেল্লাটি প্রশাসনিক কেন্দ্র, সুবাদারের বাসস্থান ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মসজিদ, পরী বিবির সমাধি, প্রবেশদ্বার ও দুর্গপ্রাচীর মোগল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বহন করে। বুড়িগঙ্গার কাছাকাছি এর অবস্থানও সে সময়ের নগর ও সামরিক পরিকল্পনায় নদীর গুরুত্ব তুলে ধরে।

যে নগরীর স্মৃতি আজও রয়ে গেছে
শায়েস্তা খাঁর শাসনামলে ঢাকা শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল না; এটি ছিল উৎপাদন, বাণিজ্য, নদীপথের যোগাযোগ ও বহুজাতিক ব্যবসার মিলনস্থল। মসলিনের তাঁত, ব্যস্ত বাজার, বণিকদের আনাগোনা এবং মোগল স্থাপত্য শহরটির পরিচয় তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে রাজধানীর মর্যাদা হারালেও ঢাকার বাণিজ্যিক গুরুত্ব পরবর্তী সময়েও বজায় ছিল।
আজকের পুরান ঢাকার অলিগলি, মোগল আমলের স্থাপনা এবং বুড়িগঙ্গার তীর সেই অতীতের কিছু স্মৃতি বহন করছে। সময়ের সঙ্গে শহরের চেহারা বদলেছে, নদীর সঙ্গে শহরের সম্পর্কও দুর্বল হয়েছে। কিন্তু কয়েক শতাব্দী আগে যে নদীবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রকে ঘিরে ঢাকার বিকাশ ঘটেছিল, শায়েস্তা খাঁর শাসনামল তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।












