ঢাকার পুরান ঢাকার শ্যামবাজার একসময় ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। বিশেষ করে সবজি ও কৃষিপণ্যের পাইকারি বেচাকেনায় এই বাজারের পরিচিতি ছিল আলাদা। নব্বইয়ের দশকে শ্যামবাজারের সকাল শুরু হতো ট্রাক, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি আর কুলি ও শ্রমিকদের ব্যস্ততায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সবজি এখানে জমা হতো। সেখান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের হাত ধরে পণ্য পৌঁছে যেত ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজারে।
সেই সময়ের শ্যামবাজারের সঙ্গে আজকের বাজারের তুলনা করলে শুধু পণ্যের দাম বা বেচাকেনার ধরন নয়, বদলে যাওয়া শহরের অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা, মানুষের খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যবসার সংস্কৃতির চিত্রও পাওয়া যায়।
নব্বইয়ের দশকে ঢাকার জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল। নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠছিল, শহরের সীমানা বিস্তৃত হচ্ছিল। সেই সঙ্গে বাড়ছিল প্রতিদিনের খাদ্যপণ্যের চাহিদা। শ্যামবাজারের মতো পাইকারি বাজারগুলো এই ক্রমবর্ধমান শহরের খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
নদীপথ, আড়ত আর ভোরের ব্যস্ততা
নব্বইয়ের দশকে শ্যামবাজারের বাণিজ্যের সঙ্গে বুড়িগঙ্গার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নৌকা, ট্রলার ও অন্যান্য নৌযানে কৃষিপণ্য ঢাকায় আসত। নদীর ঘাটে পণ্য নামানোর পর শ্রমিকেরা মাথায় বা কাঁধে করে কিংবা ঠেলাগাড়িতে সেগুলো আড়তে নিয়ে যেতেন।
মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, চাঁদপুর, ফরিদপুর, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসত নানা ধরনের কৃষিপণ্য। মৌসুম অনুযায়ী বাজারে দেখা মিলত নতুন আলু, বেগুন, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, কুমড়া, শিম, কাঁচামরিচ ও নানা ধরনের শাকসবজির।
পণ্য আসার সময়ের ওপর বাজারের ব্যস্ততা অনেকটাই নির্ভর করত। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলত পণ্য ওঠানো-নামানো, বাছাই, দরদাম ও পাইকারি বিক্রি। শহরের বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা ভোরেই বাজারে এসে দিনের পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন।
আড়তদার, পাইকার ও শ্রমিকের বাজার
শ্যামবাজারের অর্থনীতি শুধু সবজি কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কৃষক, ফড়িয়া, আড়তদার, পাইকার, পরিবহনশ্রমিক, কুলি ও খুচরা বিক্রেতারা। গ্রাম থেকে কৃষিপণ্য সংগ্রহ করে ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছিল একটি বিস্তৃত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক।
নব্বইয়ের দশকে যোগাযোগব্যবস্থা আজকের মতো সহজ ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে কৃষিপণ্য ঢাকায় পৌঁছাতে অনেক সময় লাগত। পরিবহনের সময় পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও ছিল। ফলে দ্রুত পণ্য বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের জন্য জরুরি ছিল।
আড়তগুলোতে পণ্য আসার পর শুরু হতো দরদাম। বড় পাইকারেরা একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সবজি কিনতেন। পরে সেগুলো চলে যেত ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বাজারে। ছোট ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক কম পরিমাণে কিনে নিজেদের এলাকার দোকান বা বাজারে বিক্রি করতেন।
এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই শ্যামবাজার হয়ে উঠেছিল ঢাকার খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
তখনকার বাজার আর মানুষের কেনাকাটা
নব্বইয়ের দশকের ঢাকায় আজকের মতো বড় সুপারশপ বা অনলাইনভিত্তিক বাজারের প্রচলন ছিল না। অধিকাংশ পরিবার দৈনন্দিন সবজি কিনত পাড়ার কাঁচাবাজার থেকে। এসব বাজারে সবজি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল শ্যামবাজারের মতো পাইকারি আড়ত।
তখনকার বাজারে দরদামের একটি আলাদা সংস্কৃতি ছিল। ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি কথাবার্তা, পরিচিত দোকানির কাছ থেকে কেনাকাটা এবং পণ্যের মান দেখে দাম ঠিক করা ছিল পরিচিত চিত্র।
সবজির দাম নির্ভর করত মৌসুম, উৎপাদন, পরিবহন খরচ ও বাজারে সরবরাহের ওপর। কোনো এলাকায় অতিবৃষ্টি বা বন্যা হলে তার প্রভাব পড়ত ঢাকার বাজারেও। আবার শীতের মৌসুমে বিভিন্ন ধরনের সবজির সরবরাহ বাড়লে দামেও পরিবর্তন আসত।
বদলে গেছে পরিবহন, বদলায়নি বাজারের ব্যস্ততা
সময়ের সঙ্গে শ্যামবাজারের বাণিজ্যিক পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। আগে নদীপথে কৃষিপণ্য পরিবহনের যে গুরুত্ব ছিল, এখন সড়কপথে ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনও সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পণ্য সরাসরি ঢাকায় পৌঁছানোর সুযোগ বেড়েছে।
তবে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি। এখনো নদীপথে পণ্য পরিবহন এবং নৌযানের মাধ্যমে বিভিন্ন বাজারে সবজি পৌঁছে দেওয়ার চিত্র দেখা যায়।
২০১০ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে শ্যামবাজারে প্রায় ৩৭৫টি দোকান থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এসব দোকানের মধ্যে গুদাম, আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানও ছিল। বাজারটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও ব্যবসার বৈচিত্র্য এই তথ্য থেকে বোঝা যায়।
ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন সংকট
শ্যামবাজারের গুরুত্ব থাকলেও সময়ের সঙ্গে বাজারটির সামনে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। পুরান ঢাকার সরু রাস্তা, যানজট, পণ্য ওঠানো-নামানোর জায়গার সংকট এবং সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবজি দ্রুত পচনশীল পণ্য। সময়মতো বিক্রি করতে না পারলে ব্যবসায়ীদের লোকসান হয়। আধুনিক হিমাগার, স্বাস্থ্যসম্মত সংরক্ষণব্যবস্থা এবং উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবও বাজার পরিচালনাকে কঠিন করে তোলে।
অন্যদিকে, ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যপণ্যের চাহিদাও বেড়েছে। সেই চাহিদা পূরণে শ্যামবাজারের মতো পাইকারি বাজারের গুরুত্ব এখনো রয়েছে।
নব্বইয়ের দশকের শ্যামবাজারকে মনে করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বুড়িগঙ্গার ঘাট, সবজিভর্তি নৌকা, মাথায় বোঝা নিয়ে ছুটে চলা শ্রমিকেরা, আড়তদারদের দরদাম আর ভোরের ব্যস্ততা। সময় বদলেছে, পরিবহন বদলেছে, ব্যবসার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু কৃষকের মাঠ থেকে ঢাকার মানুষের রান্নাঘরে সবজি পৌঁছে দেওয়ার যে বিশাল কর্মযজ্ঞ, তাতে শ্যামবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এখনো অটুট।












