ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে লক্ষ্য করে কঠোর রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনে ভোট চুরির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা হয়েছে। এ ঘটনায় ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাগারে যেতে হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
রোববার দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধীদের জোট ইন্ডিয়া (ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স) আয়োজিত সমাবেশে এসব কথা বলেন কংগ্রেস নেতা। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার প্রতিবাদ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
মোদি-শাহের বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
রাহুল গান্ধী বলেন, অমিত শাহ দাবি করেছেন নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না। কিন্তু তাঁর বক্তব্য, মোদি নিজে চলে যেতে চাইলেও বিরোধীরা তাঁকে যেতে দেবে না। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর মোদি ও অমিত শাহের বিরুদ্ধেও একইভাবে আইনি পদক্ষেপের দাবি জানানো হবে।

তিনি বলেন, ভোট চুরির অভিযোগের বিচার হতে হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানো দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ হবে।
রাহুলের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা ছাড়া নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী এবং অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারতেন না। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন এনডিএ জোট ও বিরোধীদের মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। তাঁর দাবি, ওই নির্বাচন অবৈধ ছিল এবং ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি ভারতের মোট ভোটারের প্রায় ১৫ শতাংশ।
তবে ভোটার বাদ দেওয়ার সংখ্যা ও নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে রাহুলের এসব বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ; সমাবেশে তিনি এগুলোর পক্ষে বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার প্রতিশ্রুতি
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাকে সাধারণ চুরি হিসেবে দেখতে রাজি নন রাহুল। তাঁর মতে, এটি প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর কেড়ে নেওয়ার শামিল। তিনি একে আইনের ভাষায় অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের পর্যায়ের বিষয় বলে উল্লেখ করেন।
সমাবেশে উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই জমায়েত শুধু কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার কণ্ঠস্বর নয়। তরুণ, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি জানিয়ে দিচ্ছে, ভারতের গণতন্ত্র ও সংবিধান ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং বিজেপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগও করেন তিনি। তবে তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা বিদ্বেষ ছড়ানোর পথ অনুসরণ করা হবে না বলে জানান। মোদি, শাহ কিংবা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধেও সহিংসতার পক্ষে নন বলে উল্লেখ করেন রাহুল। তাঁর বক্তব্য, ভালোবাসার পথেই রাজনৈতিক লড়াই চলবে, কিন্তু সংবিধান ধ্বংসের চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।
বিরোধী নেতাদেরও কড়া বক্তব্য

সমাবেশে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করেন, জনগণ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করছে না; বরং প্রধানমন্ত্রীই ঠিক করছেন কারা ভোটার হবেন। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও দাবি করেন, বিজেপি শুধু নিজেদের সমর্থকদেরই ভোটার ও ভারতের নাগরিক হিসেবে দেখতে চায়।
উত্তর প্রদেশে ভোটার তালিকা থেকে ১ কোটি ২৭ লাখ হিন্দু ভোটারের নাম বাদ পড়েছে বলে বিজেপির বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে অখিলেশ বলেন, প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে গড়ে ৩১ হাজার ভোট কমেছে। তাঁর দাবি, বিরোধী জোটের প্রতিবাদের কারণেই বিজেপি এখন নিজেদের সমর্থকদের ভোট বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়েও উদ্বিগ্ন।
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি বাংলার সম্পদ লুট করেছে। তবে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে বিরোধীরা পিছু হটবে না।
রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদব রামলীলা ময়দানের সমাবেশকে মহাভারতের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর বক্তব্য, ভোটের লড়াইকে এখন কুরুক্ষেত্রের মতো রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিণত করতে হবে।
ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রধান ফারুক আবদুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারদের অনুপ্রবেশকারী বলা হলে উত্তর প্রদেশের বাদ পড়া হিন্দু ভোটাররাও কি পাকিস্তানি? পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি আবার অযোধ্যার রামমন্দিরের অনুদান চুরির অভিযোগ তুলে বিজেপিকে আক্রমণ করেন।
বামপন্থী দলগুলোর নেতারাও সমাবেশে বক্তব্য দেন। সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি ভোট চুরির বিরুদ্ধে আন্দোলনকে দ্বিতীয় স্বাধীনতাসংগ্রাম বলে অভিহিত করেন। সিপিআইএমএল লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের অভিযোগ, বিজেপি দেশকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
সমাবেশে কংগ্রেসের সোনিয়া গান্ধীসহ ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধীদের সম্মিলিত প্রতিবাদই ছিল এই সমাবেশের মূল বিষয়।
ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন এবং মোদি সরকারের বিরুদ্ধে রাহুল গান্ধীর নতুন রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি।












