ইতালিতে জন্ম, বিয়ে করে ভারতে আসা, তারপর ধীরে ধীরে দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা—সোনিয়া গান্ধীর জীবন যেন আধুনিক ভারতের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়। প্রায় ছয় দশক ধরে নেহরু-গান্ধী পরিবারের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ভারতের ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক সংঘাত, পারিবারিক ট্র্যাজেডি এবং কংগ্রেসের উত্থান-পতন। এবার নিজের আত্মজীবনীতে সেই জীবনের নানা অজানা অধ্যায় সামনে আনতে যাচ্ছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথমবারের মতো সক্রিয় হয়ে নিজের আসন্ন বই ‘বিলং: আ জার্নি অব লাভ’-এর প্রচার শুরু করেছেন ৮০ বছর বয়সী সোনিয়া। আগামী ১০ নভেম্বর বইটি প্রকাশিত হওয়ার কথা। বইটি ঘিরে ইতোমধ্যে ভারত ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সোনিয়া নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছেন, বইটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
১৯৬৮ সালে রাজীব গান্ধীকে বিয়ে করে ভারতে আসেন সোনিয়া। ১৯৯১ সালে স্বামীর হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ১৯৮৪ সালে শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার ঘটনাও তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। ইন্দিরা গান্ধী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়েও বলেছিলেন ‘না’

সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা। লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হওয়ার পর তিনি কংগ্রেস সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। নতুন সরকার গঠনের জন্য তাঁর পথও প্রায় প্রস্তুত ছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম তাঁকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানানোর চিঠিও প্রস্তুত রেখেছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজে প্রধানমন্ত্রী না হয়ে মনমোহন সিংকে ওই দায়িত্ব দেন সোনিয়া।
ভারতের রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ প্রত্যাখ্যানের ঘটনা বিরল। এর আগে বামপন্থী নেতা জ্যোতি বসু ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব পেয়েও দলের সিদ্ধান্তে দায়িত্ব নেননি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভি পি সিংও একই বছর দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
তবে সোনিয়ার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল আলাদা। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে তিনি এমন এক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন, যা অন্য পরিস্থিতিতে পাওয়া কঠিন হতে পারত।
তিন প্রধানমন্ত্রীর সময় ক্ষমতার কেন্দ্রে
সোনিয়া গান্ধীকে ভারতের রাজনীতিতে ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী না হলেও তিন প্রধানমন্ত্রীর শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছেন। তাঁরা হলেন তাঁর স্বামী রাজীব গান্ধী, পি ভি নরসিমা রাও এবং মনমোহন সিং।

রাজীব গান্ধী ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। নরসিমা রাও ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল এবং মনমোহন সিং ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
এই সময় ভারতের রাজনীতিতে মণ্ডল কমিশন ও অযোধ্যা আন্দোলন, কাশ্মীর ও পাঞ্জাবের অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে বৈদেশিক লেনদেনের সংকটের মুখে নরসিমা রাও সরকারের সময় ভারতের অর্থনীতি উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
২০১২ সালে ফোর্বস সাময়িকী বিশ্বের ষষ্ঠ ক্ষমতাধর নারী হিসেবে সোনিয়া গান্ধীর নাম প্রকাশ করে। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, লালু প্রসাদ যাদব ও মায়াবতীর মতো বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেও তিনি ভূমিকা রাখেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির সঙ্গেও তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল। বাম দলগুলোর সমর্থনে পরিচালিত কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সঙ্গে বামপন্থীদের টানাপোড়েন কমাতেও তিনি কাজ করেছেন।
ভাঙনের মুখে কংগ্রেসকে ধরে রাখার চেষ্টা
১৯৯৭ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন সোনিয়া। তখন কংগ্রেস সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। ১৯৯৮ সালে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘ ২২ বছর তিনি কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কার বহু প্রভাবশালী নেতার চেয়েও দীর্ঘ সময় দলের সভাপতি থাকার রেকর্ড গড়েন তিনি।
তাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস ২০০৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফেরে। পরে তথ্য অধিকার আইন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইনের মতো অধিকারভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণেও তাঁর ভূমিকা ছিল। ২০০৯ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হয়।

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর কংগ্রেস থেকে দূরে সরে যাওয়া সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রেও তিনি ভূমিকা রাখেন। তবে পরিবর্তিত হিন্দু ভোটারদের মনোভাব বুঝতে ব্যর্থ হওয়া এবং দলের ক্রমাগত সাংগঠনিক দুর্বলতা ঠেকাতে না পারা তাঁর নেতৃত্বের বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে আলোচিত। ছেলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে দলের নেতৃত্ব নিজের হাতে ধরে রেখেছিলেন—এমন সমালোচনাও রয়েছে।
‘বাইরের মানুষ’ থেকে পরিবারের উত্তরাধিকারী
সোনিয়ার আত্মজীবনীর শিরোনাম ‘বিলং’ বা আপন হয়ে ওঠার ধারণাটিকে সামনে এনেছে। তিনি নেহরুর কন্যা ছিলেন না, ইন্দিরার মতো জন্মসূত্রে রাজনৈতিক পরিবারের অংশও ছিলেন না। বিয়ের মাধ্যমে পরিবারে প্রবেশ করলেও ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন নেহরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারের অন্যতম রক্ষক।
বইটিতে রাজীবের সঙ্গে তাঁর প্রেম ও পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি পরিবারের রাজনৈতিক ভূমিকা ও ত্যাগের বিষয়ও উঠে আসতে পারে। বিশেষ করে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বংশানুক্রমিক রাজনীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বইটির বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর একসময় কংগ্রেস নেতারাই সোনিয়াকে দলের নেতৃত্বে আনতে আগ্রহী হয়েছিলেন। রাজনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ সেই নারীই পরবর্তী সময়ে দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

ভারতের রাজনীতিতে সোনিয়া গান্ধীর এই দীর্ঘ যাত্রা কীভাবে সম্ভব হলো, রাজীবের মৃত্যুর পর তিনি কীভাবে নিজেকে সামলে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ কেন প্রত্যাখ্যান করলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন পাঠকেরা। ১০ নভেম্বর প্রকাশিতব্য আত্মজীবনীটি তাই শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রীর ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা নয়, ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠতে পারে।
সোনিয়া গান্ধীর আত্মজীবনী ‘বিলং’ প্রকাশিত হচ্ছে ১০ নভেম্বর। ইতালিতে জন্ম থেকে ভারতের রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছানোর দীর্ঘ যাত্রায় উঠে আসতে পারে রাজীব গান্ধী, কংগ্রেসের ক্ষমতা এবং নেহরু-গান্ধী পরিবারের অজানা অধ্যায়।












