প্রাচীন ভারতের ইতিহাস বলতে একসময় সাধারণ পাঠকের চোখে ভেসে উঠত রাজা-বাদশাহ, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন এবং রাজবংশের দীর্ঘ তালিকা। কিন্তু ইতিহাসকে শুধু শাসকদের কাহিনি হিসেবে দেখেননি ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার। তাঁর গবেষণায় ইতিহাসের কেন্দ্রে এসেছে সাধারণ মানুষ, সমাজের পরিবর্তন, অর্থনীতি, ধর্মীয় ভাবনা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক। প্রাচীন ভারতকে বোঝার এই পদ্ধতি তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ইতিহাসবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
লখনউ থেকে বিশ্ব ইতিহাসচর্চায়
রোমিলা থাপার ১৯৩১ সালে ভারতের লখনউয়ে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব কেটেছে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। তাঁর বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীর চিকিৎসক। বাবার কর্মস্থল বদলের কারণে পরিবারকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হতো। দেশভাগের আগের উপমহাদেশের বিচিত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে তাঁর পরিচয় পরবর্তী চিন্তাজগৎকে প্রভাবিত করেছিল বলে তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাগত জীবনের শুরু হয়। পরে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির ইমেরিটাস অধ্যাপক। ইতিহাসচর্চায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেস তাঁকে আজীবন অবদানের জন্য ক্লুজ পুরস্কার প্রদান করে।
রাজাদের ইতিহাসের বাইরে সমাজের অনুসন্ধান
থাপারের গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রাচীন ইতিহাসকে কেবল রাজবংশ ও সাম্রাজ্যের ধারাবিবরণী হিসেবে না দেখা। তিনি অনুসন্ধান করেছেন, একটি সমাজ কীভাবে গড়ে উঠেছে, অর্থনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে বদলেছে, ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সামাজিক কাঠামোর সম্পর্ক কী এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই অনুসন্ধানে তিনি সাহিত্যিক ও ধর্মীয় গ্রন্থের পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, শিলালিপি, মুদ্রা, ভাষাতাত্ত্বিক তথ্য এবং লোককথা ব্যবহার করেছেন। সংস্কৃত ও পালি ভাষার সাহিত্য, জৈন ঐতিহ্যসহ বিভিন্ন ধারার উপাদান মিলিয়ে অতীতকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাছে কোনো একটি গ্রন্থ বা প্রচলিত বর্ণনাই ইতিহাসের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; বিভিন্ন উৎসের তথ্য যাচাই ও তুলনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি।
১৯৬৬ সালে প্রকাশিত ‘আ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ তাঁর বহুল আলোচিত বইগুলোর একটি। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ‘অশোক অ্যান্ড দ্য ডিক্লাইন অব দ্য মৌর্যাজ’ গ্রন্থে তিনি মৌর্য সম্রাট অশোকের শাসন ও মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন। ‘ফ্রম লিনিয়েজ টু স্টেট’ বইয়ে আত্মীয়তাভিত্তিক সামাজিক কাঠামো থেকে রাষ্ট্রব্যবস্থায় উত্তরণের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করেছেন। আর ‘আর্লি ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে প্রাচীন ভারতের দীর্ঘ সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন তুলে ধরেছেন।
ইতিহাস যখন পরিচয়ের বিতর্কে
থাপারের ইতিহাসচর্চা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্কুলের ইতিহাসের বই লেখার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল। তবে তাঁর বই ও গবেষণা বিভিন্ন সময়ে বিতর্কের মুখে পড়েছে। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসকে একক ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা, আর্যদের আগমন ও পরিচয় নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা এবং ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে ধর্মীয় ঐতিহ্য বিশ্লেষণ করার কারণে তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
তাঁর আপত্তির মূল জায়গাটি ইতিহাসচর্চার পদ্ধতি। কোনো জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর অতীতকে গৌরবোজ্জ্বল করে দেখানোর জন্য তথ্য বাছাই করা কিংবা অস্বস্তিকর প্রমাণ এড়িয়ে যাওয়া প্রকৃত ইতিহাসচর্চার পদ্ধতি হতে পারে না। একইভাবে ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সেই ধারণাকেও তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন, যেখানে ভারতীয় সমাজকে দীর্ঘকাল অপরিবর্তিত ও স্থবির হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তাঁর গবেষণায় বরং দেখা যায়, এই অঞ্চলের মানুষ, বিশ্বাস, ভাষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সময়ের সঙ্গে বদলেছে এবং পরস্পরের সঙ্গে মিশেছে।
অতীতকে দেখার পদ্ধতি নিয়েই তাঁর জোর
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে রোমিলা থাপার ইতিহাস জানার পদ্ধতি সাধারণ পাঠকের কাছে সহজভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। নামিত অরোরার সঙ্গে তাঁর লেখা ‘স্পিকিং অব হিস্ট্রি: কনভারসেশনস অ্যাবাউট ইন্ডিয়াজ পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’ বইয়ের প্রসঙ্গে তিনি ব্যাখ্যা করেন, ইতিহাস শুধু কী ঘটেছিল, তা বলার বিষয় নয়; কেন এবং কীভাবে ঘটনা ঘটেছিল, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হয়।
একই ঘটনা নিয়ে ইতিহাসবিদদের ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে। তাঁরা ভিন্ন প্রশ্ন করতে পারেন, ভিন্ন প্রমাণ বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিতে পারেন। তবে সেই ব্যাখ্যার ভিত্তি হতে হবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও যুক্তি। অতীতের কোনো ব্যক্তিকে বা ঘটনাকে বর্তমানের ধারণা দিয়ে বিচার করলে ইতিহাসের নিজস্ব সময় ও সামাজিক বাস্তবতা আড়াল হয়ে যেতে পারে—এই সতর্কতাও তাঁর আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
রোমিলা থাপারের কাজের গুরুত্ব এখানেই: তিনি ইতিহাসকে শুধু অতীতের স্মৃতিচারণে আটকে রাখেননি। ইতিহাস কীভাবে লেখা হয়, কোন তথ্যকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয় এবং প্রচলিত ধারণাকে কীভাবে যাচাই করা যায়—এসব প্রশ্নও সামনে এনেছেন। তাঁর গবেষণা মনে করিয়ে দেয়, অতীত কোনো একক কাহিনি নয়। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, সংঘাত, পারস্পরিক বিনিময় ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই ইতিহাস তৈরি হয়।
প্রাচীন ভারতকে বুঝতে হলে শুধু কে রাজা ছিলেন বা কোন সাম্রাজ্য কত দিন টিকে ছিল, তা জানাই যথেষ্ট নয়। জানতে হয় সেই সময়ের মানুষের জীবন, সমাজের ভেতরের পরিবর্তন এবং নানা সংস্কৃতির পারস্পরিক যোগাযোগের কথাও। রোমিলা থাপারের দীর্ঘ গবেষণাজীবন ইতিহাসের এই বিস্তৃত পাঠেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।












