ইসরায়েলে যখন মানুষ ভোটের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, তখন গাজার মানুষের সামনে একেবারে ভিন্ন বাস্তবতা। সেখানে কয়েক প্রজন্ম ধরে মানুষ কার্যত এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠেছে, যেখানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য সাধারণ নির্বাচনের সুযোগ নেই। এই বৈপরীত্য শুধু দুটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্য নয়; এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে—একটি জনগোষ্ঠী নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কতটা ভোগ করছে?
ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে তাকানোর অর্থ দেশটির সব নীতি বা কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা নয়। ফিলিস্তিনিদের ওপর দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, সংঘাত এবং তাদের রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও স্বীকার করতে হবে, একটি কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ, নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
গাজার সংকটের একটি বড় অংশ এখানেই।
নির্বাচনহীন প্রজন্মের রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০০৭ সাল থেকে হামাস গাজা নিয়ন্ত্রণ করছে। এরপর সেখানে আর কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে গাজার বহু মানুষ কখনোই ভোটের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ পাননি। রাজনৈতিক বিভাজন, নানা ধরনের বিধিনিষেধ এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক বেসামরিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবেশও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বা সংগঠন জনগণের পক্ষে কথা বলার দাবি করলেই তাদের হয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার পেয়ে যায় না। গাজার মানুষের নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়া, নেতৃত্বের বিরোধিতা করা, রাজনৈতিক মত প্রকাশ এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
তবে নির্বাচন আয়োজন করলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। এর জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, মতপ্রকাশের অধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষাও জরুরি। দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন ও যুদ্ধের পর গাজায় এসব ভিত্তি পুনর্গঠনে সময় লাগবে। প্রয়োজন হবে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ করাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হবে না।
গাজার মানুষকে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হওয়া উচিত যেকোনো রাজনৈতিক পুনর্গঠনের সূচনা।
ইসরায়েলের কাছ থেকে কী শেখার আছে
ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থার দিকে তাকালে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখা যায়। সেখানে বিভিন্ন দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, সরকার বিরোধী দলের সমালোচনার মুখোমুখি হয় এবং রাজনৈতিক মতবিরোধ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে প্রকাশের সুযোগ পায়।
এ ব্যবস্থা সব ধরনের অবিচার দূর করতে পারে না। নির্বাচিত সরকারও ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এমনকি জনগণের প্রত্যাশার বিপরীত নীতিও গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ নাগরিকদের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা তুলে দেয়।
গাজার কাছাকাছি একটি কিবুতজে সুইজারল্যান্ড থেকে আসা বন্ধু সামির সঙ্গে আলোচনার সময় বিষয়টি নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ হয়েছিল। ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক কাঠামো, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও নাগরিকদের ভূমিকা নিয়ে আমাদের কথা হয়।
এ ধরনের আলোচনা করতে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ কিংবা ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা ভুলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকর দিক স্বীকার করা মানে সেই দেশের সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়া নয়। বরং অন্য সমাজের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।
প্রতিটি সমাজের নিজস্ব ইতিহাস, পরিচয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু জনগণ যেন ভয় ছাড়াই নেতৃত্বকে প্রশ্ন করতে পারে এবং পরিবর্তনের দাবি জানাতে পারে, সেটি সব সমাজের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

অভিন্ন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কি কল্পনার বাইরে?
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে এমন একটি সম্ভাবনার কথাও মাথায় আসে, যা বর্তমান বাস্তবতায় অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হতে পারে। একদিন কি গাজার ফিলিস্তিনি, ইসরায়েলের আরব নাগরিক এবং ইহুদি নাগরিকেরা এমন কোনো অভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোয় অংশ নিতে পারবেন, যেখানে সবার সমান অধিকার ও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত থাকবে?
এমনকি ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের ইচ্ছায় ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে প্রতিনিধিত্ব করার মতো কোনো ব্যবস্থা বেছে নিতে পারেন কি না, সেই প্রশ্নও আলোচনায় আসতে পারে।
এটি কোনো প্রস্তুত রাজনৈতিক পরিকল্পনা নয়। বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্ভাবনার একটি প্রশ্ন। আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতা দিয়ে আগামী দিনের সব সম্ভাবনা নির্ধারণ করা যায় না।
তবে এমন কোনো ব্যবস্থা কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হতে হলে কয়েকটি মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর স্বাধীন সম্মতি থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনের চোখে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যক্তি ও সামষ্টিক পরিচয়, নাগরিকত্ব এবং রাজনৈতিক অধিকারের সুরক্ষা থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জাতীয় ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। কোনো অভিন্ন কাঠামো তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে কিংবা ফিলিস্তিনি জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
ইতিহাসে এমন অনেক রাজনৈতিক ধারণা রয়েছে, যেগুলো একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হলেও পরে বাস্তব আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তাই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অর্থ বর্তমানের বাস্তবতা অস্বীকার করা নয়।
রাজনৈতিক অধিকারের শুরু জনগণের সিদ্ধান্ত থেকে
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, সেখানকার মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং কার্যকর বেসামরিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা। তাদের নিজেদের নেতৃত্ব নির্বাচন, রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ দিতে হবে।

ইসরায়েলিরা নিজেদের সরকার নিয়ে বিতর্ক করতে পারে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুযোগ পায়। ফিলিস্তিনিদেরও একই মৌলিক অধিকার থাকা উচিত। তারা কাকে নেতা হিসেবে বেছে নেবে, কোন নীতির বিরোধিতা করবে এবং নিজেদের সমাজ কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদেরই।
গাজার মানুষকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাইরের কোনো শক্তি কিংবা তাদের হয়ে কথা বলা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের একক সম্পত্তি হতে পারে না।
ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্ক ঠিক কী রূপ নেবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। কিন্তু স্থায়ী শান্তির জন্য শুধু যুদ্ধ বন্ধ করা কিংবা নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে এমন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে উভয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি থাকবে।
ভবিষ্যৎ হয়তো আজকের কল্পনার চেয়েও ভিন্ন কিছু নিয়ে আসবে। কিন্তু সেই ভবিষ্যতের ভিত্তি হতে হবে একটি সাধারণ নীতি—প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজের ভাগ্য নির্ধারণে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
লেখক মোহাম্মদ আলতুল গাজার একজন ফিলিস্তিনি শান্তিকর্মী। তিনি ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সহাবস্থানের পক্ষে কাজ করেন এবং সহিংসতা প্রত্যাখ্যানকারী ফিলিস্তিনিদের বক্তব্য তুলে ধরেন।












