প্রযুক্তি দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থানকে এত দিন নতুন শিল্পবিপ্লবের সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি বিপুল সম্ভাবনার বাজার, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে ব্যবসা সম্প্রসারণের হাতিয়ার এবং সাধারণ মানুষের কাছে কাজের ধরন বদলে দেওয়ার নতুন প্রযুক্তি। কিন্তু এই উত্থানের মধ্যেই এমন একটি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা পুরো সফটওয়্যার শিল্পের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিতে পারে। যে প্রযুক্তি নতুন ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে, সেটিই আবার সেই সাম্রাজ্যের মূল্য ও মালিকানার ধারণা ধ্বংস করে দিতে পারে।
এআই শিল্পের অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতিতে প্রকাশিত নথিতে মানবজাতির জন্য এআইয়ের বিপর্যয়কর অস্তিত্বগত ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিনিয়োগকারীদের সামনে আরও তাৎক্ষণিক কিছু প্রশ্ন রয়েছে। এআই কি প্রচলিত মেধাস্বত্ব ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলছে? সফটওয়্যার তৈরির খরচ ও সময় কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান সফটওয়্যার নকল করার সক্ষমতা বাড়লে কোন ব্যবসায়িক মডেল টিকে থাকবে? আর যে প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারাই কি শেষ পর্যন্ত এর সবচেয়ে বড় শিকার হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে দুই দশক আগের সংগীতশিল্পের অভিজ্ঞতার দিকে তাকানো প্রয়োজন। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তি যেভাবে সংগীতের ব্যবসাকে আমূল বদলে দিয়েছিল, এআইয়ের কারণে সফটওয়্যার শিল্পও এখন অনেকটা একই ধরনের রূপান্তরের মুখোমুখি।
সফটওয়্যার শিল্পে নতুন বিপর্যয়ের সূচনা
২০২৫ সালের শুরু থেকে উন্নত এআই মডেলগুলো সফটওয়্যার তৈরির প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে শুরু করে। ওপেনএআইয়ের অপারেটর এবং অ্যানথ্রপিকের ক্লড কোডের মতো প্রযুক্তি সাধারণ ব্যবহারকারীদেরও স্বাভাবিক ভাষায় নির্দেশনা দিয়ে কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরির সুযোগ করে দেয়। ফলে সফটওয়্যার তৈরির জন্য আর সব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ প্রোগ্রামারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না।
এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অ্যানথ্রপিক আইন, কমপ্লায়েন্স ও বিক্রয় ব্যবস্থাপনার মতো নির্দিষ্ট কাজের জন্য ক্লড কোওয়ার্কে বিশেষায়িত প্লাগ-ইন যুক্ত করে। এর মাধ্যমে এআই কেবল কোড লেখার সহকারী থাকেনি; বরং বিভিন্ন পেশাগত কাজ সম্পাদনের সক্ষমতাও অর্জন করতে শুরু করে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস বা এসএএএস ব্যবসায়। সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক সফটওয়্যার বিক্রি করে যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত আয় করত, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। বাজারে এই পরিস্থিতি পরিচিতি পায় ‘সাসপোক্যালিপস’ নামে।
কিন্তু সফটওয়্যার তৈরির খরচ কমে যাওয়াই একমাত্র সমস্যা নয়। এআই এখন বিদ্যমান সফটওয়্যারের কাঠামো বিশ্লেষণ, কোড পুনরুদ্ধার, রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্রায় একই ধরনের নতুন সংস্করণ তৈরির সক্ষমতাও অর্জন করছে। এর ফলে একটি কোম্পানি যে সফটওয়্যার তৈরিতে বছরের পর বছর এবং বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে, প্রতিদ্বন্দ্বীরা তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ে সেটির বিকল্প তৈরি করতে পারে।
মাইক্রোসফটের এক্সবক্স বিভাগের প্রধান আশা শর্মা সম্প্রতি কর্মীদের কাছে পাঠানো এক সতর্কবার্তায় গেমিং শিল্পে এই ঝুঁকির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু জনপ্রিয় গেমের কোড দ্রুত বিশ্লেষণ করে এমন হার্ডওয়্যারের উপযোগী সংস্করণ তৈরি করা হয়েছে, যার জন্য মূল গেমগুলো তৈরি হয়নি। এমনকি জনপ্রিয় গেমের উপাদান অন্য গেমের কোডে যুক্ত করার ঘটনাও ঘটছে।
এটি শুধু গেমিং শিল্পের সমস্যা নয়। সফটওয়্যারের মালিকানা, বাজারে একচেটিয়া অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি আয়ের প্রচলিত ধারণার জন্যও এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
মেধাস্বত্বের দেয়াল কতটা টিকবে?
আধুনিক সফটওয়্যার শিল্পের বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছে মালিকানাধীন কোড বা প্রোপ্রাইটারি সফটওয়্যারের ওপর। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের তৈরি প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে লাইসেন্স, সাবস্ক্রিপশন কিংবা এককালীন বিক্রির মাধ্যমে আয় করে। এই ব্যবস্থায় সফটওয়্যারটির মালিকানা এবং সেটি ব্যবহারের অধিকার আলাদা বিষয়।
কিন্তু এআই যদি প্রায় যেকোনো সফটওয়্যার বিশ্লেষণ করে তার কার্যকর অনুলিপি তৈরি করতে পারে, তাহলে এই ব্যবস্থার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে। যে পণ্য একসময় নির্দিষ্ট কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকত, সেটি কার্যত সবার জন্য সহজলভ্য হয়ে যেতে পারে।
অর্থনীতির ভাষায়, কোনো পণ্যকে বাজার থেকে অন্যদের জন্য বাদ দেওয়া কঠিন হয়ে উঠলে সেটি ‘নন-এক্সক্লুডেবল’ বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আয় কমবে না; পুরো প্রযুক্তিশিল্পের ব্যবসায়িক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
অবশ্য সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এআই বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। উন্নত এআই এজেন্ট মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সফটওয়্যারের দুর্বলতা শনাক্ত করে দ্রুত কাজে লাগাতে পারে। ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক যন্ত্র ও ক্লাউডভিত্তিক ব্যবস্থার নিরাপত্তা তখন নতুন হুমকির মুখে পড়বে।
তবে একই প্রযুক্তি দিয়ে দুর্বলতা শনাক্ত ও সংশোধন করাও সম্ভব। অর্থাৎ সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় এআই নিজেই কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। যদিও এর জন্য বড় বিনিয়োগ, উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং একটি অনিশ্চিত পরিবর্তনকাল পার হতে হবে।
কিন্তু সফটওয়্যারের মালিকানা ও পুনরুৎপাদন নিয়ন্ত্রণের সংকট আরও জটিল। কারণ এখানে শুধু নিরাপত্তা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না; পণ্যের অর্থনৈতিক মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই প্রশ্নেরও নতুন উত্তর প্রয়োজন।
ন্যাপস্টার থেকে সফটওয়্যার শিল্পের শিক্ষা
এআইয়ের এই সংকট বুঝতে সংগীতশিল্পের অতীত অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এমপিথ্রি প্রযুক্তি ডিজিটাল সংগীত সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়। ১৯৯৯ সালে ন্যাপস্টার নামে একটি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন একটি সেবা চালু করে, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্কে পরস্পরের সঙ্গে সংগীতের ফাইল বিনিময় করতে পারতেন।
এর ফলে সংগীতের কপি তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে রেকর্ড কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। একসময় মনে হচ্ছিল, ডিজিটাল যুগে রেকর্ড করা সংগীতের জন্য মানুষ আর অর্থ ব্যয় করবে না।
সংগীতশিল্পের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগে আইনি লড়াই শুরু করে। ২০০১ সালের জুনে ন্যাপস্টার দেউলিয়া হয়ে যায়। কিন্তু ন্যাপস্টারের পতন সংগীতশিল্পকে পুরোনো অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারেনি।
পরবর্তী এক দশকে পুরো শিল্পকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। ইএমআই ও পলিগ্রামের মতো ঐতিহ্যবাহী রেকর্ড কোম্পানিগুলোর প্রভাব কমে যায়। অ্যালবাম বিক্রি ও শিল্পীদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বিজ্ঞাপননির্ভর ও সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক স্ট্রিমিং ব্যবসা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। স্পটিফাই ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্ম সংগীত উপভোগ ও বিতরণের নতুন কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থাৎ কপিরাইট আইন ন্যাপস্টারকে থামাতে পারলেও ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে সংগীতের ব্যবসায় যে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তা থামাতে পারেনি।
সফটওয়্যার শিল্পের সামনে এখন অনেকটা একই প্রশ্ন। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে তৈরি হওয়া নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে কি আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া যাবে?
নতুন বিজয়ী কারা, তা এখনো অজানা
সংগীতশিল্পের অভিজ্ঞতা থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রথম শিক্ষা হলো, প্রযুক্তিগত বিপ্লবের শুরুতে ভবিষ্যতের বিজয়ী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন।
ন্যাপস্টারের দ্রুত ব্যবহারকারী বাড়ানোর কৌশলকে কেন্দ্র করে যারা বিনিয়োগ করেছিলেন, তাদের অনেকেই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। অ্যাপল প্রথমে আইটিউনসের মাধ্যমে ডিজিটাল সংগীত বিক্রির ব্যবস্থা চালু করে পুরোনো অ্যালবাম বিক্রির ব্যবসাকে নতুন প্রযুক্তিতে স্থানান্তর করতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাবস্ক্রিপশন ও বিজ্ঞাপননির্ভর স্ট্রিমিং মডেলই বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।
এই অভিজ্ঞতা এআই বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কিংবা ব্যবসায়িক মডেলকে ভবিষ্যতের নিশ্চিত বিজয়ী ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আজ যে প্রতিষ্ঠান বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে, প্রযুক্তির পরবর্তী পরিবর্তনে তার অবস্থানও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোকে ভাবতে হবে, তাদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আসলে কোথায়। শুধু কোডের মালিকানা, প্রযুক্তিগত জটিলতা কিংবা দীর্ঘদিনের বাজার উপস্থিতি দিয়ে ভবিষ্যতে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। গ্রাহকসেবা, নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং ব্যবহারকারীর আস্থা নতুন প্রতিযোগিতামূলক শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের জন্য দ্বিমুখী আইনি ঝুঁকি
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা অ্যানথ্রপিকের অবস্থানও বেশ জটিল। প্রতিষ্ঠানটি এআই প্রযুক্তির বিস্তারের অন্যতম চালক হলেও একই প্রযুক্তির কারণে তার নিজের ব্যবসাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে এআই মডেল প্রশিক্ষণে কপিরাইটযুক্ত উপাদান ব্যবহারের অভিযোগে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এসব মামলায় যে পরিমাণ আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতের ঝুঁকির পুরো চিত্র তুলে ধরে না।
কারণ প্রশিক্ষণের জন্য কপিরাইটযুক্ত উপাদান ব্যবহারের প্রশ্ন এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন সফটওয়্যার নকল করে নতুন পণ্য তৈরির প্রশ্ন এক নয়। আদালত যদি পরবর্তী ক্ষেত্রেও কঠোরভাবে মেধাস্বত্ব আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ ও আইনি দায় অনেক বড় হতে পারে।
ন্যাপস্টারের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের এখানেই মিল। ন্যাপস্টার যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংগীতশিল্পের প্রচলিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবস্থার আইনি কাঠামোর সঙ্গেই তার সংঘাত তৈরি হয়।
তবে অ্যানথ্রপিকের ঝুঁকি আরও বিস্তৃত। ন্যাপস্টারের প্রযুক্তি মূলত সংগীতশিল্পের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। কিন্তু এআইয়ের ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার কেবল প্রচলিত সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একই পদ্ধতি ব্যবহার করে এআইয়ের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিও বিশ্লেষণ ও অনুকরণ করা সম্ভব।
এআইয়ের প্রতিযোগিতায় নিজেদেরই প্রতিদ্বন্দ্বী
এখানেই বর্তমান প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যটি সামনে আসে। উন্নত এআই মডেল তৈরির জন্য বিপুল অর্থ, তথ্য, কম্পিউটিং সক্ষমতা ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এত দিন বাজারে এগিয়ে ছিল।
কিন্তু সেই ব্যবধান স্থায়ী থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। চীনের বিভিন্ন গবেষণাগার ইতিমধ্যে মার্কিন এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে তুলনামূলক উন্মুক্ত সংস্করণ তৈরির চেষ্টা করছে। অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতার ব্যবধানও কমছে।
এমআইটির গবেষক ক্রিশ্চিয়ান কাতালিনি যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ: যে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে একসময় সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল, সেটিই দ্রুত বিনা মূল্যে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠছে।
এতে অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিষ্ঠানের সামনে দ্বিমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে। একদিকে তাদের প্রচলিত সফটওয়্যার শিল্পের ব্যবসায়িক কাঠামো ভেঙে নতুন বাজার তৈরি করতে হবে। অন্যদিকে নিজেদের প্রযুক্তি যাতে প্রতিদ্বন্দ্বীরা সহজে অনুকরণ করতে না পারে, সেই ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু এআইয়ের উন্নয়ন যত দ্রুত এগোবে, প্রযুক্তিগত ব্যবধান ধরে রাখার কাজ তত কঠিন হতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের জন্য শেষ সতর্কবার্তা
প্রায় ১৫ বছর আগে মার্কিন প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী মার্ক অ্যান্ড্রিসেন বলেছিলেন, সফটওয়্যার ধীরে ধীরে পুরো বিশ্বকে গ্রাস করছে। সেই ধারণা প্রযুক্তি অর্থনীতির গতিপথ বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এখন এআই সেই সফটওয়্যারকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
এই পরিবর্তনের ফলে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে, পুরোনো ব্যবসা হারিয়ে যাবে এবং প্রযুক্তির মালিকানা ও মূল্য নির্ধারণের নিয়ম বদলে যেতে পারে। কিন্তু এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো, যে প্রতিষ্ঠানগুলো বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারাই শেষ পর্যন্ত নিজেদের তৈরি পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে কি না।
অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য আইপিওতে বিনিয়োগকারীদের তাই শুধু কোম্পানিটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আয় কিংবা বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনা করলেই চলবে না। দেখতে হবে, তার প্রযুক্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ কতটা বাস্তবসম্মত, মেধাস্বত্বের আইনি সুরক্ষা কতটা কার্যকর এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরা কত দ্রুত একই সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
ন্যাপস্টারের পতন প্রমাণ করেছিল, একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিজে ব্যর্থ হলেও তার সূচিত পরিবর্তন পুরো শিল্পকে নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটতে পারে। অ্যানথ্রপিক হয়তো ভবিষ্যতের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, আবার এআইয়ের বিস্তার তার নিজস্ব ব্যবসায়িক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের সামনে তাই মূল প্রশ্ন শুধু এআই কতটা শক্তিশালী, তা নয়। বরং এআইয়ের তৈরি নতুন পৃথিবীতে কারা সেই শক্তির অর্থনৈতিক সুফল ধরে রাখতে পারবে। সফটওয়্যার একসময় বিশ্বকে বদলে দিয়েছিল; এখন সেই সফটওয়্যারকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করছে এআই। আর এই পরিবর্তনের বাজারে আজকের বিজয়ীই যে আগামী দিনের বিজয়ী থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।












