ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদির ২৫ বছরের পথচলা একদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিস্তার ঘটিয়েছে, অন্যদিকে তৈরি করেছে কর্মসংস্থান, বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে নানা প্রশ্ন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থেকে টানা তিন মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী—এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় মোদি নিজেকে দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। কিন্তু ক্ষমতার ২৫ বছর পূর্তির সময়েই তাঁর নেতৃত্বের সামনে দেখা দিয়েছে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ।
২০২৬ সালের অক্টোবরজুড়ে ভারতে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ সেই চ্যালেঞ্জকে আরও স্পষ্ট করেছে। একটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ ধীরে ধীরে মোদি সরকার ও ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষার্থী সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী অনিয়ম, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের অভাব এবং কর্মসংস্থানের সংকট নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সরকারের ২৫ বছরের ক্ষমতার উদ্যাপনও তাই প্রত্যাশিতভাবে এগোয়নি। বিভিন্ন প্রদর্শনী, বৃক্ষরোপণ ও তৃণমূল পর্যায়ের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মোদির রাজনৈতিক জীবনের রজতজয়ন্তী উদ্যাপনের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়েই রাস্তায় নেমেছে বিক্ষুব্ধ তরুণেরা।
৭৬ বছর বয়সী মোদি পরিস্থিতি সামাল দিতে কখনো সমঝোতার চেষ্টা করেছেন, আবার কখনো কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি অসন্তোষ কমানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অক্টোবরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর দিল্লিতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, ট্রেন চলাচল বাতিল ও সড়ক অবরোধের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পুলিশ হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করে। কোথাও কোথাও আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটার ঘটনাও ঘটে। এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে।
তবে মোদির রাজনৈতিক ভিত্তি এখনো শক্তিশালী। বিশেষ করে বয়স্ক ভোটারদের মধ্যে তাঁর সমর্থন রয়েছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিও তাঁর জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিরোধী দলগুলো আগের তুলনায় বেশি ঐক্যবদ্ধ হলেও তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচির অভাব এখনো বড় বাধা।
তবু সাম্প্রতিক বিক্ষোভ মোদির শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে এনেছে। বিশেষ করে এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
গুজরাটের বিপর্যয় থেকে জাতীয় রাজনীতির উত্থান
মোদির রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে ছিল একটি বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ২০০১ সালের জানুয়ারিতে তাঁর নিজ রাজ্য গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিজেপির নেতৃত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।
দলের আস্থা অর্জন করে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান ৫১ বছর বয়সী নরেন্দ্র মোদি। এর আগে তিনি কোনো নির্বাচিত সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেননি। তবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা এবং সংগঠনের মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।
কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরের বছরই গুজরাটে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটে। একটি ট্রেনে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার পর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিশোধমূলক হামলা ছড়িয়ে পড়ে। এতে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন, যাঁদের অধিকাংশই মুসলমান।
সেই সময় রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা মোদি সহিংসতার দায় স্বীকার করেননি কিংবা এ জন্য ক্ষমা চাননি। বরং ওই বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনী প্রচারে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছিল তাঁর বক্তব্য। নির্বাচনে বিজেপি বড় জয় পায়।
এরপর গুজরাটে আরও দুটি এবং জাতীয় পর্যায়ে তিনটি নির্বাচনে জয়ী হন মোদি। তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির সমন্বয়।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে বদলে গেছে ভারতের শাসনব্যবস্থা
গুজরাটে মোদি যে শাসনমডেল তৈরি করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেটিই জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করেন। একদিকে তিনি নিজেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, অন্যদিকে শিল্প ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করেন।
গুজরাটে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জমি, করছাড় ও ভর্তুকি দেওয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি পুলিশ, প্রশাসন ও দলীয় সংগঠনের ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি তৈরি করেন একজন সৎ, ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনে অনাগ্রহী ও কঠোর পরিশ্রমী নেতা হিসেবে।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই পদ্ধতি আরও বিস্তৃত হয়। ভারতের মতো ১৪৫ কোটি মানুষের দেশে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ঘিরে থাকা একটি ছোট রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।
মন্ত্রীদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়েছে। বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীরাও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
স্বাধীনতার পর ভারতের রাজনীতিতে এমন প্রভাবশালী নেতৃত্বের নজির খুব বেশি নেই। জওহরলাল নেহরু এবং ইন্দিরা গান্ধীর সময়েও প্রধানমন্ত্রীর হাতে ব্যাপক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল। তবে মোদির শাসনামলে দল, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপ্তি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নেহরু সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক চিন্তা ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ভিত্তিতে স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী জনপ্রিয়তাভিত্তিক রাজনীতির পাশাপাশি কঠোর কর্তৃত্ববাদী শাসন চালিয়েছিলেন। মোদি তাঁদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে নিজেকে আলাদা করে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতি ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সমন্বয়ে নতুন রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছেন।
এর ফলে একসময় ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী কংগ্রেস দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিজেপি দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।
অর্থনীতিতে উন্নয়ন, কিন্তু কর্মসংস্থানে বড় ঘাটতি
মোদির ২৫ বছরের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার মূল্যায়ন করতে গেলে অর্থনীতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় তিনি এমন কিছু সংস্কার পরিকল্পনা হাতে পান, যেগুলো আগের দুর্বল জোট সরকারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা, ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো এবং পণ্য ও পরিষেবা কর চালুর মতো উদ্যোগ ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামোকে পরিবর্তন করেছে। আগে বিভিন্ন রাজ্যে ১৭ ধরনের কর চালু ছিল। নতুন করব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে আরও সমন্বিত করা সম্ভব হয়েছে।
ডিজিটাল সেবা ও অনলাইন লেনদেনের বিস্তার সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি ও আর্থিক সেবা গ্রহণ সহজ করেছে। একই সঙ্গে সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের জাতীয় মহাসড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
গ্রামীণ পরিবারগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যেত, এখন তা ২২ দশমিক ৬ ঘণ্টায় পৌঁছেছে। দরিদ্র পরিবারগুলোকে বিনা মূল্যে খাদ্যশস্য, বিদ্যুৎ সংযোগ ও রান্নার গ্যাস দেওয়ার কর্মসূচিও চালু রয়েছে।
সরাসরি ব্যাংক হিসাবে সরকারি সহায়তার অর্থ পাঠানোর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্নীতির সুযোগ কিছুটা কমেছে। এর মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মোদি সরকারের সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্য। মোদির শাসনামলে ভারতের অর্থনীতি বছরে গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ হারে বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ভূমিকা এবং সরকারের তুলনামূলক সতর্ক রাজস্বনীতি অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।
কিন্তু এই উন্নয়নের সুফল সমাজের সব শ্রেণির মধ্যে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
ধনীদের সম্পদ বেড়েছে, সাধারণ মানুষের আয় আটকে আছে
মোদির অর্থনৈতিক নীতির বড় বৈশিষ্ট্য হলো ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই শিল্পপতি গৌতম আদানির সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। আদানির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বন্দর, বিমানবন্দর, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতে বিস্তৃত হয়েছে।
২০১৪ সালে আদানির সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০০ কোটি ডলার। পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির গতি অনেক কম। ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বছরে গড়ে ৬ শতাংশ হারে বাড়লেও মোদির ক্ষমতায় আসার পর তা কমে প্রায় ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বেতনভোগী কর্মীদের অবস্থাও ভালো নয়। মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর ২০১৭ সাল থেকে এই শ্রেণির গড় বেতন প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। ভারতের মোট কর্মশক্তির প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
কৃষি ও ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রেও মোদি সরকার বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেনি। কৃষকদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সরকার প্রস্তাবিত কৃষি আইন প্রত্যাহার করে নেয়। এতে কৃষি খাতে কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ থেমে যায়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ভারতের কর্মসংস্থানের কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসেনি। এখনো দেশটির প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ কর্মী কৃষির ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থানের অংশও প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।
উচ্চশিক্ষার সুযোগ অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বেতনভিত্তিক চাকরি তৈরি হয়নি। ফলে শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরির অপেক্ষায় রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের কাজও এখনো ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।
অর্থাৎ অবকাঠামো ও ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটলেও অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর এখনো অসম্পূর্ণ। যে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন, তার সুফল সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে প্রত্যাশিতভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিস্তার ও মুসলমানদের নিরাপত্তা প্রশ্ন
মোদির শাসনামলে ভারতের সমাজ ও রাজনীতিতে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলোর একটি হলো হিন্দু জাতীয়তাবাদের বিস্তার। দেশটির রাজনৈতিক পরিচয়, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান এবং সামাজিক আলোচনায় ধর্মীয় পরিচয়ের গুরুত্ব বেড়েছে।
ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের জন্য এই পরিবর্তন বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় সাত ভাগের এক ভাগ মুসলমান।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে অযোধ্যায় সাবেক একটি মসজিদের স্থানে নির্মিত রামমন্দিরের উদ্বোধন ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক দশকের হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল এই মন্দির নির্মাণ।
এ ছাড়া নাগরিকত্ব আইন পরিবর্তন এবং মুসলিম পারিবারিক আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বিজেপি সরকার। ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বহাল থাকলেও রাষ্ট্রের সব ধর্মের প্রতি সমান আচরণের ধারণা দুর্বল হয়েছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
এই পরিবর্তন শুধু বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিরোধী দলের অনেক নেতাও হিন্দু ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে মন্দিরকেন্দ্রিক রাজনীতি ও ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অন্যদিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংসতার অভিযোগও বেড়েছে। বিজেপির কিছু নেতা মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী বা অবৈধ দখলদার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিভিন্ন এলাকায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে মুসলমানদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সামগ্রিক মাত্রা অতীতের তুলনায় কমলেও মুসলমানদের লক্ষ্য করে সংঘটিত কিছু হামলা এবং সেগুলোর ক্ষেত্রে দায়মুক্তির অভিযোগ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হিন্দু জাতীয়তাবাদ এখন ভারতের মধ্যবিত্ত সমাজের একটি বড় অংশের কাছে শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে মোদির পরেও এই রাজনৈতিক পরিবর্তন সহজে উল্টে দেওয়া কঠিন হতে পারে।
নির্বাচনী ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক
মোদির শাসনামলের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হলো ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কেন্দ্রীয় অভিযোগগুলোর একটি হলো ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের সমালোচকেরা বলছেন, এত বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া যথেষ্ট স্বচ্ছ ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে ভোটারদের নাম কেন বাদ দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি। ভুলভাবে বাদ পড়া ভোটারদেরও আপিল করার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাদ পড়া সব ব্যক্তি প্রকৃত ভোটার ছিলেন না। অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং মৃত্যুর কারণেও অনেক নাম বাদ পড়তে পারে।
তবে বিতর্কের মূল বিষয় শুধু কতজনের নাম বাদ পড়েছে, তা নয়; বরং পুরো প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, সেটি। আগে স্থানীয় ও রাজ্য পর্যায়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ হলেও এবার দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়েছে। ব্যবহৃত সফটওয়্যারের মাধ্যমে কোন ব্যক্তির নাম কেন বাদ পড়েছে, তা বোঝার সুযোগও সীমিত ছিল।
এ নিয়ে আন্দোলনকারীরা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র দুর্বল করার অভিযোগ তুলেছেন। কেউ কেউ পরিস্থিতিকে ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তবে ভোটার তালিকা সংশোধনের অনিয়মের অভিযোগ থেকেই মোদি সরকার নির্বাচনে কারচুপি করে ক্ষমতায় রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো নেই। বিরোধী দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বিকল্প রাজনৈতিক কর্মসূচির অভাবও তাদের নির্বাচনী সমস্যার একটি কারণ।
তবে প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের ওপর সরকারের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগব্যবস্থায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তদন্তের মতো ঘটনা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন।
তারপরও ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। দেশটির বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি, সামাজিক বৈচিত্র্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন এবং সক্রিয় নাগরিক সমাজ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কও দেখিয়েছে, সাধারণ মানুষ নিজেদের ভোটাধিকার নিয়ে কতটা সচেতন। গণমাধ্যমের একটি অংশ এখনো সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে বাদ পড়া ভোটারদের আপিলের সুযোগ বাড়াতে সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
তরুণদের ক্ষোভ কেন মোদি সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
সাম্প্রতিক আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তরুণদের অংশগ্রহণ। ভারতের ভোটারদের প্রায় ৩০ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের প্রধান উদ্বেগ শিক্ষা, চাকরি ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।
দীর্ঘদিন ধরে মোদির রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার বড় ভিত্তি ছিল উন্নয়ন ও শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু শিক্ষিত তরুণেরা যদি পড়াশোনা শেষ করেও উপযুক্ত চাকরি না পান, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে কর্মসংস্থান নিয়ে অসন্তোষ বিজেপির ভোট কমাতে ভূমিকা রেখেছিল। এর ফলে মোদিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিবর্তে জোট সরকারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
সাম্প্রতিক আন্দোলনেও দেখা যাচ্ছে, তরুণদের একটি অংশ শুধু কোনো একটি নীতির পরিবর্তন চাইছে না; তারা রাজনৈতিক জবাবদিহি ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণ সংগঠনগুলো জাতীয় পতাকা ও সংবিধানের অধিকারকে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। ফলে তাদের সহজে দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টাও প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।
আন্দোলন সামলাতে মোদির সামনে কী পথ?
মোদি সরকারের সামনে এখন কয়েকটি রাজনৈতিক পথ রয়েছে। প্রথমত, আন্দোলনের নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখে বিক্ষোভের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আন্দোলনের ক্ষোভ ছড়িয়ে দিয়ে তরুণদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা হতে পারে।
তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কঠোর দমন-পীড়ন সব সময় আন্দোলন থামাতে পারে না। অনেক সময় এসব পদক্ষেপ আন্দোলনকারীদের আরও বেশি পরিচিত করে তোলে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় আন্দোলনের বিষয়টি দেশের বাইরেও আলোচনায় এসেছে।
মোদি চাইলে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারেন। হিন্দু জাতীয়তাবাদী বক্তব্য আরও জোরালো করা অথবা সংসদীয় আসন পুনর্বণ্টনের মতো বিতর্কিত কোনো ইস্যু সামনে আনা তার সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে।
অন্যদিকে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের জন্যও চ্যালেঞ্জ কম নয়। শুধু মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি করলেই হবে না, বিকল্প অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মসূচিও তুলে ধরতে হবে।
বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য বাড়লেও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা নিয়ে ভোটারদের একাংশের সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট কীভাবে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান করবে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
আগামী নির্বাচনে কী বার্তা আসতে পারে?
মোদির জন্য আগামী বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে পারে ২০২৭ সালের বসন্তে অনুষ্ঠিতব্য কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচন। এর মধ্যে উত্তর প্রদেশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এই রাজ্যে বিজেপির অবস্থান এবং নির্বাচনী ফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।
বিজেপি জয়ী হলে দলটি মোদির জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব এখনো অটুট রয়েছে বলে দাবি করতে পারবে। বিপরীতে পরাজয় হলে তা হবে তাঁর রাজনৈতিক আবেদন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠার কারণ।
তবে একটি বা কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনী ফল দিয়ে ভারতের জাতীয় রাজনীতির পুরো চিত্র নির্ধারণ করা যাবে না। ভোটারদের সিদ্ধান্তে স্থানীয় সমস্যা, প্রার্থী, জোটের সমীকরণ ও জাতীয় ইস্যু—সবকিছুই ভূমিকা রাখবে।
মোদির সামনে এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, সাম্প্রতিক বিক্ষোভকে কেবল কিছু বিশৃঙ্খল তরুণের কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা। কারণ আন্দোলনের পেছনে রয়েছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আয় ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর জন্যও রাস্তায় মানুষের উপস্থিতিকে মোদির রাজনৈতিক পতনের নিশ্চিত ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। গত ২৫ বছরে মোদি বারবার রাজনৈতিক সংকট সামলে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। তাঁর সমর্থকদের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য অংশের আস্থা রয়েছে।
ভারতের রাজনীতিতে তাই এখন মূল প্রশ্ন শুধু মোদি ক্ষমতায় থাকবেন কি না, তা নয়। বরং তাঁর তৈরি শাসনব্যবস্থা অর্থনৈতিক সুযোগ, সামাজিক সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির মধ্যে কতটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, সেটিই আগামী দিনের বড় পরীক্ষা।












