ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের একটি বৈপরীত্য আবারও সামনে এসেছে। দেশটির সংসদীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো সম্মিলিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও সরকার পরিবর্তনের পথ সহজ হচ্ছে না। কারণ, বিরোধী শিবিরের একটি বড় অংশ ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে কাজ করতে অনিচ্ছুক। ফলে সরকার পরিবর্তনের প্রশ্নটি কেবল আসনসংখ্যার হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে নাগরিক সমতা, জাতিগত বিভাজন, রাজনৈতিক বৈধতা এবং ইসরায়েলি গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।
২৭ অক্টোবর ২০২৬-এর নির্বাচনের ফলাফল সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। চূড়ান্ত আসন বণ্টনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি পেয়েছে ২৭টি আসন। গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পেয়েছে ২১টি। নাফতালি বেনেটের বিয়াখাদ পেয়েছে ১২টি। অন্যদিকে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম পেয়েছে যথাক্রমে ১১ ও ৮টি আসন। অর্থাৎ আরব দলগুলোর হাতে রয়েছে মোট ১৯টি আসন।
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। নেতানিয়াহুবিরোধী ইহুদি দলগুলোর সম্মিলিত আসন ৪৮। আরব দলগুলোর ১৯টি আসন যোগ হলে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাব্য আসনসংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭। সংখ্যার হিসাবে এটি সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা বলছে, এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কার্যকর রাজনৈতিক জোটে পরিণত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, কিন্তু ঐকমত্য নেই
সাধারণত সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ইসরায়েলে পরিস্থিতি ভিন্ন। নেতানিয়াহুর বিরোধী শিবিরের অনেক নেতা নির্বাচনী প্রচারের সময়ই আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছিলেন। ফলে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরও রাজনৈতিক সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।

এই জটিলতার কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। তাঁর নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থী ইয়াশার নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। কিন্তু সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন পেতে হলে তাঁকে আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে। অন্যদিকে আরব দলগুলোর সমর্থন গ্রহণ করলে তাঁর সম্ভাব্য ডানপন্থী মিত্রদের একাংশ সরে যেতে পারে।
এখানেই ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক সংকট দেখা যায়। নির্বাচনে পাওয়া আসনসংখ্যা এক ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করেছে, কিন্তু জাতিগত ও আদর্শিক বিভাজন সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত হতে বাধা দিচ্ছে।
জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ, রাজনীতিতে প্রান্তিক
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের অনেকেই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত, তবে তাঁরা ইসরায়েলের নাগরিক এবং দেশটির নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন। সংসদে তাঁদের প্রতিনিধিত্বও রয়েছে। তা সত্ত্বেও জাতীয় রাজনীতিতে তাঁদের দলগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে মূল ক্ষমতার বলয়ের বাইরে রাখা হয়েছে।
এই বঞ্চনার পেছনে রয়েছে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক। দেশটি নিজেকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। ফলে ইহুদি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি অংশের কাছে আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি রাষ্ট্রের প্রচলিত পরিচয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ইতিহাসেও এই প্রবণতার প্রতিফলন রয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে লিকুদের নেতৃত্বে তাঁর প্রথম নির্বাচনী প্রচারের সময় সমর্থকদের স্লোগান ছিল, ‘নেতানিয়াহু, ইহুদিদের জন্য ভালো।’ সে সময় তাঁর পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী শিমন পেরেস মন্তব্য করেছিলেন, নির্বাচনে ইসরায়েলিরা হেরেছে, জয়ী হয়েছে ইহুদিরা। মন্তব্যটি ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিচয় ও নাগরিকত্বের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনকে সামনে এনেছিল।
পরবর্তী সময়ে এই বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে। নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক সরকারে অতি-ডানপন্থী রাজনীতিকদের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বিশেষভাবে আলোচিত। অতীতে তিনি আরববিরোধী উগ্রপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওই আন্দোলনের যুব শাখার নেতৃত্বও দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৪ সালে আন্দোলনটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ হয়।
এ ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশে আরব দলগুলোকে কেবল বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও পরিচয়ের জন্য সন্দেহজনক পক্ষ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
৭ অক্টোবরের হামলা ও অবিশ্বাসের রাজনীতি
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সম্পর্কেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। ওই দিন হামাসের হামলায় বহু ইসরায়েলি নিহত হওয়ার পর দেশটির নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয় এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ইহুদি জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে আরব নাগরিকদের প্রতি অবিশ্বাস ও সন্দেহও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আরব-ইসরায়েলি রাজনীতিকদের জন্য নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে। হামলার পর কয়েকজন আরব রাজনীতিক সহিংসতার নিন্দা করেছিলেন। তবে তাঁদের কেউ কেউ হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে সরাসরি অভিহিত করতে অস্বীকৃতি জানান। এ ধরনের অবস্থান ইসরায়েলের ইহুদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে।

তবে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কিছু নেতার বক্তব্যের দায় পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো যায় না। ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের সবাইকে হামাসের কর্মকাণ্ডের সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করারও কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। নাগরিক পরিচয়, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং কোনো সশস্ত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন এক বিষয় নয়।
এই পার্থক্য উপেক্ষা করে আরব নাগরিকদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একই সঙ্গে দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠীকে জাতীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার প্রবণতাও শক্তিশালী হয়।
নির্বাচনে আরব ভোটারদের প্রত্যাবর্তন
নির্বাচনে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন পাওয়া শুধু সংসদীয় হিসাবের পরিবর্তন নয়। এটি আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। নির্বাচনে তাঁদের ভোটের উপস্থিতি বেড়েছে এবং প্রতিনিধিত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই ফলাফল দেখিয়েছে, ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চান। তাঁদের রাজনৈতিক দাবি শুধু নিজেদের সম্প্রদায়ের স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়; সরকার পরিবর্তন, নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণের প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত।
দীর্ঘদিন ধরে আরব দলগুলোকে সরকার গঠনের আলোচনার বাইরে রাখা হলেও এবারের নির্বাচনে তাদের উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, ১৯টি আসন এখন এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যার সমর্থন ছাড়া বিরোধী শিবিরের পক্ষে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব নয়।
নির্বাচনের পর আরব দলগুলোর নেতারা আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের সঙ্গে সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে সরকারে সরাসরি অংশগ্রহণ, বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট নীতিগত বিষয়ে সমঝোতা—কোন পথে সহযোগিতা হবে, তা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২১ সালের অভিজ্ঞতা: অসম্ভব নয় রাজনৈতিক সমঝোতা
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলের সরকারে অংশগ্রহণের নজির রয়েছে। ২০২১ সালে নেতানিয়াহু নিজেই রা’আম পার্টির সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি, পরবর্তী সময়ে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারে রা’আম যোগ দিয়েছিল।
এটি ছিল ইসরায়েলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ, এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছিল যে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলও জাতীয় সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করা রাষ্ট্রের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে কোনো অসম্ভব ঘটনা নয়।
তবে ওই জোট দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে সরকারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আরব জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা কতটা পূরণ করা সম্ভব, সেই প্রশ্নও রয়ে গেছে। শুধু সরকার গঠনের প্রয়োজনে সাময়িক সমঝোতা করলেই দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর হবে না। নাগরিক অধিকার, স্থানীয় উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি প্রয়োজন।
এবারের পরিস্থিতি ২০২১ সালের তুলনায় আরও জটিল। কারণ, একদিকে আরব দলগুলোর আসন বেড়েছে, অন্যদিকে ইহুদি বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও আরব রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

নেতানিয়াহুর সামনে রাজনৈতিক সুযোগ
বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভাজন নেতানিয়াহুর জন্যও রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর দল লিকুদ একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। যদিও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি, তবু বৃহত্তম দল হিসেবে লিকুদের অবস্থান তাঁকে সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিয়েছে।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সামনে এখন সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সরকার গঠনের জন্য কাকে প্রথমে দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্তে সংসদীয় সমর্থনের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হবে। বিরোধী দলগুলো যদি নিজেদের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তাহলে নেতানিয়াহুও সরকার গঠনের সুযোগ চাইতে পারেন।
এদিকে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে পরিস্থিতি নতুন করে অস্থির হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। নেতানিয়াহু সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে আবার সামরিক হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি সরকারের নীতি ও বসতি সম্প্রসারণ ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ও জাতীয় ঐক্যের যুক্তি সামনে এনে জরুরি ভিত্তিতে একটি বিস্তৃত সরকার গঠনের দাবি উঠতে পারে। নেতানিয়াহু নিজেকে সেই সরকারের নেতৃত্বের উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। ফলে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হলে নির্বাচনের ফল থেকে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সুযোগও হাতছাড়া হতে পারে।
নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে এই আশঙ্কা আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে। ২ নভেম্বর নেতানিয়াহুর লিকুদ নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন বিলম্বিত করার দাবি তুলেছিল। তবে নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্তাধীন থাকলেও ভোটের ফল বাতিল করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এদিকে নেতানিয়াহু বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের কথাও বলেছেন।
ইসরায়েলের গণতন্ত্রের সামনে মূল প্রশ্ন
এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর ভূমিকা এখন আর পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মতো নয়। অথচ দেশটির প্রধান বিরোধী দলগুলোর একাংশ এখনো তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সহযোগিতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: ইসরায়েল যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তার আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে দ্বৈত অবস্থান কত দিন বজায় রাখতে পারবে?
গণতন্ত্রে নাগরিকের ভোটাধিকার শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সেই ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেওয়ার সুযোগও থাকতে হয়। কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকে কেবল তাদের জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অগ্রহণযোগ্য মনে করা হলে নির্বাচনী প্রতিনিধিত্বের মৌলিক ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
অবশ্য আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন করলেই ইসরায়েলের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সমাধান হবে না। হামাসের সঙ্গে সংঘাত, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো জটিল বিষয়ে ইহুদি ও আরব রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। এসব বিষয়ে সমঝোতা ছাড়া কোনো জোটের দীর্ঘস্থায়ী হওয়াও কঠিন।
তবু রাজনৈতিক সহযোগিতার দরজা বন্ধ রাখলে সেই মতপার্থক্য দূর হওয়ার সুযোগ আরও সংকুচিত হবে। বরং আলোচনার মাধ্যমে অভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা এবং মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়ে পারস্পরিক অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।
এবারের নির্বাচনের পর ইসরায়েলের সামনে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। দ্বিতীয়ত, তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হলেও জাতিগত ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখনো সরকার গঠনের উপযোগী হয়ে ওঠেনি।
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল প্রেসিডেন্টের কাছে উপস্থাপনের নির্ধারিত তারিখ ৪ নভেম্বর। এরপর ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের অধিবেশন বসার কথা। এই সময়ের মধ্যে বিরোধী দলগুলো কী ধরনের সমঝোতায় পৌঁছায়, তা ইসরায়েলের পরবর্তী রাজনৈতিক অধ্যায় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ইসরায়েলের এবারের নির্বাচন তাই শুধু নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই নয়। এটি দেশটির নাগরিকত্বের ধারণা, জাতিগত সহাবস্থান এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়েও একটি বড় পরীক্ষা। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেও যদি একটি বিরোধী শিবির জাতিগত পরিচয়ের কারণে অন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করতে না পারে, তাহলে সেই গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করা আর আদর্শিক অবস্থান বিসর্জন দেওয়া এক বিষয় নয়। ইসরায়েলের বিরোধী দলগুলোর সামনে এখন এই পার্থক্য বোঝার চ্যালেঞ্জ। তারা আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলে, তার ওপর শুধু একটি সরকার গঠনের হিসাব নয়, দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্ভর করছে।












