রাশিয়ায় জাপানি সাংবাদিক ইউকি ইমাইকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। গত ১৩ অক্টোবর রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের সাখালিন দ্বীপে একটি হোটেল থেকে তাঁকে আটক করা হয়। বর্তমানে তিনি মস্কোর কুখ্যাত লেফোরতোভো কারাগারে বন্দি। এই গ্রেপ্তার শুধু একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইমাইকে আটকের পেছনে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগের পাশাপাশি বন্দিবিনিময়ের কূটনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে। রাশিয়া অতীতে বিদেশি নাগরিকদের আটক করে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বন্দিবিনিময়ের আলোচনায় তাদের ব্যবহার করেছে। ফলে ইমাইয়ের ঘটনাও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন দর-কষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
সাংবাদিকতা থেকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ
ইউকি ইমাই রুশ ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে দীর্ঘদিন পড়াশোনা করেছেন। ২০১৪-১৫ সালে শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচির আওতায় তিনি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ছিলেন। সেখানে রুশ সাহিত্যিক ফিওদর দস্তয়েভস্কিসহ দেশটির সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর গভীর আগ্রহ স্থানীয় বন্ধুদেরও মুগ্ধ করেছিল।
রুশ ভাষায় দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পরে তিনি জাপানের হোক্কাইডো শিমবুন সংবাদপত্রে রাশিয়াবিষয়ক সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। পত্রিকাটি জাপানের উত্তরাঞ্চলের হোক্কাইডো দ্বীপভিত্তিক একটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম।
গত ১৩ অক্টোবর সাখালিন দ্বীপের একটি হোটেলকক্ষে ঢুকে রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের (এফএসবি) কর্মকর্তারা তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে আটক করেন। পরে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে মুখোশধারী এক কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়, তিনি গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে আটক হয়েছেন। বিস্মিত ইমাই তখন রুশ ভাষায় জানতে চান, এর অর্থ কী।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে ইমাইকে গুপ্তচর বলে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে রুশ কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করেনি।
বন্দিবিনিময়ের কূটনীতিতে রাশিয়ার কৌশল?
ইমাইয়ের গ্রেপ্তারের সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এর কয়েক দিন আগে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমানে ক্রেমলিনের অন্যতম কট্টর সমর্থক দিমিত্রি মেদভেদেভ বিদেশি নাগরিকদের আটক করে বন্দিবিনিময়ের জন্য ব্যবহার করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইউরোপীয় ও মার্কিন নাগরিকদের দিয়ে রাশিয়ার বন্দি ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিনিময় তহবিল পূর্ণ করার সময় এসেছে।
রুশ ভাষায় এ ধরনের বন্দিদের বলা হয় ‘অ্যাকটিভি’ বা সম্পদ। আর বন্দিবিনিময়ের সম্ভাব্য তালিকাকে বলা হয় ‘এক্সচেঞ্জ ফান্ড’। অর্থাৎ বিদেশি কোনো নাগরিককে আটক করার পর তাঁকে কেবল অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে নয়, ভবিষ্যতে কূটনৈতিক দর-কষাকষির উপকরণ হিসেবেও বিবেচনা করা হতে পারে।
এর আগে ২০২৩ সালে মার্কিন সাংবাদিক ইভান গার্শকোভিচকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছিল রাশিয়া। অভিযোগটি ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৬ মাস বন্দি থাকার পর ২০২৪ সালে স্নায়ুযুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বন্দিবিনিময়ের অংশ হিসেবে মুক্তি পান তিনি।
গার্শকোভিচের অভিজ্ঞতা থেকে রাশিয়ার বন্দিবিনিময় কূটনীতির একটি চিত্র পাওয়া যায়। তাঁর মুক্তির বিনিময়ে জার্মানিতে হত্যার দায়ে সাজাপ্রাপ্ত রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ভাদিম ক্রাসিকভসহ কয়েকজনকে রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে থাকা হ্যাকিং ও সাইবার অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও ওই বিনিময়ের অংশ ছিলেন।
ইমাইয়ের ক্ষেত্রেও রাশিয়া একই ধরনের কোনো সমঝোতার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
জার্মানিতে আটক রুশ হ্যাকারকে ঘিরে প্রশ্ন
ইমাইকে গ্রেপ্তারের আগে জাপানে ছুটি কাটাতে গিয়ে রাশিয়ার কিলিন নামের একটি সাইবার অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত এক হ্যাকার আটক হন। পরে তাঁকে জার্মানির কাছে প্রত্যর্পণ করা হয়। বড় ধরনের র্যানসমওয়্যার হামলার সঙ্গে এই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
জার্মানির এক কর্মকর্তা এ ঘটনায় বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, জাপানে সুশি খাওয়ার বদলে এখন ওই ব্যক্তি জার্মান কারাগারে পনিরের স্যান্ডউইচ খাচ্ছেন।

রাশিয়া এই হ্যাকারকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে আগ্রহী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বন্দিবিনিময়ের সম্ভাব্য তালিকায় এশিয়ার অন্য দেশগুলোর নাগরিকও থাকতে পারেন। গত দুই বছরে অস্ট্রেলিয়া অন্তত তিনজনকে রুশ গোয়েন্দাদের হয়ে কাজ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার ও অভিযুক্ত করেছে।
গত বছর বেলারুশে বন্দি দুই জাপানি নাগরিককে বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে মুক্ত করার ঘটনাও রয়েছে। ফলে জাপানি নাগরিকদের রাশিয়া বা তার মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যৎ বন্দিবিনিময়ের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসমাপ্ত বিরোধ
জাপান ও রাশিয়ার বর্তমান উত্তেজনার শিকড় অনেক পুরোনো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে সাখালিন দ্বীপ এবং এর কাছাকাছি কুরিল দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। সাখালিনের সঙ্গে ইমাইয়ের পরিবারেরও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর দাদা সেখানে বড় হয়েছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। কুরিল দ্বীপপুঞ্জের দক্ষিণের চারটি দ্বীপের মালিকানা দাবি করে আসছে জাপান। দেশটি এসব দ্বীপকে ‘নর্দার্ন টেরিটরিজ’ নামে অভিহিত করে।
এই ভূখণ্ড বিরোধ মীমাংসার আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। জাপান রাশিয়ার এই অভিযানের কঠোর বিরোধিতা করে এবং মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর দুই দেশের সম্পর্ক ও ভূখণ্ড বিরোধ নিয়ে আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে। গত আগস্টে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক দশকের বেশি সময় পর সাখালিন সফর করেন। সেখানে তিনি নৌবাহিনীর সামরিক মহড়া পর্যবেক্ষণ করেন। একই সময়ে তিনি প্রথমবারের মতো নর্দার্ন টেরিটরিজেও সফর করেন।
সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে এমন একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়, যেখানে একজন সৈনিককে জাপানের রাজপরিবারের প্রতীক ক্রিস্যানথেমাম বা চন্দ্রমল্লিকা চিহ্ন ধ্বংস করতে দেখা যায়। জাপান এই স্মৃতিস্তম্ভ ও পুতিনের সফরের প্রতিবাদ জানায়। এর পরপরই অক্টোবরের শুরুতে রাশিয়ার তেল পরিবহনে ব্যবহৃত তথাকথিত ছায়া নৌবহরের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে টোকিও।
চীন-জাপান বিরোধে রাশিয়ার অবস্থান
জাপানের সঙ্গে রাশিয়ার সাম্প্রতিক বিরোধের পেছনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাপান নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর প্রধান লক্ষ্য চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব মোকাবিলা হলেও রাশিয়ার নিরাপত্তা হিসাবেও এর প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে ওখোৎস্ক সাগরকে রাশিয়া তার পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিনের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে ব্যবহার করে।
এ ছাড়া জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে চাইছেন। রুশ গোয়েন্দা কার্যক্রম বিশ্লেষকদের মতে, জাপান দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার গোয়েন্দাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। কারণ, জাপানে অবস্থান করে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়।

তবে পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে চীনের সঙ্গে জাপানের বিরোধ। তাইওয়ান প্রশ্নে তাকাইচির অবস্থানের কারণে বেইজিং ও টোকিওর মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। রাশিয়া এই বিরোধে চীনের অবস্থানের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে দেখাতে চাইছে বলে মনে করেন কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার গাবুয়েভ।
রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের তথাকথিত নতুন সামরিকতাবাদ নিয়ে চীনের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও দুই দেশ নিজেদের মধ্যে অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরছে। জাপানের একটি সংবাদপত্রের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাশিয়ার নতুন স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের ব্যাখ্যার প্রশ্নে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে।
এভাবে ইমাইয়ের গ্রেপ্তার শুধু জাপান-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের বৃহত্তর সমীকরণেও বিষয়টি যুক্ত হচ্ছে।
লেফোরতোভো কারাগারে অপেক্ষা
ইমাইয়ের প্রাথমিক বিচারপূর্ব আটকাদেশ আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে। ২৩ অক্টোবর জাপানি কূটনীতিকরা তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের একটি পার্সেল পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। এর তিন দিন পর তাঁরা প্রথমবারের মতো তাঁর সঙ্গে কনস্যুলার সাক্ষাতের অনুমতি পান।
মস্কোর লেফোরতোভো কারাগার রাশিয়ার অন্যতম পরিচিত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত বন্দিশালা। সেখানে প্রায় ৯ হাজার বইয়ের একটি গ্রন্থাগার রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বহু আলোচিত বন্দি এই কারাগারে থেকেছেন। তাঁদের মধ্যে মার্কিন সাংবাদিক ইভান গার্শকোভিচও রয়েছেন।
ইমাইয়ের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একই সঙ্গে তাঁকে মুক্ত করার জন্য জাপানকে কোনো বন্দিবিনিময় সমঝোতায় যেতে হবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।
তবে তাঁর গ্রেপ্তার একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া ও জাপানের সম্পর্কের অবনতি এখন শুধু ভূখণ্ড, সামরিক নিরাপত্তা কিংবা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিদেশি নাগরিকদের আটক এবং সম্ভাব্য বন্দিবিনিময়ও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন জটিলতা হয়ে উঠছে।












