দশ মাস নির্বাসনে থাকার পর ভেনেজুয়েলায় ফিরেছেন বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন দেশটির রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকারের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তাতেও নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। মাচাদোর প্রত্যাবর্তন দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত ২৫ অক্টোবর ভেনেজুয়েলায় ফেরার পর মাচাদোর প্রথম প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, তিনি সমর্থকদের সঙ্গে বারকিসিমেতো শহরের কাছে একটি গির্জায় অবস্থিত ডিভিনা পাস্তোরার মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ভার্জিন মেরির এই প্রতিকৃতিতে তাঁকে রাখালির বেশে অনুসারীদের পথ দেখাতে দেখা যায়। মাচাদোর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে এই স্থান নির্বাচনেও প্রতীকী তাৎপর্য ছিল।
গত ডিসেম্বর পর্যন্ত আত্মগোপনে থেকে ভেনেজুয়েলায় অবস্থান করছিলেন মাচাদো। পরে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করতে দেশ ছাড়েন তিনি। এরপর কয়েকবার দেশে ফেরার চেষ্টা করলেও প্রতিবারই সরকারের বাধার মুখে পড়েন বলে জানা যায়। এবার কলম্বিয়া সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে দেশে ফিরেছেন তিনি। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন সরকারের অনেককেই বিস্মিত করেছে।
মাচাদোর ফেরা প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। তাঁর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে মামলা রয়েছে। এরপর থেকে রদ্রিগেজ দেশ পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি তিনি নিজের পদবির সঙ্গে যুক্ত ‘অন্তর্বর্তী’ শব্দটিও বাদ দিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন রদ্রিগেজ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অথচ মাচাদো দীর্ঘদিন ধরে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন। আগামী বছরের জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে নির্বাচনে নিজে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে ট্রাম্পের সমর্থন পাননি তিনি।
গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলা এখনো নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত নয়। অন্যদিকে রদ্রিগেজকে তিনি বারবার ‘দুর্দান্ত’ বলে প্রশংসা করেছেন। মাদুরোর শাসনামলে নিপীড়নের শিকার হওয়া মাচাদোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বরাবরই ছিল দ্বিধাপূর্ণ।
গত জানুয়ারিতে মাচাদো তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক ট্রাম্পকে উপহার দেন। ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান। ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছিলেন, ওই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য তিনি নিজেই বেশি।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মনোযোগ এখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি জ্বালানি খাতের ওপরও। গত আগস্টে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি চুক্তি এবং একটি বেসরকারি তেল কোম্পানির মাধ্যমে দেশটির প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্র। এটি ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত তেলের মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
ট্রাম্প এই ব্যবস্থাকে নিজের প্রশাসনের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন। গত ২৭ অক্টোবর টেক্সাসে এক নির্বাচনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং দেশটি উপহার হিসেবে এক মিলিয়ন ব্যারেল তেল পাঠিয়েছে। এমনকি একসময় ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কিন্তু ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। মাদুরোর পতনকে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে দেখলেও অনেকের কাছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। রাজধানী কারাকাসের এক কম্পিউটার প্রযুক্তিবিদ এদুয়ার্দোর ভাষায়, মাদুরোকে সরানো ভালো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে দেশের পরিস্থিতি প্রায় আগের মতোই রয়েছে। ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বলছে, ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের সদস্যদের পরিবর্তন এবং এরপর নির্বাচন পরিষদের পুনর্গঠনের কথা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, একপর্যায়ে রদ্রিগেজ প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য ঘোষণা করবেন। এরপর ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের কথা রয়েছে। সে হিসাবে নির্বাচন হতে পারে ২০২৭ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৮ সালে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত রদ্রিগেজ সরকারকে এই প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রাখতে দেওয়া হবে না। তাঁর দাবি, দুই পক্ষের মধ্যে সময়সীমা নিয়ে সমঝোতা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত সরকার তা মেনে চলছে।
তবে মাচাদো এই দীর্ঘ সময়সীমা মেনে নেবেন, নাকি দ্রুত নির্বাচনের জন্য চাপ বাড়াবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ২৫ অক্টোবর সমর্থকদের বহর নিয়ে কারাকাসে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টার জন্য রাজধানীর রাস্তায় মানুষ উৎসব করেছে। সেই উদ্যাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মাচাদো, ট্রাম্প নন।












