ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা কমাতে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে তেহরানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও সংকট নিরসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং বৈঠকের পরও সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের গভীরতা তুলে ধরেছে।
গত ২৬ অক্টোবর সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান তেহরান সফর করেন। ইরানের মিত্রগোষ্ঠীগুলোর কয়েক মাস ধরে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর তাঁর এই সফর ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এসব হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রিয়াদ বিমানবন্দরেও হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন। বিমানবন্দরটির কার্যক্রম এখনো অনেকটাই ব্যাহত।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ইরান সফরকে দুই দেশের মধ্যে সংলাপের পথ তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়। সফরে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে তাঁর ছবিও প্রকাশিত হয়।
তবে বৈঠকটির ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দেশের অবস্থান ছিল ভিন্ন। ইরানের কর্মকর্তারা এটিকে নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাবের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। দেশটির এক কট্টরপন্থী সংসদ সদস্য দাবি করেন, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে মধ্যস্থতার জন্য সৌদি আরবকে অসহায় হয়ে ইরানের কাছে আসতে হয়েছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব বৈঠকটিকে নিজেদের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের প্রদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করে।
খালিদ বিন সালমানের সঙ্গে তেহরানে ছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান এবং তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান। তিনটি দেশই গত আগস্টে সৌদি আরবে স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তির অংশীদার। চুক্তিটির মূল বিষয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।
সৌদি আরবের দৃষ্টিতে, তিনটি বড় মুসলিম দেশের সম্মিলিত উপস্থিতি ইরানের প্রতি একটি সতর্কবার্তা। অর্থাৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ইরানকে এককভাবে মোকাবিলা করার পরিবর্তে সৌদি আরব প্রতিবেশী ও মিত্রদের নিয়ে যৌথ অবস্থান তৈরি করতে চাইছে।
তবে বৈঠকে সৌদি আরবের প্রধান দুটি উদ্বেগের সমাধান হয়নি।
প্রথম উদ্বেগ ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীকে ঘিরে। সৌদি আরব চায়, ইরান তাদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বন্ধ করুক। কিন্তু হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে ইরানের আগ্রহের কারণ খুব একটা স্পষ্ট নয়। বরং সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরের পরও রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে।
দ্বিতীয় উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে তাঁর প্রশাসন। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নভেম্বরে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি ওই অঞ্চলে পৌঁছানোর কথা।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন যুদ্ধ ঠেকাতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। কাতার ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা চলতি মাসে একাধিকবার তেহরান সফর করেছেন। এর আগে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায়ও দেশ দুটি মধ্যস্থতা করেছিল। ইউরোপীয় কূটনীতিকেরাও বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এমনকি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এই কূটনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। চলতি সপ্তাহে মস্কোয় তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ও কাতারের আমিরের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
কিন্তু এত তৎপরতার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো সমঝোতা তৈরি হয়নি।
ইরান আপাতত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সীমিত একটি চুক্তি করতে আগ্রহী। দেশটির প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নেবে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ছাড় দেবে। বিনিময়ে ইরান এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর কূটনীতিকেরা এই সময়সীমা নিয়ে দর-কষাকষি করছেন। তাঁদের ধারণা, সাত দিনের পরিবর্তে চার দিনের মধ্যে প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানকে রাজি করানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এই আলোচনা সংকটের মূল বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। কারণ, ট্রাম্প এমন সীমিত চুক্তিতে আগ্রহী নন। তাঁর লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তাৎক্ষণিক ছাড় আদায় করা। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মতো আরেকটি সাময়িক ব্যবস্থায় ফিরতে চান না তিনি।
অন্যদিকে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনাতেই রাজি নয়। তেহরানের চার পক্ষের আলোচনাতেও দেশটি এই বিষয়টি তুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এই অচলাবস্থা কাটাতে সৌদি আরব ইরানকে একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে সতর্কবার্তা দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মতে, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথ তৈরি করতে প্রয়োজনীয় ছাড় দেয়, তাহলে সৌদি আরব ও তার প্রতিবেশীরা বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
কিন্তু ইরান যদি সেই পথে না গিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা আবার শুরু করে, তাহলে মক্কা চুক্তির অংশীদার দেশগুলো সম্মিলিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
তবে এই দুই ধরনের বার্তাই ইরানের কাছে কতটা বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ইরান মনে করে, সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার ধারণার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তেহরানের দৃষ্টিতে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তার অন্যতম শর্ত।
অন্যদিকে সৌদি আরবের সামরিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। হুতিদের হামলা ঠেকাতেই দেশটি হিমশিম খাচ্ছে। একই সঙ্গে মক্কা চুক্তির অংশীদার দেশগুলোও সরাসরি আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে যুক্ত হতে আগ্রহী নয়।
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু বর্তমান সংকটে তারা নিজেরাই কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর এই উদ্যোগ নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিলেও যুদ্ধের আশঙ্কা এখনো কাটেনি।












