ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় নতুন প্রযুক্তি, উন্নত অস্ত্রোপচার পদ্ধতি এবং জিনগত বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনছে। এখন শুধু টিউমার শনাক্ত করা বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা অপসারণ করাই চিকিৎসার একমাত্র লক্ষ্য নয়। বরং রোগীর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা, টিউমারের ধরন ও জিনগত বৈশিষ্ট্য বোঝা এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মস্তিষ্ক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি। কারণ, টিউমারের ধরন, অবস্থান, বৃদ্ধির গতি এবং আণবিক বৈশিষ্ট্য একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১২০ ধরনের ব্রেন টিউমার দেখা যায়। এসব টিউমারের চিকিৎসায় নিউরোসার্জারি, ক্যানসার চিকিৎসা, রেডিওথেরাপি এবং উন্নত রোগনির্ণয় প্রযুক্তির সমন্বয় প্রয়োজন।
উন্নত এমআরআইয়ে টিউমার শনাক্তকরণ
ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করা। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত এমআরআইয়ের পাশাপাশি আরও উন্নত কিছু প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
মায়ো ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞরা এমআর স্পেকট্রোস্কপি, এমআর পারফিউশন এবং এমআর ডিফিউশনের মতো প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে মস্তিষ্কের টিস্যুর গঠন, রক্তপ্রবাহ এবং কোষের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।
এ ছাড়া পিইটি স্ক্যানের মাধ্যমে টিউমারের বিপাকীয় কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। বিশেষ ধরনের স্বল্প আয়ুষ্কালের তেজস্ক্রিয় উপাদান ব্যবহারের জন্য মায়ো ক্লিনিকে নিজস্ব সাইক্লোট্রন সুবিধাও রয়েছে।
তবে শুধু ছবি তোলাই যথেষ্ট নয়। চিকিৎসার পর টিউমার আবার বেড়েছে, নাকি চিকিৎসার প্রভাবে মস্তিষ্কের টিস্যুতে সাময়িক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, সেটিও আলাদা করে বোঝা জরুরি। কারণ, ভুল ব্যাখ্যা হলে রোগীর পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে।
অস্ত্রোপচারে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সুরক্ষা
ব্রেন টিউমারের অস্ত্রোপচারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্যানসার আক্রান্ত অংশ অপসারণের পাশাপাশি মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম রক্ষা করা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, টিউমার যদি কথা বলা, দেখা, চলাফেরা কিংবা শরীরের অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী অংশের কাছাকাছি থাকে, তাহলে অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে জেগে থাকা অবস্থায় মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার বা অ্যাওয়েক ব্রেন সার্জারি করা হতে পারে। এ পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে নির্দিষ্ট কিছু কাজ করতে বলা হয়। এর মাধ্যমে চিকিৎসকেরা মস্তিষ্কের কোন অংশ কোন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তা শনাক্ত করতে পারেন। ফলে টিউমার অপসারণের সময় গুরুত্বপূর্ণ স্নায়বিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।
এ ছাড়া ফাংশনাল এমআরআইয়ের সাহায্যে মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর অবস্থান আগে থেকেই চিহ্নিত করা যায়। অস্ত্রোপচারের সময় বিশেষ ইমেজিং প্রযুক্তি চিকিৎসকদের মস্তিষ্কের জটিল অংশে পৌঁছাতে এবং প্রয়োজনীয় জায়গায় কাজ করতে সহায়তা করে।
কিছু টিউমার মস্তিষ্কের নিচের অংশে বা খুলির গোড়ায় তৈরি হয়। এসব ক্ষেত্রে চোখের দৃষ্টি ও কথা বলার সঙ্গে যুক্ত স্নায়ু সুরক্ষিত রাখা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গামা নাইফ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আশপাশের সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি সীমিত রেখে টিউমারের ওপর বিকিরণ প্রয়োগ করা যায়।
প্রোটন থেরাপিতে সুস্থ কোষের ক্ষতি কমানোর চেষ্টা
ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির পাশাপাশি প্রোটন বিম থেরাপি নিয়েও কাজ চলছে।
প্রচলিত এক্স-রে রেডিয়েশনের তুলনায় প্রোটন থেরাপির বিশেষত্ব হলো, এটি নির্দিষ্ট গভীরতায় গিয়ে অধিকাংশ শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। ফলে টিউমারের আশপাশের সুস্থ টিস্যুতে অপ্রয়োজনীয় বিকিরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
মায়ো ক্লিনিকের রেডিয়েশন অনকোলজি বিশেষজ্ঞদের দাবি, তাদের ব্যবহৃত প্রোটন প্রযুক্তি প্রচলিত উন্নত এক্স-রে পদ্ধতির তুলনায় আশপাশের স্বাভাবিক টিস্যুতে বিকিরণের পরিমাণ ৭০ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। তবে এই সুবিধা টিউমারের অবস্থান, ধরন এবং চিকিৎসার পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে।
জিন বিশ্লেষণে বদলাচ্ছে চিকিৎসার পরিকল্পনা
ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আসছে আণবিক ও জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে। আগে টিউমারের অবস্থান ও কোষের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসার ধরন নির্ধারণ করা হতো। এখন টিউমারের ভেতরের জিনগত পরিবর্তন এবং আণবিক বৈশিষ্ট্যও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্লায়োমাসহ বিভিন্ন ধরনের ব্রেন টিউমারের শ্রেণিবিন্যাসে আণবিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই ধরনের টিউমার হলেও দুই রোগীর ক্ষেত্রে জিনগত বৈশিষ্ট্য আলাদা হতে পারে। ফলে তাঁদের চিকিৎসায়ও ভিন্ন পদ্ধতির প্রয়োজন হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টিউমার স্থির কোনো অবস্থা নয়। সময়ের সঙ্গে এর কোষে নতুন মিউটেশন বা জিনগত পরিবর্তন ঘটতে পারে। গবেষকেরা এসব পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে টিউমারের বিবর্তনের একটি চিত্র তৈরির চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে ক্যানসার কোন পথে এগোচ্ছে, তা বুঝে উপযুক্ত চিকিৎসা নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষণাগারে এমন কিছু ওষুধ ও আণবিক পদ্ধতি নিয়েও কাজ চলছে, যেগুলো ক্যানসার কোষের বিস্তার এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ইমিউনোথেরাপি ও স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা
ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশনের পাশাপাশি নতুন ধরনের চিকিৎসা নিয়েও গবেষণা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে ভাইরাসভিত্তিক চিকিৎসা, ইমিউনোথেরাপি এবং ভ্যাকসিনভিত্তিক পদ্ধতি।
ইমিউনোথেরাপির লক্ষ্য হলো শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে সক্রিয় করা। এতে শুধু টিউমার ধ্বংস নয়, চিকিৎসার পর রোগীর স্বাভাবিক শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
এ ছাড়া রোগীর নিজের শরীরের চর্বি বা অস্থিমজ্জা থেকে সংগ্রহ করা স্টেম সেল ব্যবহার করে ক্যানসারের চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন মায়ো ক্লিনিকের গবেষকেরা।
এ পদ্ধতিতে স্টেম সেলকে একধরনের বাহক হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে। গবেষণাগারের পরীক্ষায় এসব কোষের মধ্যে চিকিৎসার উপাদান বহন করে ক্যানসার আক্রান্ত স্থানে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা একে অনেকটা ট্রোজান হর্স কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে এটি এখনো গবেষণাধীন পদ্ধতি, নিয়মিত চিকিৎসায় প্রতিষ্ঠিত কোনো সমাধান নয়।
চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু টিউমার অপসারণ নয়
ব্রেন টিউমারের চিকিৎসায় নতুন প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হচ্ছে রোগীর জন্য সবচেয়ে উপযোগী চিকিৎসা নির্ধারণ করা। কোনো রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে রেডিয়েশন, কেমোথেরাপি কিংবা আণবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী অন্য চিকিৎসা বেশি উপযোগী হতে পারে।
মায়ো ক্লিনিকে এ ধরনের রোগীদের জন্য বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও পরিচালিত হচ্ছে। এসব গবেষণায় প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি ভাইরাসভিত্তিক পদ্ধতি ও ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে ব্যক্তিভিত্তিক ও নির্ভুল চিকিৎসাপদ্ধতি। অর্থাৎ একই রোগের নাম থাকলেও সবার জন্য একই চিকিৎসা নয়; বরং রোগীর টিউমারের বৈশিষ্ট্য, জিনগত পরিবর্তন, অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসার পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
এর ফলে চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা রক্ষা এবং রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।












