রাজধানীর মিরপুরে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সড়কে শ্রমিকদের জড়ো হওয়া, পুলিশের বাধা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। পরিস্থিতির কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় মেট্রোরেলের মিরপুর-১১ স্টেশন। দুপুরের আগে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় উত্তেজনা ও যান চলাচলে বিঘ্ন অব্যাহত ছিল।
সকাল থেকে কী ঘটেছে মিরপুরে
সকালে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কারখানা থেকে বেরিয়ে আশপাশের এলাকা এবং মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১১-এর বিভিন্ন সড়কে জড়ো হতে থাকেন। তাঁদের দাবি, পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক অবরোধে বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সকাল সোয়া ১০টার দিকে মিরপুর-১১ এলাকায় সংঘর্ষ শুরু হয়। বিভিন্ন গলি থেকে শ্রমিকেরা বেরিয়ে এসে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন। জবাবে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। এতে সড়কে যান চলাচলও ব্যাহত হয়।
মিরপুর-১১ নম্বর এলাকায় সংঘর্ষের পাশাপাশি মিরপুর-১০ এলাকার পরিস্থিতির ওপরও নজর রাখে পুলিশ। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, মিরপুর-১০ এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। তবে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল।
যাত্রী নিরাপত্তায় বন্ধ মেট্রোরেল স্টেশন
শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের প্রভাব পড়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাতেও। পরিস্থিতি বিবেচনায় যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে মেট্রোরেলের মিরপুর-১১ স্টেশনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সকাল ১০টা ২২ মিনিট থেকে ট্রেনগুলো এই স্টেশনে থামা বন্ধ করে। বেলা ১১টা ২০ মিনিট পর্যন্ত স্টেশনটি বন্ধ ছিল বলে জানা যায়। এমআরটি পুলিশের কন্ট্রোল রুমও স্টেশনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
মিরপুর-১১ স্টেশনে কোনো ট্রেন থামছে না এবং যাত্রীরাও সেখানে ওঠানামা করতে পারছেন না। তবে মেট্রোরেলের অন্য স্টেশনগুলোতে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মিরপুর-১১ স্টেশন আবার চালু করা হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে কখন থেকে সেখানে ট্রেন থামবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানানো হয়নি।
কয়েক দিনের আন্দোলন, এবারও উত্তেজনা
মিরপুরে শ্রমিকদের এই বিক্ষোভ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে ৩১ অক্টোবর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবিতে শ্রমিকেরা সড়কে নামেন। ১ নভেম্বর মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১২ এলাকায় অবরোধের পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। ওই দিন সংঘর্ষের মধ্যে একটি পুলিশবাহী গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরদিন শ্রমিকেরা আবারও রাস্তায় নামার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়।
ঢাকা ছাড়াও সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ৩ নভেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগের দিন সাভার-আশুলিয়ার ২৬৪টি এবং গাজীপুরের ১৫০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল অথবা উৎপাদন বন্ধ ছিল। একই সময়ে গাজীপুর ও মিরপুরে ৮২ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও পাওয়া যায়।
৩০ হাজার টাকার দাবি, বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা
পোশাকশ্রমিকদের মূল দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা। শ্রমিকেরা বাড়িভাড়া, খাবার, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধিকে তাঁদের দাবির কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন। সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠনের কথা জানানো হয়েছে।
২ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পোশাক কারখানার মালিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়।
অন্যদিকে, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং রপ্তানি চালান পাঠাতে বিলম্ব হতে পারে।
পরিস্থিতির দিকে নজর শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের
মিরপুরে মঙ্গলবারের সংঘর্ষে পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা নির্ভর করছে শ্রমিকদের আন্দোলন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতির ওপর। দুপুরের আগে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর-১১ স্টেশন বন্ধ ছিল এবং এলাকায় উত্তেজনা চলছিল। পরবর্তী সময়ে সংঘর্ষ থেমেছে কি না বা স্টেশনটি আবার চালু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধের ঘটনায় মিরপুরের জনজীবনে সাময়িক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও কারখানার উৎপাদন সচল রাখার বিষয়টি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রয়েছে শ্রমিক, কারখানার মালিক ও সাধারণ যাত্রীদের।
মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধের ঘটনা আবারও সামনে এনেছে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি। এখন আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি ও চলমান উত্তেজনার কী সমাধান হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
মিরপুরে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধের ঘটনা রাজধানীর জনজীবনে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। শ্রমিকদের দাবি, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করা। অন্যদিকে, সরকার গঠন করেছে মজুরি বোর্ড।












