দেশে ১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম এক বছরেরও কম সময়ে ৫৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়েছে। নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সিলিন্ডারপ্রতি দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সরকারি দামের চেয়েও কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে এলপিজি কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। ফলে বাজারে একটি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ভোক্তারা।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। নভেম্বরের নতুন দাম অনুযায়ী, ১১ মাসে সিলিন্ডারপ্রতি খরচ বেড়েছে ৭৫৪ টাকা।
ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ ভোক্তারা
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেছেন, এপ্রিল থেকে কয়েক দফায় এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছে। মাঝেমধ্যে সামান্য কমানো হলেও সামগ্রিকভাবে মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ অনেক বেশি।
তিনি বলেন, ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য উদ্বেগজনক। দেশের ৮০ শতাংশের বেশি এলপিজি সাধারণ ভোক্তারা ব্যবহার করেন। তারপরও তাঁদের স্বার্থ উপেক্ষা করে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গত ২৯ অক্টোবর এলপিজির দাম নির্ধারণ নিয়ে গণশুনানি করে বিইআরসি। সেখানে ক্যাব লিখিত অভিযোগে জানায়, সরবরাহ সংকটের কথা বলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর দাবি করছেন। অথচ আমদানির তথ্য ও মজুত থাকার পরও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরবরাহ আটকে রাখা হচ্ছে। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না।
খরচ বৃদ্ধির হিসাব প্রকাশের দাবি
এলপিজি আমদানিকারকেরা জাহাজভাড়া, ডলারের বিনিময় হারসহ বিভিন্ন ব্যয় বৃদ্ধির কথা বললেও এসব দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে ক্যাব।
সংগঠনটি সৌদি চুক্তিমূল্য, পরিবহন খরচ, বাণিজ্যিক প্রিমিয়াম, বিমা ও মুদ্রাবিনিময় হারের কারণে প্রকৃত ব্যয় কতটা বেড়েছে, তা জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
শফিকুজ্জামানের অভিযোগ, মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে খরচ বাড়ার কথা বলা হলেও প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব ভোক্তারা জানতে পারেননি। এতে ব্যবসায়ীরা লাভবান হলেও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে। তাঁর মতে, এবারের গণশুনানিতে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
সরকারি দামের চেয়ে বেশি নিচ্ছেন বিক্রেতারা
ভোক্তাদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মঈনুল হাসান জানান, অক্টোবরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থাকলেও তাঁকে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। সর্বশেষ একটি সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ৩৫০ টাকায়। নতুন দাম কার্যকর হওয়ায় এবার ২ হাজার ৫০০ টাকার বেশি দিতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
গৃহিণী ফাহমিদা আক্তার বলেন, এলপিজির খরচ কমাতে দুই মাস আগে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছিলেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিল বেড়ে যাওয়ায় আবার গ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে হয়েছে। এখন এলপিজির দামও বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, বাজারদরের চাপে ভোক্তারা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ও বাড়বে চাপ
এলপিজির মূল্যবৃদ্ধিতে ছোট রেস্তোরাঁগুলোর ব্যয় আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ কম থাকায় রেস্তোরাঁ ব্যবসার অবস্থা এমনিতেই খারাপ। খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাবারের দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যাবে। এতে রেস্তোরাঁভিত্তিক পুরো খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আমদানিকারক ও কমিশন নিয়ে প্রশ্ন
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। সে সময় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ৯৭৫ টাকা। বর্তমানে দেশে এলপিজি আমদানির নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩৫টি। এর মধ্যে ২৩টির আমদানির অবকাঠামো ও সক্ষমতা থাকলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠান।
গণশুনানিতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিলিন্ডারপ্রতি বর্তমান ২০০ টাকার কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা কমিশন চেয়েছে।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলমের অভিযোগ, করপোরেট ব্যবসায়ী ও পরিবেশকেরা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছেন। এলপিজি আমদানি বাজারে গুটিকয়েক বড় ব্যবসায়ীর প্রভাব বাড়ছে এবং সরকার তাঁদের কাছে নতি স্বীকার করে সাধারণ মানুষের ওপর বারবার চাপ তৈরি করছে।
তিনি মনে করেন, জ্বালানি নীতির সামগ্রিক সংস্কার ছাড়া জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। এলপিজির দাম নির্ধারণে বিইআরসিকে কার্যকর ও ভোক্তাবান্ধব ভূমিকা রাখার উপযোগী করে তোলারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। কিন্তু বাজারে ২ হাজার ৫০০ টাকা ছাড়ানোর আশঙ্কায় বাড়ছে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ।












