কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে কোনো গবেষণার প্রশ্ন তৈরি করা, পরীক্ষার নকশা করা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং গবেষণাপত্র লেখার কাজও যন্ত্রের মাধ্যমে করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বিজ্ঞানের সামনে নতুন একটি প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: গবেষণার ফল যদি যন্ত্রই তৈরি করে, তাহলে বিজ্ঞানীর প্রয়োজন কতটা? কোনো আবিষ্কার সত্য হলে সেটি কে করেছে, তা কি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ?
প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, সত্যের কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। যে-ই কোনো বৈজ্ঞানিক সত্য আবিষ্কার করুক, তার যথার্থতা একই থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে বিজ্ঞান কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়। কোনো আবিষ্কারকে সমাজ গ্রহণ করবে কি না, তা নির্ভর করে সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, যাচাইয়ের সুযোগ এবং যাঁরা সেটি উপস্থাপন করছেন তাঁদের গ্রহণযোগ্যতার ওপর।
বিজ্ঞানের অধিকাংশ ফলাফল সাধারণ মানুষের পক্ষে নিজে পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব নয়। এমনকি একজন গবেষকও অন্য ক্ষেত্রের প্রতিটি গবেষণা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেন না। তাই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান গ্রহণের ক্ষেত্রে গবেষকের পরিচয়, তাঁর প্রতিষ্ঠানের সুনাম, গবেষণাপদ্ধতির স্বচ্ছতা এবং সহকর্মীদের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ বিজ্ঞান শুধু আবিষ্কারের প্রক্রিয়া নয়; আবিষ্কারকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলারও একটি সামাজিক ব্যবস্থা।
বিজ্ঞানের বিশ্বাসযোগ্যতার উৎস বদলেছে
ইতিহাসে বৈজ্ঞানিক কর্তৃত্বের ভিত্তি এক জায়গায় স্থির থাকেনি। একসময় প্রকৃতির নিয়ম ব্যাখ্যার চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ছিল ধর্মীয় বিশ্বাসের হাতে। পরে প্রকৃতি ও মহাবিশ্বকে মানুষের পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্যের জায়গা ধীরে ধীরে নেয় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, বৈজ্ঞানিক একাডেমি, গবেষণাপত্রের মূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গেই বিরোধিতা ছিল। কেউ মনে করেছেন, প্রতিষ্ঠান ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বিজ্ঞানের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। আবার কেউ আশঙ্কা করেছেন, গবেষণার মূল্যায়ন যখন নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও পরিমাপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন মৌলিক চিন্তার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখন একই ধরনের পরিবর্তনের মুখে বিজ্ঞান। গবেষণার ফল তৈরিতে মানুষের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরাসরি ভূমিকা রাখছে। ফলে শুধু আবিষ্কারের কৃতিত্ব কার, সেই প্রশ্ন নয়; ফলাফলের দায় কে নেবে, সেটিও বড় হয়ে উঠছে।
সমস্যাটির একটি দিক হলো, আধুনিক গবেষণা ব্যবস্থাও ক্রমে ফলাফলকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। গবেষণার জন্য অর্থায়ন, প্রকল্পের মূল্যায়ন কিংবা প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নির্ধারণে অনেক সময় আবিষ্কারের সংখ্যা, ব্যবহারিক প্রয়োগ ও দৃশ্যমান প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোনো গবেষণা কীভাবে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাল, সেই প্রক্রিয়া বোঝার চেয়ে ফলটি কত দ্রুত কাজে লাগানো যায়, সেটিই মুখ্য হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিবেশে দ্রুত ফল তৈরি করতে সক্ষম এআই ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়া অস্বাভাবিক নয়।
মানুষের তৈরি তথ্যভান্ডার, যন্ত্রের গবেষণার ভিত্তি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণাক্ষমতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করেছেন, গবেষণার ফল উন্মুক্ত করেছেন এবং সেগুলোকে এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে অন্য গবেষকেরা সহজে ব্যবহার করতে পারেন। এই সম্মিলিত উদ্যোগই এখন স্বয়ংক্রিয় গবেষণার ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আলফাফোল্ড। প্রোটিনের গঠন অনুমান করার এই এআই ব্যবস্থা প্রোটিন ডেটা ব্যাংকে সংরক্ষিত বহু বছরের গবেষণার ওপর প্রশিক্ষিত হয়েছে। ২০২৪ সালে এ ব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকার জন্য ডেমিস হাসাবিস ও জন জাম্পার রসায়নে নোবেল পুরস্কারের অংশ পান। অর্থাৎ যন্ত্রের সাফল্যের পেছনে রয়েছে অসংখ্য বিজ্ঞানীর দীর্ঘদিনের সংগৃহীত জ্ঞান।
তবে এখন এআই শুধু আগের গবেষণার তথ্য ব্যবহার করছে না। কিছু ব্যবস্থা নিজেরাই গবেষণার অনুমান তৈরি করছে, পরীক্ষার পরিকল্পনা করছে, ফল বিশ্লেষণ করছে এবং গবেষণাপত্র প্রস্তুত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ইনটোলজির তৈরি জোচি নামের একটি এআই ব্যবস্থার লেখা গবেষণাপত্র ২০২৫ সালে অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্টিকসের বার্ষিক সম্মেলনের মূল ধারায় সহকর্মী মূল্যায়ন পেরিয়ে গৃহীত হয়। অন্যদিকে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ফিউচারহাউসের তৈরি রবিন নামের একটি ব্যবস্থা গবেষণার অনুমান তৈরি, পরীক্ষার নকশা ও ফল বিশ্লেষণ করে অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণের সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবে আগে থেকেই অনুমোদিত একটি ওষুধকে চিহ্নিত করে। এ গবেষণার ফল পরে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
এ ধরনের উদাহরণ দেখায়, গবেষণায় এআইয়ের ভূমিকা আর কেবল তথ্য খোঁজা বা হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গবেষণার মূল কাজের একটি অংশও এখন যন্ত্র করতে পারছে।
আবিষ্কার হলে কৃতিত্ব, ভুল হলে দায় কার?
ধরা যাক, কোনো এআই ব্যবস্থা এমন একটি টিকা, অনুঘটক বা ব্যাটারির উপাদান আবিষ্কার করল, যার বাস্তব প্রয়োগে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তখন সাধারণ মানুষের কাছে আবিষ্কারটি কে করেছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে সেটি কতটা নিরাপদ ও কার্যকর। কিন্তু গবেষণার ফল ভুল হলে, কোনো ওষুধ ক্ষতি করলে কিংবা প্রযুক্তির প্রয়োগে অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় ঘটলে দায় নেবে কে?
মানব গবেষকের ক্ষেত্রে অন্তত একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা যায়। তাঁর গবেষণাপদ্ধতি পরীক্ষা করা যায়, ভুল প্রমাণিত হলে সংশোধন বা প্রত্যাহারের দাবি তোলা যায়। গবেষণায় জালিয়াতি বা গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়লে তাঁর পেশাগত সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অবশ্য মানুষের লেখা গবেষণাপত্রও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। পুনরায় পরীক্ষা করে ফল না পাওয়া, গবেষণাপত্র প্রত্যাহার এবং তথ্য জালিয়াতির ঘটনা বিজ্ঞানের ইতিহাসে রয়েছে। তবু মানব লেখক বা গবেষক থাকলে অন্তত জবাবদিহির একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থাকে।
এআই ব্যবস্থাকে সেই অর্থে দায়ী করা যায় না। একটি মডেলকে প্রশ্ন করা গেলেও তার বিরুদ্ধে পেশাগত বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এ কারণেই অধিকাংশ শীর্ষস্থানীয় গবেষণা সাময়িকী এআইকে স্বতন্ত্র লেখক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায় না। লেখক হওয়ার সঙ্গে কৃতিত্বের পাশাপাশি দায় নেওয়ার বিষয়টিও যুক্ত। কিন্তু শুধু এআইকে লেখক হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যদি যন্ত্র নেয়, তাহলে মানব লেখকের নাম থাকলেও তাঁর প্রকৃত ভূমিকা ও দায়ের সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
বিজ্ঞানীর নতুন ভূমিকা হবে যাচাইকারী?
বিজ্ঞানীদের মধ্যে এআই ব্যবহারের বিস্তার ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য। একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৪৭ শতাংশ বিজ্ঞানী প্রতিদিন এআই ব্যবহার করেন, আর ৩১ শতাংশ ব্যবহার করেন প্রতি সপ্তাহে। প্রযুক্তি আরও সক্ষম হলে এই নির্ভরতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এতে বিজ্ঞানীর ভূমিকা বিলুপ্ত হওয়ার বদলে বদলে যেতে পারে। গবেষণার প্রতিটি ধাপ নিজে সম্পন্ন করার পরিবর্তে বিজ্ঞানীকে এআইয়ের তৈরি অনুমান, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত যাচাই করতে হতে পারে। তিনি হয়ে উঠতে পারেন গবেষণার ফলের প্রধান মানবিক নিশ্চয়তাদাতা।
কিন্তু এখানেও বড় বাধা রয়েছে। এআই ব্যবহারে সময় বাঁচলেও সেই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফলাফল যাচাইয়ে ব্যয় করতে হচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া যেসব বিজ্ঞানী এআই ব্যবহারে সময় সাশ্রয়ের কথা জানিয়েছেন, তাঁদের প্রায় অর্ধেকই সাশ্রয় হওয়া সময়ের এক-চতুর্থাংশের বেশি ব্যয় করেন এআইয়ের ফল পরীক্ষা করতে। অন্যদিকে যাচাই না হওয়া গবেষণার অনুমান ও ফলাফলের সংখ্যা বাড়ছে।
সহকর্মী মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। গবেষণাপত্রের মান যাচাইয়ের জন্য যে ব্যবস্থার ওপর বিজ্ঞানীরা নির্ভর করেন, সেখানেও এআই ঢুকে পড়েছে। ২০২৬ সালের ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন লার্নিং রিপ্রেজেন্টেশনে জমা দেওয়া গবেষণাপত্রের মূল্যায়ন নিয়ে একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় পাঁচটির মধ্যে একটি পর্যালোচনা সম্পূর্ণভাবে এআই দিয়ে তৈরি হয়েছিল। ফলে যে প্রক্রিয়া এআইয়ের ফল যাচাই করার কথা, সেটিও যদি যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্ন আরও জটিল হবে।
বিশ্বাসযোগ্যতার নতুন প্রতিষ্ঠান কারা হবে?
এ অবস্থায় বৈজ্ঞানিক বিশ্বাসযোগ্যতার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে? একটি সম্ভাবনা হলো, গবেষণায় ব্যবহৃত এআই প্রযুক্তি যে প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে, তারাই ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেবে কোন গবেষণাকে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তখন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ওপরও প্রভাবশালী কর্তৃত্ব অর্জন করতে পারে। এতে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে। যে প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি তৈরি ও পরিচালনা করছে, সেই প্রতিষ্ঠানই যদি তার গবেষণার মান যাচাই করে, তাহলে স্বাধীনতার নিশ্চয়তা কোথায়?
অন্য সম্ভাবনা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় গবেষণাগার, বিজ্ঞান একাডেমি ও গবেষণা সাময়িকীর মতো দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সংস্থাগুলো নিজস্ব এআই ব্যবস্থা তৈরি করবে অথবা অন্যদের তৈরি ব্যবস্থা যাচাই ও অনুমোদনের দায়িত্ব নেবে। এতে বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষের কাছে আগে থেকেই পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে। রবিনের গবেষণার গ্রহণযোগ্যতা শুধু ফিউচারহাউসের ঘোষণার ওপর নির্ভর করেনি; নেচার সাময়িকীতে প্রকাশের মাধ্যমে তা স্বাধীন মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে গেছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় বা সাময়িকীর পরিচিতিই যথেষ্ট হবে না। গবেষণার মান যাচাইয়ের বর্তমান ব্যবস্থাই চাপের মুখে রয়েছে। ভুয়া গবেষণাপত্র তৈরি করা প্রতিষ্ঠান, যন্ত্রনির্ভর জমা দেওয়া লেখা এবং সীমিত সংখ্যক বিশেষজ্ঞের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ—সব মিলিয়ে সহকর্মী মূল্যায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা কঠিন হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ একজন প্রধান গবেষকের কাছ থেকে বছরে সর্বোচ্চ ছয়টি আবেদন গ্রহণের সীমা নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া আবেদনকারীর নিজস্ব মৌলিক চিন্তা হিসেবে বিবেচিত হবে না—এমন মাত্রায় এআই দিয়ে তৈরি আবেদনও তারা বিবেচনায় নেবে না।
জবাবদিহির অবকাঠামো তৈরি করতে হবে
এআইনির্ভর বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু প্রযুক্তির উন্নতির ওপর নয়, বরং গবেষণার প্রতিটি ধাপের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। কোন তথ্যভান্ডার ব্যবহার করা হয়েছে, মডেলের কোন সংস্করণ দিয়ে কাজ হয়েছে, কীভাবে অনুমান তৈরি হয়েছে এবং কোন বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে—এসবের নির্ভরযোগ্য ও পরিবর্তন-অযোগ্য নথি সংরক্ষণ করতে হবে।
পাশাপাশি গবেষণার ফল যাচাইয়ের জন্য স্বাধীন ব্যবস্থা দরকার। যে এআই একটি ফল তৈরি করেছে, সেটির ওপর নির্ভর না করে অন্য গবেষক বা স্বাধীন ব্যবস্থা দিয়ে একই ফল পুনরায় পরীক্ষা করতে হবে। কোনো ফল পুনরুৎপাদন করা না গেলে তার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করতে হবে। আর প্রতিটি গবেষণার শেষে এমন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে, যারা ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতার নিশ্চয়তা দেবে এবং ভুল প্রমাণিত হলে জবাবদিহি করবে।
আইন ও বিচারব্যবস্থাও ইতিমধ্যে মানুষের সৃজনশীল ভূমিকার প্রশ্নে কিছু সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, পেটেন্টে আবিষ্কারক হিসেবে কেবল একজন স্বাভাবিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি আপিল আদালতও কপিরাইটের ক্ষেত্রে মানব লেখকের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। এই সিদ্ধান্তগুলো দেখায়, প্রযুক্তি যতই এগোক, আইনগত অধিকার ও দায় নির্ধারণে মানুষের ভূমিকা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞান প্রতিটি যুগেই বিশ্বাসযোগ্যতার নতুন ভিত্তি তৈরি করেছে। একসময় ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্য, পরে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এরপর সহকর্মী মূল্যায়ন ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—বিভিন্ন ব্যবস্থা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। এখন এআই সেই কাঠামোকে নতুন করে সাজানোর চাপ তৈরি করছে।
বিজ্ঞানী ছাড়াই কোনো আবিষ্কার সম্ভব কি না, সেটি হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আর তাত্ত্বিক প্রশ্ন থাকবে না। কিন্তু বিজ্ঞানী ছাড়াই বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের দায় নির্ধারণ, ফল যাচাই এবং জনসাধারণের আস্থা বজায় রাখা সম্ভব কি না, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা। আবিষ্কারের ক্ষমতা যন্ত্রের হাতে যেতে পারে; কিন্তু সেই আবিষ্কারের সত্যতা ও পরিণতির দায় কার, তার উত্তর মানুষকেই দিতে হবে।
লেখক: সামি মাহরুম, স্পার্ক এক্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। তিনি এর আগে ইনসিয়াড, ওইসিডি ও নেস্তায় বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন।












