ভারত ও শ্রীলঙ্কার সম্পর্কের ভিত্তি বহু পুরোনো। ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, ভৌগোলিক অবস্থান, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ—বিভিন্ন বিষয় দুই দেশকে দীর্ঘদিন ধরে কাছাকাছি রেখেছে। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। সেটি হলো প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ। দুই দেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জে অনেক মিল রয়েছে। ফলে এই অভিন্ন বাস্তবতা কাজে লাগিয়ে সহযোগিতার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে একটি প্রাণী হতে পারে প্রতীকী সূচনা—গৌর, যাকে ভারতীয় বাইসন নামেও চেনা যায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বুনো গবাদিপশু প্রজাতি গৌর একসময় শ্রীলঙ্কায়ও বিচরণ করত। ১৬৮১ সালে প্রকাশিত নিজের ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘অ্যান হিস্টোরিক্যাল রিলেশন অব দ্য আইল্যান্ড সিলন’-এ ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাবিক রবার্ট নক্স ‘গাউভেরা’ নামে একটি প্রাণীর কথা লিখেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ক্যান্ডির রাজার পশুপালনের মধ্যে প্রাণীটি দেখেছেন। শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন এলাকার নামেও ‘গাভারা’ শব্দটির উপস্থিতি রয়েছে। গাওয়ারাগানে, গাওয়ারাগিরিয়া, গাওয়ারাম্মানা, গাওয়ারাওয়েলা ও গাওয়ারাতেন্নার মতো স্থাননাম সেই অতীতের স্মৃতি বহন করে।
প্রাণীটি এখন শ্রীলঙ্কার বন্য পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত। তবে উপযুক্ত প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রে একটি পরিকল্পিত বন্দি প্রজনন ও সংরক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশটির মানুষ আবার গৌর দেখার সুযোগ পেতে পারে কি না, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মধ্য দিয়ে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বৃহত্তর সহযোগিতার পথও খুলতে পারে।
বন্যপ্রাণী রক্ষা ও মানুষের জীবনযাত্রা
শ্রীলঙ্কায় হাতি শুধু বন্যপ্রাণী নয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৌদ্ধ ঐতিহ্যে হাতির বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন মন্দিরের উৎসবে সজ্জিত দাঁতাল হাতি পবিত্র স্মারক বহন করে। ক্যান্ডির বার্ষিক এসালা পেরাহেরায় বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু বহনের দায়িত্ব পালন করে একটি দাঁতাল হাতি। ফলে কোনো হাতির মৃত্যু বা নির্যাতনের ঘটনা দেশটির মানুষের মধ্যে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সম্প্রতি গুলিবিদ্ধ হয়ে দাঁতাল হাতি কাভানতিসার মৃত্যুও ব্যাপক শোকের জন্ম দিয়েছে।

কিন্তু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সমস্যা শুধু প্রাণী রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ ও হাতির সংঘাতে প্রাণহানি ঘটে, ফসল নষ্ট হয়। বানর, ময়ূর, সজারুসহ অন্যান্য প্রাণীর কারণেও কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং গ্রামীণ মানুষের জীবিকা সুরক্ষাকে পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ভারতেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। দুই দেশ অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে আবাসস্থল ব্যবস্থাপনা, ফসল সুরক্ষা এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত কমানোর কার্যকর পদ্ধতি খুঁজে পেতে পারে।
আন্তর্জাতিকভাবে উপহার দেওয়া প্রাণীর ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা জরুরি। থাইল্যান্ড থেকে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হাতি মুথু রাজার কল্যাণ ও পরিচর্যা নিয়ে উদ্বেগের পর ২০২৩ সালে তাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। অন্য হাতি উপহার দেওয়ার বিষয়েও পরবর্তী আলোচনা প্রাণী স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বের গুরুত্ব সামনে এনেছে। কূটনৈতিক সৌজন্য যথেষ্ট নয়; উপযুক্ত আবাসন, চিকিৎসা, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
আগের সহযোগিতার ভিত্তি কাজে লাগানো
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে একেবারে নতুন করে শুরু করতে হবে না। ২০২৩ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষিত আন্তর্জাতিক বিগ ক্যাট অ্যালায়েন্সে শ্রীলঙ্কার অংশগ্রহণ দুই দেশের সহযোগিতার একটি বিদ্যমান ভিত্তি তৈরি করেছে। বড় বিড়ালজাতীয় সাতটি প্রজাতি ও তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণে কাজ করা এই জোটের মাধ্যমে গবেষণা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিনিময় এবং বন্যপ্রাণী কূটনীতির সুযোগ রয়েছে।
শ্রীলঙ্কার নিজস্ব সক্ষমতাও কম নয়। দেশটিতে অভিজ্ঞ বন্যপ্রাণী গবেষক, বিশেষজ্ঞ, প্রকৃতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংরক্ষণকর্মীদের সক্রিয় একটি পরিমণ্ডল রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবীরাও এ কাজে যুক্ত। ফলে ভারত-শ্রীলঙ্কা সহযোগিতাকে একতরফা সহায়তার সম্পর্ক হিসেবে দেখার কারণ নেই। শ্রীলঙ্কারও দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে।
গৌর সংরক্ষণ কর্মসূচি এ ক্ষেত্রে একটি বাস্তব উদ্যোগ হতে পারে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুই দেশের প্রাণিবিদ্যা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে সম্ভাব্যতা যাচাই জরুরি। প্রাণীর কল্যাণ, চিকিৎসাসেবা, উপযুক্ত আবাসন, প্রজননের পরিবেশ, দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় এবং জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে।
সমীক্ষায় ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে ভারত থেকে গৌর সরবরাহ, কারিগরি সহযোগিতা কিংবা বিশেষজ্ঞ সহায়তার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদন ও সংরক্ষণগত অগ্রাধিকার মানতে হবে। শ্রীলঙ্কার কোনো উপযুক্ত চিড়িয়াখানা বা প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রকে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে বন্দি অবস্থায় একটি সুপরিচালিত গৌরের পাল গড়ে তোলা এবং প্রাণীটিকে আবার বনে ছেড়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথম উদ্যোগটি গবেষণা, শিক্ষা ও সংরক্ষণে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু বন্য পরিবেশে পুনঃপ্রবর্তনের ক্ষেত্রে বাস্তুতন্ত্র, মানুষের নিরাপত্তা ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। তাই বন্দি সংরক্ষণ কর্মসূচিকে ভবিষ্যতে বনে অবমুক্ত করার পূর্বনির্ধারিত ধাপ হিসেবে দেখা উচিত নয়।

একটি প্রাণী থেকে বৃহত্তর সহযোগিতা
গৌরকে কেন্দ্র করে উদ্যোগ শুরু হলেও ভারত ও শ্রীলঙ্কার সহযোগিতা একটি প্রজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার প্রয়োজন নেই। যৌথ গবেষণা, পশুচিকিৎসা বিষয়ে প্রশিক্ষণ, বিশেষজ্ঞ বিনিময় এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত কমানোর প্রকল্প হাতে নেওয়া যেতে পারে। দুই দেশের বন্যপ্রাণী বিভাগ, চিড়িয়াখানা, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংরক্ষণ সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ কর্মীদল গঠন করা হলে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, দায়িত্ব বণ্টন এবং ফলাফল মূল্যায়ন সহজ হবে।
এ ধরনের উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তব সুফল, যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার ওপর। শুধু প্রাণী বিনিময় কিংবা নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরির মধ্যে সহযোগিতার সাফল্য খোঁজা ঠিক হবে না। বরং সীমিত পরিসরে এমন কর্মসূচি শুরু করা দরকার, যার ফলাফল পরিমাপ করা সম্ভব।
ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্কের পরিসর অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু পরিণত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিচয় শুধু এসব ক্ষেত্রের সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দুই দেশের প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে যুক্ত করার মতো উদ্যোগও প্রয়োজন।

গৌর সেই নতুন অধ্যায়ের একটি অর্থবহ সূচনা হতে পারে। উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় প্রাণীটির শ্রীলঙ্কায় ফিরে আসা দেশটির প্রাকৃতিক ইতিহাসের বিস্মৃত একটি অধ্যায়কে নতুন করে সামনে আনবে। তবে উদ্যোগটি বাস্তবসম্মত কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে, কূটনৈতিক আগ্রহের ওপর নির্ভর করে নয়।
ভারত ও শ্রীলঙ্কা এত দিন অভিন্ন ইতিহাসকে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে। এবার অভিন্ন প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে সেই সম্পর্ককে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে।
লেখক: মিলিন্দা মোরাগোদা শ্রীলঙ্কার সাবেক মন্ত্রিসভার সদস্য ও কূটনীতিক। তিনি কৌশলগত বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাথফাইন্ডার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতে শ্রীলঙ্কার হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। লেখকের মতামত ব্যক্তিগত।














