যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের জন্য সরাসরি ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর এই বক্তব্য ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান কিছুটা আলাদা করার চেষ্টা করছেন তিনি।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রায় ৬০০ শব্দের একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন ভ্যান্স। সেখানে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া অনেক সমর্থক মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পাশ থেকে সরে গেছেন।
ভ্যান্সের ভাষায়, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে। প্রেসিডেন্ট নিজেই গত রাতে তা বলেছেন।’
মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্পও স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে পড়েছে। এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের কাছ থেকে নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সের আপত্তি প্রকাশ্যে
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সের অস্বস্তির বিষয়টি ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে আগে থেকেই আলোচিত ছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানে হামলা শুরু করার পর প্রকাশ্যে তিনি যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিলেও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠকে এই সংঘাতের বিরোধিতা করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে এত দিন তাঁর এই মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসেনি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি।
ভ্যান্স বলেন, যুদ্ধের কারণে সিনেটে আগামী ছয় বছরের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারানো যদি কারও কাছে গ্রহণযোগ্য মূল্য বলে মনে হয়, তাহলে তাঁকে যুক্তি দিয়ে সেটি ব্যাখ্যা করতে হবে। তাঁর মতে, যুদ্ধের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার চেয়ে এর রাজনৈতিক মূল্য স্বীকার করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একজন দায়িত্বশীল ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এভাবে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের সমালোচনা সাম্প্রতিক মার্কিন রাজনীতিতে বিরল ঘটনা।
ট্রাম্পও স্বীকার করলেন যুদ্ধের প্রভাব
ভ্যান্সের বক্তব্যের পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া। সাধারণত নিজের প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিঃশর্ত আনুগত্য প্রত্যাশা করেন তিনি। কিন্তু এবার ভ্যান্সের বক্তব্যের সঙ্গে আংশিকভাবে একমত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ইরান যুদ্ধের বড় ভূমিকা ছিল। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখার জন্য যুদ্ধটি প্রয়োজনীয় ছিল। একই পরিস্থিতি আবার তৈরি হলে তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন বলেও জানান।
ভ্যান্সের বক্তব্যকে ট্রাম্পের কাছ থেকে নিজেকে আলাদা করার কৌশল হিসেবে দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক ড্যানিয়েল বাইম্যান। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার বিষয়টি ভ্যান্সের জন্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে হবে।
২০২৮ সালের নির্বাচনের জন্য চার দফা কৌশল
ইরান যুদ্ধের সমালোচনার পাশাপাশি ভ্যান্স রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ঘুরে দাঁড়ানোর একটি রূপরেখাও তুলে ধরেছেন। তাঁর প্রস্তাবে চারটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রথমত, ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো। দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দেওয়া। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। চতুর্থত, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ধরন পরিবর্তন করা।
এই চারটি বিষয় ভ্যান্সের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে বিদেশে সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমানো, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়গুলো তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ অ্যাশলি ডেভিসের মতে, ভ্যান্স মূলত নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান পরীক্ষা করে দেখছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে না গিয়ে কতটা স্বাধীন অবস্থান নেওয়া যায়, সেটিই সম্ভবত যাচাই করছেন তিনি।
ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব কতটা বাড়বে?
তবে ভ্যান্স সত্যিই ট্রাম্পের সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি করছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক্সে বিবৃতিটি প্রকাশের আগে ট্রাম্পকে সেটি দেখিয়েছিলেন ভ্যান্স। ফলে তাঁর বক্তব্যকে সরাসরি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
অন্যদিকে, ট্রাম্প এখনো ২০২৮ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কাকে সমর্থন করবেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাননি। তিনি একাধিকবার ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর প্রশংসা করেছেন। তবে কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেওয়ার ঘোষণা দেননি।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কে বহন করবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রাখতেই তিনি আগ্রহী বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও অতীতে কথা বলেছেন তিনি।
অন্যদিকে, ভ্যান্স এখনো ২০২৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেননি। তাঁর সহযোগীদের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে তিনি এখনো চিন্তাভাবনা করছেন।
ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভ্যান্সের এই প্রকাশ্য সমালোচনা শেষ পর্যন্ত কতটা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এটি ট্রাম্প-পরবর্তী রিপাবলিকান নেতৃত্বের লড়াইয়ের সূচনা হতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্যান্সের সম্ভাব্য প্রার্থিতার প্রথম বড় রাজনৈতিক সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে ঘটনাটিকে।












