যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই নিজেদের হাতে নিতে যাচ্ছে দলটি। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক ও আইন প্রণয়নসংক্রান্ত অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। সিনেটে দলটির আসনসংখ্যা অন্তত ৫৪-৪৪ হয়েছে। আলাস্কা ও মিসিসিপির ফল তখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত ৩০টি আসন বাড়িয়েছে দলটি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে ফেরাতে যেসব ভোটার ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের একটি বড় অংশ এবার ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকেছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির প্রতি অসন্তোষ এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেন, তাঁদের দায়িত্ব ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের প্রতি। আগামী বছর থেকে প্রতিনিধি পরিষদ আর ট্রাম্প প্রশাসনের ইচ্ছামতো পরিচালিত হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জেফ্রিস প্রতিনিধি পরিষদের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার পথে রয়েছেন।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, শুধু নির্বাচনে জয়লাভ করাই যথেষ্ট নয়, সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। দ্রব্যমূল্যের চাপ, শিক্ষা ও সড়ক অবকাঠামোর মতো বিষয়গুলোতে ডেমোক্র্যাটদের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও ডেমোক্র্যাটদের জয়

নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্তিশালী অঙ্গরাজ্যগুলোতে।
টেক্সাসে প্রায় চার দশক পর সিনেট আসন পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। একই সঙ্গে তিন মেয়াদের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকেও পরাজিত করেছেন দলটির প্রার্থী।
কানসাসে মহামন্দার সময়ের পর প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। দক্ষিণ ক্যারোলাইনাতেও ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া সিনেট প্রার্থীকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যটিতে প্রায় ১৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প।
জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। নিউ মেক্সিকোর ডেব হালান্ড হয়েছেন দেশটির প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর।
মিশিগানে সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট দলের বামপন্থী ধারার নেতা আবদুল এল-সায়েদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
ইরান যুদ্ধ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে ক্ষোভ
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। দলটি অভিযোগ করে, ট্রাম্প প্রশাসনের আমদানি শুল্ক এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি ট্রাম্প পরিবারের আর্থিক কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির অভিযোগও নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর অধিকারসহ বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে অবস্থান নিয়ে প্রচার চালায়। দলটি ডেমোক্র্যাটদের উগ্র ও চরমপন্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তবে নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, ভোটারদের বড় উদ্বেগ ছিল দৈনন্দিন খরচ ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।
ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্যের ব্যাপ্তি বোঝাতে আরও একটি পরিসংখ্যান সামনে এসেছে। ভোট গণনা হওয়া প্রায় ২ হাজার ১০০ কাউন্টির মধ্যে ৯৯ শতাংশেই রিপাবলিকানরা আগের তুলনায় সমর্থন হারিয়েছে।
ফ্লোরিডার রিপাবলিকান গভর্নর রন ডিস্যান্টিস ফলাফল বিশ্লেষণ করে বলেন, তাঁর দলের জন্য এটি অস্তিত্বের সংকটের মতো পরিস্থিতি।
ট্রাম্পের সামনে কংগ্রেসের বাধা
নতুন কংগ্রেস আগামী জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারে। প্রেসিডেন্টের পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠতে পারে।

সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ট্রাম্পের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদগুলোর প্রার্থীদের আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও পাবে ডেমোক্র্যাটরা। সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিচারপতির পদ শূন্য হলে নতুন বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও তারা বাধা তৈরি করতে পারবে।
বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ দুই রক্ষণশীল বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস ও স্যামুয়েল আলিটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁদের কেউ অবসর নিলে নতুন বিচারপতি নিয়োগে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত সিনেটের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে উভয় কক্ষ। ডিসেম্বরের পর কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রম চালু রাখতে অর্থায়নসংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করাতে হবে। এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারে রিপাবলিকানরা।
নির্বাচনের ধাক্কায় প্রতিনিধি পরিষদে নেতৃত্বের পরিবর্তনও আসছে। স্পিকার মাইক জনসন জানিয়েছেন, আগামী বছর তিনি আর রিপাবলিকানদের নেতৃত্ব দেবেন না।
ইরান যুদ্ধের দায় নিয়ে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের বক্তব্য
নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ তাঁর দলের ক্ষতির অন্যতম কারণ। তবে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তের পক্ষে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন তিনি।
অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সরাসরি যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ এক বার্তায় তিনি বলেন, পরাজয়ের কারণ যুদ্ধ। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর মতো মূল্য দিয়ে এই যুদ্ধ কতটা যৌক্তিক ছিল, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ভ্যান্সের এই বক্তব্য রিপাবলিকান শিবিরের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে সামনে এনেছে।
এদিকে নির্বাচনের পরদিন ট্রাম্পের প্রথম প্রকাশ্য কর্মসূচি ছিল হোয়াইট হাউসে নির্মাণাধীন নতুন বলরুম পরিদর্শন। প্রায় এক ঘণ্টার এই অনুষ্ঠানে তিনি নির্বাচনের ফল নিয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করেন। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করলেও তাঁদের কোনো উদ্যোগ ধ্বংসাত্মক হলে নিজের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহারের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী ট্রাম্প তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে আগামী দুই বছর তাঁর প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়ন, সরকারি নিয়োগ এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।












