তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে জানুয়ারি মাস থেকে বাড়তি বেতন পাবেন পোশাকশ্রমিকেরা। গত বুধবার জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠকে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে একমত হয়েছেন।
ঢাকার সেগুনবাগিচায় মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুভানি। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার দিনই বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক শেষে মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান জানান, প্রথম বৈঠকে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে বোর্ডের পরবর্তী বৈঠকে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা লিখিতভাবে তাঁদের মজুরি প্রস্তাব জমা দেবেন।
শ্রমিক প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করার বিষয়ে মালিকপক্ষ সম্মতি দিয়েছে, যাতে জানুয়ারি মাসে শ্রমিকেরা বাড়তি বেতন পান। তিনি নিরপেক্ষ সদস্যের কাছ থেকেও একটি মজুরি প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাবুল আখতার বলেন, শ্রমিকদের মধ্যে নানা অভিযোগ, ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে। এসব বিষয় পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে শ্রম আইন বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
চলমান মজুরি আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে শ্রমিকদের কোনো ধরনের উসকানিতে সাড়া না দেওয়া এবং বেআইনি কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান এই শ্রমিক নেতা। গ্রেপ্তার শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তির দাবিও জানান তিনি।
মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এ বি এম শামসুদ্দিন বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ করতে তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে জানুয়ারি থেকে শ্রমিকেরা নতুন বেতন পান। এ বিষয়ে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই।
৪৯২ কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার শ্রম মন্ত্রণালয় নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। তবে বোর্ড গঠনের পরও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
গত বুধবার গাজীপুর, সাভার, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেন। এতে ৪৯২টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর মধ্যে ৯২টি কারখানা এক থেকে তিন দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে আন্দোলনের পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। মঙ্গলবারের মতো বুধবারও বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তবে মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ায় বৃহস্পতিবার পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান পরিবর্তন
নতুন মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে গত সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নিয়েছিলেন জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। তবে বোর্ডের প্রথম বৈঠকের আগেই বুধবার সকালে তাঁকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের প্রজ্ঞাপনে শেখ আশফাকুর রহমানকে বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) পদে বদলি করা হয়। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন পিরোজপুরের শিশু সহিংসতা প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আজাদ সুভানি।
তবে আগের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার কারণ প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়নি। একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পোশাকশিল্পের মতো সংবেদনশীল খাতে মজুরি নির্ধারণের দায়িত্ব পালনে আগের চেয়ারম্যানের ওপর সরকার পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেনি।
শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান
এদিকে বুধবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমসহ শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে শ্রমমন্ত্রী বলেন, তিন বছরের মধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। নিরপেক্ষ আলোচনার মাধ্যমে ডিসেম্বরের মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের জন্য যৌক্তিক ও ন্যায্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হবে।
তিনি শ্রমিকদের স্বেচ্ছায় ও শান্তিপূর্ণভাবে কারখানায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
শ্রমিক আন্দোলনের সময় গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক হোসেনের পরিবারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান শ্রমমন্ত্রী। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনও ডিসেম্বরের মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের জন্য গ্রহণযোগ্য ও ন্যায্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ শ্রমিক সমাবেশে কিছু বহিরাগত ঢুকে উসকানি, সহিংসতা ও নাশকতার চেষ্টা করছে। সাধারণ শ্রমিকেরা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত নন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।












