যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ভারতের শেয়ারবাজারেও। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দেশটির প্রধান দুই শেয়ারসূচক প্রায় তিন মাসের সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ভারতের বেঞ্চমার্ক নিফটি ৫০ সূচক ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ২৪ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সেনসেক্স সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে সূচকটি ৭৮ হাজার ৭৯৮ দশমিক ২৫ পয়েন্টে অবস্থান করছিল।
গত ছয় কার্যদিবসে সূচক দুটি প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এক বছরের মধ্যে ভারতের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের টানা উত্থানের রেকর্ড হবে। সাম্প্রতিক উত্থানে চলতি বছরে নিফটি ৫০-এর দরপতন কমে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে এবং সেনসেক্সের দরপতন ৭ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের বিজয়কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁর প্রশাসনের বৈশ্বিক শুল্কনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত চলতি বছর ভারতের শেয়ারবাজারের দুর্বলতার অন্যতম কারণ ছিল। নির্বাচনের ফলাফলে যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ফিরে আসার লক্ষণও বাজারকে শক্তিশালী করেছে। বুধবার বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতের শেয়ারবাজারে ৭২৮ কোটি ৪০ লাখ রুপির শেয়ার কিনেছেন। ডলারের হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৭৬ কোটি ৯৬ লাখ। ২০২৫ সালের অক্টোবরের পর এটি ছিল দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অন্যতম বড় এক দিনের শেয়ার কেনাকাটা। নভেম্বর মাসে এখন পর্যন্ত ভারতের বাজারে বিদেশি বিনিয়োগের নিট প্রবাহ দাঁড়িয়েছে ১৫৭ কোটি ডলার।
চোলামণ্ডলম সিকিউরিটিজের ইকুইটি গবেষণা বিভাগের প্রধান ধর্মেশ কান্ত বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারে। এতে ভারতের মতো বাজারগুলো উপকৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তাঁর মতে, গত দুই বছর ধরে বিশ্বের অধিকাংশ বড় শেয়ারবাজারের তুলনায় পিছিয়ে থাকা ভারতীয় বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখাচ্ছে। অপরিশোধিত তেলের দাম কমা এবং বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ—দুটি বিষয়ই এ ক্ষেত্রে সহায়ক হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আরও কমেছে। বৃহস্পতিবার প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট তেলের দাম ১ শতাংশ কমে ৯৩ ডলার ৫০ সেন্টে নেমেছে। এর আগের কার্যদিবসে দাম কমেছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
তেলের দাম কমার প্রভাবে ভারতের বিভিন্ন খাতের শেয়ারে উত্থান দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার দেশটির ১৬টি প্রধান খাতের মধ্যে ১৫টিতেই শেয়ারের দাম বেড়েছে। ছোট মূলধনি কোম্পানির সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং মাঝারি মূলধনি কোম্পানির সূচক ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
আর্থিক খাতের শেয়ারগুলোর সম্মিলিত উত্থান হয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এইচডিএফসি ব্যাংকের শেয়ার বেড়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং আইসিআইসিআই ব্যাংকের ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসা রয়েছে এমন কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও বড় উত্থান হয়েছে। এশিয়ান পেইন্টসের শেয়ার বেড়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা ইন্ডিগোর শেয়ার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম কমলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ভারতের শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, তেলের দরপতন এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় হয়ে ওঠা—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।












