চীনের অন্যতম বৃহৎ মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইয়াংজি মেমোরি টেকনোলজিসের (ওয়াইএমটিসি) শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা স্থগিত হয়েছে। দুর্বল শেয়ারবাজার এবং নতুন শেয়ার বিক্রির অনুমোদনে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।
ওয়াইএমটিসির মূল প্রতিষ্ঠান সিসিএসএইচ করপোরেশন গত আগস্টে সাংহাইয়ের স্টার মার্কেটে তালিকাভুক্তির আবেদন করে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে ৩৩ বিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ৪৯০ কোটি ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। বাস্তবায়িত হলে চলতি বছর এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শেয়ার বিক্রির ঘটনা হতে পারত এটি।
প্রতিষ্ঠানটি অক্টোবরের শেষ ভাগ থেকে নভেম্বরের শুরুতে কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু কর্মীদের কাছে পাঠানো একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকে বিভিন্ন কারণের কথা উল্লেখ করে সেই কার্যক্রম স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির ধারণা, আইপিওর এই বিলম্ব কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ আবার শুরু হতে পারে।
প্রযুক্তি খাতে আইপিও নিয়ন্ত্রণে বেইজিং
ওয়াইএমটিসির আইপিও স্থগিতের ঘটনা চীনের প্রযুক্তি খাতে নতুন শেয়ার বিক্রির অনুমোদন নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট চার ব্যক্তির দাবি, চীনের সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএসআরসি বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আইপিও কার্যক্রম ধীর করার অনানুষ্ঠানিক নির্দেশনা দিয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহে বাজার পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে নতুন তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক নজরদারিও বেড়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজার পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত নতুন আইপিও স্থগিত রাখা এবং বিদ্যমান বড় শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
চীনের প্রধান শেয়ারবাজারের সিএসআই৩০০ সূচক গত অক্টোবরে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটি সূচকটির সবচেয়ে খারাপ মাসিক পারফরম্যান্স। অন্যদিকে সাংহাইয়ের প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টার৫০ সূচক জুলাইয়ের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে গত অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত ৪০ শতাংশ পড়ে গেছে।
চীনের চিপ উৎপাদন সম্প্রসারণে প্রভাব
ওয়াইএমটিসি চীনের সবচেয়ে বড় ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরি চিপ নির্মাতা। স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও তথ্যকেন্দ্রে তথ্য সংরক্ষণের জন্য এ ধরনের চিপ ব্যবহার করা হয়।
গত বছর বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের তীব্র সংকট শুরু হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের মতো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চীনের বাজারে অংশীদারত্বও বাড়িয়েছে তারা।
আইপিও থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা স্থগিত হওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ, নতুন কারখানা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও গবেষণায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। চীনের প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রচেষ্টায় ওয়াইএমটিসি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতেও অর্থায়নে অনিশ্চয়তা
আইপিও নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অবস্থান শুধু চিপ নির্মাতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গত সেপ্টেম্বরে হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারবাজারে আসার উদ্যোগও ধীর করে দিয়েছিল চীনা কর্তৃপক্ষ। এর আগে ইউনিট্রির শেয়ারবাজারে প্রবেশের পর শেয়ারের দাম পাঁচ গুণের বেশি বেড়ে আবার দ্রুত পড়ে যায়।
চীনের ডিপসিক ও মুনশটের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার কিংবা হংকংয়ে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা করছে। সার্চ ইঞ্জিন প্রতিষ্ঠান বাইদুর চিপ বিভাগ কুনলুনশিনও হংকংয়ে আইপিওর জন্য গোপনে আবেদন করেছে।
আইপিও স্থগিত হলে এসব প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের অর্থায়ন যেমন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তেমনি বেসরকারি ইকুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগও সীমিত হবে।
চায়না এভারব্রাইট সিকিউরিটিজ ইন্টারন্যাশনালের কৌশলবিদ কেনি এনজি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি ২০২৭ সালে শেয়ারবাজারে আসতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। বাজারের মনোভাব স্পষ্টভাবে উন্নত না হওয়া পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠানই তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে পারে।
বিশ্বজুড়েও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যকেন্দ্র খাতের বেশ কয়েকটি আইপিও সাম্প্রতিক সময়ে বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে সংশয় তৈরি হয়েছে। ফলে চীনের নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতাও ওয়াইএমটিসির আইপিও বিলম্বের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।
চীনের প্রযুক্তি খাতে আইপিও স্থগিতের সিদ্ধান্ত দেখাচ্ছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলেও দুর্বল শেয়ারবাজার ও নিয়ন্ত্রক কঠোরতার বাইরে থাকতে পারছে না।












