যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় শুধু দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যই বদলে দেয়নি, বিশ্ব অর্থনীতির বাজারগুলোকেও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। নির্বাচনের আগে বিনিয়োগকারীরা ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতির প্রত্যাশা করলেও বাস্তবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দলটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ঘটনা প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে জ্বালানি বাজারে বড় পতন, পরে প্রযুক্তি খাতে ব্যাপক বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজনীতির এই পরিবর্তন থেকে বিনিয়োগকারীরা একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা কমার সম্ভাবনা দেখছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের বিপুল বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন। ফলে নভেম্বর মাসের বাকি সময় বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বজায় থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের ফল যেভাবে বদলে দিল বাজারের হিসাব
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা শুধু প্রচলিত সমর্থনঘাঁটিতেই নয়, টেক্সাস ও কানসাসের মতো রিপাবলিকান-প্রভাবিত এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত ৪০টি এবং সিনেটে অন্তত সাতটি আসন বেড়েছে দলটির। উভয় ক্ষেত্রেই এই সাফল্য নির্বাচনের আগের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে।
এই ফলের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধ বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা যে কোনো ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য কতটা রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, মার্কিন নির্বাচন আবারও তা দেখিয়েছে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিনিয়োগকারীদের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল জ্বালানি বাজারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত কমার প্রত্যাশায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বুধবার প্রায় ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। শুক্রবার নাগাদ ২০২০ সালের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক দরপতনের পথে ছিল এই জ্বালানি তেল।
কিন্তু বৃহস্পতিবার উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে তেলবাহী জাহাজে হামলার খবর আসার পর দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে যায়। এতে স্পষ্ট হয়, যুদ্ধের ঝুঁকি শেষ হয়ে গেছে ধরে নিয়ে বিনিয়োগকারীরা হয়তো কিছুটা তাড়াহুড়ো করেছেন।
ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা কি সহজ হবে?
নির্বাচনে পরাজয়ের পর রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে দায়ী করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানান। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও স্বীকার করেন, নির্বাচনে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বলে ভ্যান্সের মূল্যায়ন সম্ভবত সঠিক।
তবে ট্রাম্প একই সঙ্গে দাবি করেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে যুদ্ধ চালানো প্রয়োজন ছিল। অর্থাৎ নির্বাচনী ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করলেও সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা থেকে তিনি পুরোপুরি সরে আসেননি।
এ ছাড়া ইসরায়েলকে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তা চলতি বছরের শেষে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। আগের পরিকল্পনার তুলনায় এই সময়সীমা এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অবশ্য ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলকে দেওয়া সহায়তা নিয়ে সমালোচনা কমানোর কৌশলও হতে পারে এটি।
প্রশাসন দ্রুত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে নিজেদের সম্পৃক্ততা কমাতে চাইলেও বাস্তবে সেই পথ সহজ নয়। যুদ্ধ থেকে সরে আসার প্রতিটি সম্ভাব্য পদক্ষেপের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি রয়েছে। নির্বাচনের পর সেই ঝুঁকি আরও জটিল হয়েছে। ফলে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এআই বিনিয়োগ নিয়ে আশঙ্কায় প্রযুক্তি বাজারে ধস
জ্বালানি তেলের দাম কমার ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে—এমন প্রত্যাশায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের চাহিদা বেড়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রি করে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকেছেন। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার কমে ৪ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে আসে, যা সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন।
তবে বাজারের বড় ধাক্কাটি এসেছে প্রযুক্তি খাত থেকে। ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রচারে বিভিন্ন এলাকায় তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার দাবি গুরুত্ব পেয়েছিল। নির্বাচনে দলটির সাফল্যের পর বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, নতুন কংগ্রেসে এ ধরনের প্রকল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এই আশঙ্কায় এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারমূল্য থেকে এক দিনে প্রায় তিন লাখ কোটি ডলার মুছে যায়। নাসডাক সূচকের পতন ছিল ২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পর এক দিনে সর্বোচ্চ। সূচকটি সংশোধনের পর্যায়েও প্রবেশ করে।
এশিয়ার বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক চলতি সপ্তাহে ১০ শতাংশের বেশি হারিয়েছে। তাইওয়ানের শেয়ারবাজারে সাপ্তাহিক পতন হয়েছে ১৯৯১ সালের পর সবচেয়ে বেশি।
তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে এআই খাতে বিনিয়োগ এখনই থেমে যাচ্ছে, এমন প্রমাণ নেই। বরং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বিপুল অর্থ সংগ্রহ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে। মার্ভেল টেকনোলজি অপটিক্যাল যন্ত্রাংশ নির্মাতা লুমেনটামকে অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। ঋণসহ এই লেনদেনের মূল্য ১১৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে মেটা তাদের এআই সম্প্রসারণে অর্থায়নের জন্য পাঁচ ধাপের বন্ড বিক্রির মাধ্যমে আরও ১৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা জানিয়েছে।
তারপরও উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরেই এআই খাতের শেয়ার ও বিনিয়োগ নিয়ে বাজারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। বিপুল অর্থ সংগ্রহের বর্তমান প্রবণতা ভবিষ্যতে অর্থায়ন কঠিন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেও তৈরি হতে পারে। যদি তা-ই হয়, তাহলে বিষয়টি শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের।
গত দুই বছরে বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এআই খাতের বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই খাতে বড় ধরনের পতন হলে তার প্রভাব শেয়ারবাজারের সীমা ছাড়িয়ে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতেও পড়তে পারে।
প্রযুক্তির বাইরেও অর্থনীতিতে নতুন চাপ
এ সপ্তাহে অ্যাপল প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আয় করলেও প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম কমেছে। চিপের দাম বেড়ে যাওয়ায় মুনাফার হার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে। অন্যদিকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তিন বছর পর প্রথমবারের মতো সুদের হার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন নীতিনির্ধারকের ধারণা, ভবিষ্যতে আরও সুদ বাড়ানোর বিষয়ে বাজারের প্রত্যাশা অতিরিক্ত হতে পারে।
অর্থনীতির আরেকটি নতুন ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে সাইবার হামলা। গত সপ্তাহে বিন্যান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরির ঘটনা ঘটে। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সতর্কসংকেত পরিচালনাকারী ব্যবস্থায়ও হ্যাকিং হয়েছে। এ সপ্তাহে ইউরোপের বিভিন্ন সুপারমার্কেটের হিমায়িত পণ্য সংরক্ষণের যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এ ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে অর্থনৈতিক অবকাঠামো যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, সাইবার হামলার ঝুঁকিও তত বিস্তৃত হচ্ছে। এসব ঝুঁকির আর্থিক মূল্য কতটা হতে পারে, তা নির্ধারণ করাও এখন কঠিন।
বাজারের নজর এখন অর্থনীতির পরবর্তী দুই বছরে
শুক্রবার প্রকাশিত হওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রের অক্টোবর মাসের কর্মসংস্থান প্রতিবেদন। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ওই মাসে নতুন কর্মসংস্থান বাড়তে পারে ৬৫ হাজার। আগামী সপ্তাহে প্রকাশিত হবে নতুন মূল্যস্ফীতির তথ্য।
তবে বাজারের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু কর্মসংস্থান বা মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান নয়। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল আগামী দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি, মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির ভূমিকা এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ কীভাবে বদলে দেয়, বিনিয়োগকারীদের মূল নজর এখন সেদিকে।
রাজনৈতিক পরিবর্তন কখনো নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করে, আবার কখনো দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচন সেই দুই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। একদিকে যুদ্ধ কমার প্রত্যাশা জ্বালানি বাজারকে স্বস্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে এআই বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রযুক্তি বাজারকে অস্থির করছে। এই দুই বিপরীত প্রবণতার মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতির পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হতে পারে।











