বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে ক্ষমতার প্রকৃত উৎস সব সময় পুঁজির পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা নির্ভর করেছে অর্থ কীভাবে প্রবাহিত হবে, লেনদেন কী নিয়মে পরিচালিত হবে এবং আর্থিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তার ওপর। শিল্পবিপ্লব উৎপাদনের কাঠামো বদলে দিয়েছিল। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব জ্ঞান ও তথ্য আদান-প্রদানের ব্যয় কমিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। এখন আরেকটি পরিবর্তন ঘটছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থের প্রকৃতি, মালিকানা এবং লেনদেনের অবকাঠামো।
সম্পদের টোকেনায়ন, ডিজিটাল আমানত এবং প্রোগ্রামযোগ্য আর্থিক নিষ্পত্তিব্যবস্থা প্রচলিত অর্থব্যবস্থার কাঠামোকে নতুনভাবে সাজানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই পরিবর্তন ইরানের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে নতুন প্রযুক্তির প্রতিটি প্রবণতা অনুসরণ করাই দেশটির কৌশলগত লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং বিদ্যমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আর্থিক সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করা, লেনদেনের দক্ষতা বাড়ানো এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ করাই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার।
আর্থিক ব্যবস্থার এই রূপান্তরের ব্যাপ্তি বোঝার জন্য স্টেবলকয়েনের বাজারের দিকে তাকানো যেতে পারে। আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি ব্যাংকের (বিআইএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে স্টেবলকয়েনের বাজারমূল্য প্রায় ৩২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। ২০২৫ সালে এসব ডিজিটাল মুদ্রার মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে এর মধ্যে প্রকৃত অর্থপ্রদানসংক্রান্ত লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ৩৯০ বিলিয়ন ডলার।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ডিজিটাল মুদ্রার বিপুল লেনদেনমূল্যকে সরাসরি বাস্তব অর্থনীতিতে সম্পন্ন অর্থপ্রদানের পরিমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বরং এর তাৎপর্য হলো, ভবিষ্যতে সম্পদের মালিকানা, অর্থ স্থানান্তর এবং চুক্তিভিত্তিক লেনদেন একই ডিজিটাল অবকাঠামোর মধ্যে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ আর্থিক ব্যবস্থার প্রতিযোগিতা শুধু কত অর্থ একটি দেশের ব্যাংকিং খাতে রয়েছে, তার ওপর নির্ভর করবে না; অর্থ কত দ্রুত, নিরাপদে এবং কম ব্যয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছানো যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অর্থ লেনদেনের অবকাঠামোয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

এই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রজেক্ট আগোরা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ২৮টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রায় ৮ লাখ সুইস ফ্রাঁর লেনদেন পরীক্ষা করে। সেখানে গড়ে প্রায় ৮০ সেকেন্ডে লেনদেন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছিল।
এটি অবশ্য প্রচলিত আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ককে টোকেনভিত্তিক ব্যবস্থা দিয়ে প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ নয়। তবে পরীক্ষাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। ভবিষ্যতের আর্থিক প্রতিযোগিতায় শুধু ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নয়, বরং লেনদেন অবকাঠামোর গতি, নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতাও নির্ধারক হয়ে উঠবে।
তবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা একা যথেষ্ট নয়। এ ধরনের ব্যবস্থায় আস্থা, আইনি নিশ্চয়তা এবং নির্ভরযোগ্য নিষ্পত্তিযোগ্য সম্পদের উপস্থিতি অপরিহার্য। এসব ভিত্তি দুর্বল হলে উন্নত প্রযুক্তিও কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে না।
ইরানের সামনে এ ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব সুবিধা রয়েছে। দেশটি প্রযুক্তিগতভাবে একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে নেই। বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯১ শতাংশের আর্থিক হিসাব ছিল। দেশটির শাপারাক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় ৪৮৭ কোটি লেনদেন প্রক্রিয়া করেছে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বিকাশমান আর্থিক প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে এসব অবকাঠামো ইরানের জন্য নতুন উদ্ভাবনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
কিন্তু ডিজিটাল লেনদেনের ব্যাপকতা আর্থিক ব্যবস্থার গভীরতা কিংবা পুঁজির দক্ষ ব্যবহারের সমার্থক নয়। একটি দেশে বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল লেনদেন হতে পারে, অথচ সেখানকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন। ব্যবসার কার্যকরী মূলধনের ব্যয় বেশি থাকতে পারে, সরবরাহব্যবস্থায় অর্থায়ন দুর্বল হতে পারে এবং জামানত ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা বজায় থাকতে পারে।
ইরানের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ তাই ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করা। অর্থায়নের ব্যয় কমানো, ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ানো, ব্যবসায়িক লেনদেনের সময় কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থার আর্থিক সক্ষমতা উন্নত করাই হওয়া উচিত এই রূপান্তরের প্রধান লক্ষ্য।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আড়ালে কাঠামোগত ঝুঁকি
তবে ইরানের সামনে বাধাও কম নয়। ব্যাংকিং খাতের ভারসাম্যহীনতা, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি নতুন প্রযুক্তি দিয়ে এককভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়।
স্টেবলকয়েনের বাজারেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। ফিয়াট মুদ্রাভিত্তিক স্টেবলকয়েনের বাজারমূল্যের ৯৯ শতাংশের বেশি যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় মুদ্রার বৈচিত্র্য বাড়ানোর পরিবর্তে ডলারের ওপর নির্ভরতা আরও শক্তিশালী করতে পারে। ইরানের মতো দেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রযুক্তিগতভাবে বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা তৈরি করলেও সেটি যদি শেষ পর্যন্ত ডলারের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে আর্থিক সার্বভৌমত্বের লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হবে না।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের অক্টোবরের বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনেও টোকেনভিত্তিক বাজারে তারল্যসংকট, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা এবং অবকাঠামোগত কেন্দ্রীভবনের মতো ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন: প্রযুক্তি অর্থের চলাচল দ্রুত করতে পারে, কিন্তু সেই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হবে, তা নিশ্চিত করতে পারে না। উৎপাদনশীল খাতে পুঁজি প্রবাহিত করার জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, বিশ্বাসযোগ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। এসব অনুপস্থিত থাকলে আর্থিক প্রযুক্তির অগ্রগতি নতুন ঝুঁকির জন্ম দিতে পারে।
ইরানের জন্য চারটি কৌশলগত অগ্রাধিকার
ইরানের আর্থিক রূপান্তরকে কার্যকর করতে চারটি ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রথমত, ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করতে হবে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভারসাম্যহীনতা দূর করা, সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় মুদ্রার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। মুদ্রার স্থিতিশীলতা ছাড়া ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা কঠিন।
দ্বিতীয়ত, আন্তসংযুক্ত লেনদেন ও সরবরাহব্যবস্থার অর্থায়ন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অর্থনীতি ও অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে ব্যবসায়িক লেনদেন দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং উদ্যোক্তারা সহজে অর্থায়ন পাবেন।
তৃতীয়ত, আর্থিক প্রযুক্তির জন্য ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অতিরিক্ত বিধিনিষেধ উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আবার যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারীর স্বার্থ এবং গ্রাহকের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই এমন নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন, যা উদ্ভাবনের সুযোগ দেবে, একই সঙ্গে সম্ভাব্য ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণ করবে।
চতুর্থত, প্রযুক্তিগত সাফল্যের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ফলাফলকে অগ্রগতির মাপকাঠি করতে হবে। লেনদেনের ব্যয় কতটা কমল, অর্থায়ন পেতে কত সময় লাগছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ঋণপ্রাপ্তি কতটা বাড়ল এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কতটা নতুন পুঁজি যুক্ত হলো—এসব সূচক দিয়ে সাফল্য মূল্যায়ন করা উচিত।
আর্থিক সার্বভৌমত্ব মানে বিচ্ছিন্নতা নয়

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ইরানের কৌশল পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। আর্থিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার অর্থ বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও আর্থিক নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নয়। বরং বিভিন্ন লেনদেন চ্যানেলের মধ্যে বৈচিত্র্য তৈরি, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রযুক্তিগত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং একক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোই প্রকৃত স্বাধীনতার ভিত্তি।
আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ইরানের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে পরিকল্পিত আর্থিক সহযোগিতা, পারস্পরিক সংযোগযোগ্য লেনদেনব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত মানের সমন্বয় দেশটির আন্তর্জাতিক আর্থিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা এবং কার্যকর অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর।
বিশ্বের ভবিষ্যৎ আর্থিক ব্যবস্থা এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। এই ব্যবস্থায় কোন দেশ কতটা প্রভাব বিস্তার করবে, সেটিও নির্ধারিত হয়ে যায়নি। ইরানের হাতে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, পরিচালনাগত অভিজ্ঞতা এবং দক্ষ মানবসম্পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রয়েছে। কিন্তু এসব সক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় রূপান্তর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
শিল্পবিপ্লব সম্পদ উৎপাদনের পদ্ধতি বদলেছিল, তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব বদলেছিল জ্ঞান ও তথ্যের প্রবাহ। উদীয়মান আর্থিক বিপ্লব বদলে দিতে পারে অর্থনৈতিক মূল্য কীভাবে সৃষ্টি, স্থানান্তর ও ব্যবহার করা হবে। এই পরিবর্তনের মধ্যে ইরানের লক্ষ্য কেবল নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করা হতে পারে না। বরং ভবিষ্যতের আর্থিক অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
সুযোগটি বাস্তব, কিন্তু তা কাজে লাগানোর নিশ্চয়তা নেই। প্রযুক্তির আধুনিকতা কিংবা ডিজিটাল লেনদেনের বিপুল পরিমাণ দিয়ে এই সাফল্য বিচার করা যাবে না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নতুন আর্থিক ব্যবস্থা উৎপাদনশীল বিনিয়োগ কতটা বাড়াতে পারছে, মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, আর্থিক স্থিতিশীলতা কতটা নিশ্চিত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কতটা শক্তিশালী করছে, তার ওপর।












