বজ্রপাত কীভাবে হয়, এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো: ঝড়ের মেঘের ভেতরে জমা হওয়া বিপুল বিদ্যুৎ হঠাৎ মুক্তি পেলে আকাশে ঝলক দেখা যায়, আর সেটি মাটিতে নামলে তাকে বাজ পড়া বলে। মেঘের ভেতরে পানির কণা আর বরফের টুকরো ঘষা খেয়ে বিপরীত চার্জ তৈরি করে। চার্জের এই পার্থক্য বাতাসের সহ্যসীমা পার করলেই ঘটে বজ্রপাত (lightning)।
বজ্রপাত এক নজরে
- বজ্রপাত হলো বায়ুমণ্ডলে মেঘ, বাতাস বা মাটির মধ্যে তৈরি হওয়া বিশাল বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ।
- ঝড়ের মেঘে পানির কণা ও বরফের টুকরোর সংঘর্ষে বিদ্যুৎ জমে।
- মেঘের ওপরের অংশ ধনাত্মক আর নিচের অংশ ঋণাত্মক চার্জে ভরে ওঠে।
- বজ্রপাতের পথের বাতাস সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়েও বেশি গরম হয়ে যায়।
- এই হঠাৎ গরমে বাতাস ফুলে ওঠে, আর তা থেকেই হয় বজ্রধ্বনি।
- মেঘ থেকে মাটিতে আর মেঘের ভেতরে, দুই ধরনেরই বজ্রপাত হয়।
- বাংলাদেশে ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়।
বজ্রপাত কীভাবে হয় এবং কেন হয়
বজ্রপাত আসলে প্রকৃতির তৈরি এক বিশাল বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ। বাতাস সাধারণত বিদ্যুৎ আটকে রাখে, অর্থাৎ ভালো অন্তরক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু চার্জ খুব বেশি জমে গেলে বাতাসের সেই ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। তখন মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুৎ ছুটে যায়।
বজ্রপাত হয় বজ্রগর্ভ মেঘে, যাকে অনেকে কালো ঝড়ের মেঘ বলেন। এই মেঘ অনেক উঁচু পর্যন্ত ওঠে। ভেতরে থাকে প্রবল ওপরমুখী বাতাস, পানির ফোঁটা আর বরফের কণা।
মেঘের ভেতরে বিদ্যুৎ জমে কীভাবে
ঝড়ের মেঘে ওপরমুখী বাতাস পানির ছোট ফোঁটাগুলোকে ওপরে তুলে নেয়। একই সময়ে ভারী বরফের কণা নিচের দিকে নামতে থাকে। চলার পথে এগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়।
এই ধাক্কায় ওপরে ওঠা পানির ফোঁটা থেকে ইলেকট্রন সরে নিচে নামা বরফের গায়ে গিয়ে জমে। ফলে মেঘের নিচের অংশ ঋণাত্মক আর ওপরের অংশ ধনাত্মক চার্জে ভরে যায়। মাটির দিকেও তখন বিপরীত চার্জ জমতে থাকে। এভাবে মেঘ ও মাটির মধ্যে বিশাল বৈদ্যুতিক চাপ তৈরি হয়।
বজ্রপাতের ধাপগুলো কী কী
চোখের পলকে ঘটলেও বজ্রপাত কীভাবে হয়, তা কয়েকটি ধাপে ভাগ করে বোঝা যায়। মোটামুটি ধাপগুলো এ রকম:
- প্রথম ধাপ: মেঘের নিচ থেকে চার্জের একটি ক্ষীণ পথ ধাপে ধাপে মাটির দিকে নামতে থাকে।
- দ্বিতীয় ধাপ: মাটি ও উঁচু বস্তু থেকে ওপরের দিকে ছোট ছোট বিদ্যুৎধারা উঠে আসে।
- তৃতীয় ধাপ: নিচে নামা পথের সঙ্গে ওপরে ওঠা ধারা মিলে গেলে মেঘ আর মাটির মধ্যে একটি পথ তৈরি হয়।
- চতুর্থ ধাপ: তখন সেই পথ ধরে প্রবল বিদ্যুৎ ছুটে যায়। এই ঝলকটাই আমরা আকাশে দেখি।
মজার ব্যাপার হলো, চোখে যে উজ্জ্বল ঝলক দেখা যায়, তা আসলে মাটি থেকে মেঘের দিকে ছোটে। পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত আধা সেকেন্ডের কম সময়ে শেষ হয়। অনেক সময় একই পথ ধরে পরপর কয়েকবার বিদ্যুৎ ছোটে, তাই ঝলক কাঁপতে থাকে।
বজ্রপাত কত রকমের হয়
বজ্রপাত মূলত দুই ধরনের। এক ধরনে বিদ্যুৎ মেঘের ভেতরে বা এক মেঘ থেকে আরেক মেঘে চলে যায়। এটি মাটিতে নামে না। অন্য ধরনে মেঘ থেকে বিদ্যুৎ সরাসরি মাটিতে নামে। এটিই মানুষ, পশু আর ঘরবাড়ির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।
মাটিতে নামা বজ্রপাতের বেশির ভাগেই মেঘের নিচের ঋণাত্মক চার্জ মাটির দিকে যায়। কিছু ক্ষেত্রে ধনাত্মক চার্জও নামে। বিজ্ঞানীরা একে অপেক্ষাকৃত কম হলেও শক্তিশালী হিসেবে চেনেন।
বজ্রধ্বনি কেন হয়, ঝলকের পরে শব্দ আসে কেন
বজ্রপাতের পথের বাতাস মুহূর্তে সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়েও বেশি গরম হয়ে যায়। এত দ্রুত গরম হওয়ায় বাতাস হঠাৎ ফুলে ওঠে এবং শব্দের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। এতে তৈরি হয় এক ধরনের শব্দ-ধাক্কা। সেটিই আমরা বজ্রধ্বনি হিসেবে শুনি। কাছে হলে শব্দ হয় তীব্র আর কড়া। দূরে হলে তা গুমগুম আওয়াজ হয়ে শোনা যায়।
আলো অনেক দ্রুত চলে, তাই ঝলক আগে চোখে পড়ে। শব্দ ধীরে চলে, তাই গর্জন আসে পরে। শব্দ প্রায় তিন সেকেন্ডে এক কিলোমিটার যায়। ঝলক দেখার পর যত সেকেন্ডে গর্জন শোনা যায়, তাকে তিন দিয়ে ভাগ করলে বজ্রপাত মোটামুটি কত কিলোমিটার দূরে হলো তা আন্দাজ করা যায়। নয় সেকেন্ড পরে শব্দ এলে দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার।
তবে এই হিসাব ঝুঁকি মাপার উপায় নয়। গর্জন শুনতে পেলেই আপনি বজ্রপাতের নাগালের মধ্যে আছেন।
বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষ মারা যান। ২০১৬ সালে সরকারি হিসাবেই মৃতের সংখ্যা ২০০-র বেশি ছিল। সে বছরই সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে।
ক্ষতিগ্রস্তদের বড় অংশ গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক। প্রাক্-বর্ষা মৌসুমে, অর্থাৎ মার্চ থেকে মে মাসে, বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ২০১৬ সালের মে মাসের এক দিনেই ৮২ জনের মৃত্যুর খবর আছে।
এই ঝুঁকি কমাতে সরকার দশ লাখ তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নেয়। এর পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো, উঁচু গাছ রক্ষা, ঘরে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা এবং আগাম সতর্কবার্তা জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে। বজ্রপাতের আরও কারণ ও করণীয় জানতে পড়তে পারেন সারাক্ষণের বাংলাদেশের বজ্রঝড় ও বিদ্যুৎ চমক নিয়ে লেখাটি। তালগাছ নিয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন তালগাছ কাটার খবর ও পরিবেশের মূল্য প্রসঙ্গ।
বজ্রপাতের সময় কীভাবে নিরাপদ থাকবেন
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র একই কথা বলে: বজ্রধ্বনি শুনলেই নিরাপদ আশ্রয়ে যান। খোলা জায়গায় কোথাও নিরাপদ নয়। ঝড়ের এলাকা থেকে বেশ দূরেও বজ্রপাত হতে পারে, তাই আকাশ নীল দেখালেও ঝুঁকি থাকে।
বাইরে থাকলে কী করবেন
- গর্জন শোনামাত্র পাকা দালান বা ঘরে ঢুকে পড়ুন। যে ভবনে বিদ্যুৎ ও পানির লাইন আছে, সেটি নিরাপদ আশ্রয়।
- পাকা ছাদের শক্ত গাড়িও নিরাপদ, তবে সব জানালা বন্ধ রাখতে হবে।
- তাঁবু, খোলা চালা, ছোট কুঁড়েঘর বা মাঠের ছাউনি কোনো সুরক্ষা দেয় না।
- শেষ গর্জনের পর অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন। তার আগে বাইরে বের হবেন না।
ঘরের ভেতরে থাকলে কী করবেন
- কল ছেড়ে হাত ধোয়া, গোসল বা থালাবাসন ধোয়া থেকে বিরত থাকুন।
- তারযুক্ত ফোন, কম্পিউটার, টিভি ও তারে সংযুক্ত যন্ত্র ছোঁবেন না। মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যায়।
- বাইরের দিকের জানালা ও দরজা থেকে দূরে থাকুন।
- বারান্দায় যাবেন না। কংক্রিটের মেঝেতে শোবেন না, দেয়ালেও হেলান দেবেন না।
বজ্রপাত কীভাবে হয় তা জানা থাকলে ঝুঁকি চেনা সহজ হয়, আর সময়মতো আশ্রয় নেওয়ার অভ্যাসই প্রাণ বাঁচায়।
কেউ বজ্রপাতে আহত হলে দেরি না করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন। বজ্রপাত হৃৎপিণ্ডের গতি থামিয়ে দিতে পারে। তাই দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। এটি সাধারণ তথ্য, বিস্তারিত চিকিৎসা পরামর্শের জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
সাধারণ প্রশ্ন
বজ্রপাত আর বিদ্যুৎ চমক কি একই জিনিস?
সাধারণভাবে মেঘের ঝলককে বিদ্যুৎ চমক আর মাটিতে আঘাত করাকে বাজ পড়া বলা হয়। বৈজ্ঞানিকভাবে দুটিই বজ্রপাতের অংশ। আর বজ্রপাতের শব্দকে বলা হয় বজ্রধ্বনি।
বজ্রপাত কি শুধু বর্ষাকালেই হয়?
না। ঝড়ের মেঘ তৈরি হলে যেকোনো সময় বজ্রপাত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রাক্-বর্ষা মৌসুমে, মার্চ থেকে মে মাসে, হতাহত বেশি দেখা যায়।
গাড়ির ভেতরে থাকলে কি বজ্রপাত থেকে বাঁচা যায়?
পাকা ছাদের শক্ত গাড়ির জানালা বন্ধ থাকলে সেটি নিরাপদ আশ্রয়। খোলা গাড়ি, মোটরসাইকেল বা গলফ কার্ট নিরাপদ নয়।
বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যায় কি?
মোবাইল ও বেতার ফোন ব্যবহার করা যায়। তবে তারযুক্ত ফোন এড়িয়ে চলুন, কারণ তার বেয়ে বিদ্যুৎ ঘরে ঢুকতে পারে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৬ নভেম্বর ২০২৬










