ড্যানিয়েল ফিঙ্কেলস্টাইন
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করেছে। যে প্রতিশ্রুতি, ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর ভর করে তিনি আবার হোয়াইট হাউসে ফিরেছিলেন, সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন তাঁরই অনেক সমর্থক। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি সংকট এবং প্রশাসনের অদক্ষতা তাঁদের হতাশ করছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটতে পারে। ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক বিপর্যয় শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনদের জন্য নয়, ব্রিটেনের নাইজেল ফারাজ এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
কারণ, ফারাজ কেবল ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্যকে স্বাগত জানাননি; তিনি প্রকাশ্যেই তাঁর প্রচারণার অংশ হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের পক্ষে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন, সাক্ষাৎকারে তাঁর প্রশংসা করেছেন এবং তাঁকে একজন অসাধারণ নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফারাজের ঘনিষ্ঠজনেরা একসময় দাবি করেছিলেন, রাজনীতিতে ট্রাম্প ও ফারাজের সম্পর্ক যতটা ঘনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব, তাঁদের সম্পর্ক ঠিক ততটাই। ২০১৬ সালে ফারাজ বলেছিলেন, তাঁকে অর্থের প্রলোভন দেখালেও তিনি হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দিতেন না, যদি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতেন।
এ ধরনের অবস্থান নিছক রাজনৈতিক সৌজন্য নয়। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক প্রকল্পের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন। ফলে ট্রাম্পের শাসনব্যবস্থার ফলাফল এখন ফারাজের রাজনৈতিক অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
ব্রিটেনের স্বার্থের সঙ্গে ট্রাম্পের রাজনীতির সংঘাত
ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয় ব্রিটেনের জন্য যে ইতিবাচক হবে না, সেই আশঙ্কা শুরু থেকেই ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু ট্রাম্পের অনিশ্চিত অবস্থান, মিত্রদের প্রতি অবিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে তাঁর অনাগ্রহ সেই সম্পর্ককে দুর্বল করেছে। এমনকি দুই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্কটিও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের যে ভূমিকা এত দিন ছিল, ট্রাম্পের অধীনে তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মুক্তবিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যে ধরনের দায়িত্ববোধ, ধারাবাহিকতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনে তার স্পষ্ট উপস্থিতি নেই।
অথচ ফারাজ যখন ট্রাম্পের বিজয় উদ্যাপন করছিলেন, তখন তিনি শুধু একজন মার্কিন রাজনীতিককে সমর্থন করছিলেন না। তিনি এমন একটি শাসনদর্শনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্রিটেনের স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের একটি অংশও একই ধরনের উপলব্ধিতে পৌঁছাচ্ছেন। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা জরুরি, কারণ ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনকে একসময় বিশ্বরাজনীতির গতিপথ পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
ব্রেক্সিট গণভোটের পর ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনকে বিশ্বায়নবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের আরেকটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হয়েছিল। ধারণা তৈরি হয়েছিল, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রচলিত উদারনৈতিক রাজনীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ নতুন এক রাজনৈতিক যুগের সূচনা করছে। ব্রিটেনে ফারাজের রিফর্ম ইউকে সেই আবহকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করেছে। এমনকি তাদের নির্বাচনী স্লোগানেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভাষা ও প্রচারণার প্রভাব স্পষ্ট ছিল।
কিন্তু ট্রাম্পের উত্থানের পেছনে যে জনসমর্থন ছিল, তার প্রকৃতি বুঝতে হলে তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরেও তাকাতে হবে।
সাফল্যের প্রতিশ্রুতি, ব্যর্থতার বাস্তবতা
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ভিত্তি কখনোই কেবল তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ছিল না। তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ, বিতর্ক, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ কিংবা অন্যদের প্রতি অসৌজন্যমূলক ব্যবহার—কোনোটিই তাঁকে দুইবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পথ থেকে সরাতে পারেনি। অনেক ভোটার এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেননি। কেউ কেউ বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করেছেন, আবার অনেকে তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যক্তিত্বকেই শক্তির প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন।
ট্রাম্পের ব্যবসায়ী পরিচয়ও তাঁর রাজনৈতিক আকর্ষণের বড় অংশ ছিল। ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি এমন একজন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, যিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, অদক্ষদের সরিয়ে দিতে পারেন এবং ফলাফল অর্জনে দ্বিধা করেন না। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন প্রচলিত রাজনীতির বিপরীতে একজন কার্যকর ব্যবস্থাপক। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, ওয়াশিংটনের দীর্ঘসূত্রতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ভেঙে তিনি দ্রুত পরিবর্তন আনবেন।
এই প্রত্যাশার পেছনে বাস্তব রাজনৈতিক অসন্তোষও ছিল। মানুষ এমন একজন নেতাকে চাইছিল, যিনি শুধু কথা বলবেন না, কাজও করবেন। যিনি প্রচলিত ব্যবস্থার ব্যর্থতা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান দেবেন। এই আকাঙ্ক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্রিটেনসহ বহু গণতান্ত্রিক দেশেই এমন ভোটার রয়েছেন, যাঁরা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা হারিয়ে বিকল্প নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকছেন।
ফারাজের রাজনৈতিক শক্তির উৎসও অনেকটা একই জায়গায়। তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করেন, নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন। ট্রাম্পের নির্বাচনী সাফল্য তাঁকে এই বিশ্বাস জুগিয়েছিল যে, একই ধরনের রাজনৈতিক কৌশল ব্রিটেনেও কার্যকর হতে পারে।
কিন্তু সমস্যাটি শুরু হয় যখন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে।
ভোটারদের কাছে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁদের দৈনন্দিন জীবন কতটা ভালো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মনোভাব নিয়ে গবেষণা করা সারাহ লংওয়েলের পর্যবেক্ষণে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তিনি রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে বিভিন্ন আলোচনাচক্র পরিচালনা করে বোঝার চেষ্টা করেছেন, কোন বিষয়গুলো ট্রাম্পের প্রতি তাঁদের সমর্থন কমাতে পারে।
লংওয়েলের পর্যবেক্ষণ ছিল, ভোটারদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিস্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব কিংবা সাংবিধানিক মূল্যবোধের মতো বিষয় সব সময় প্রধান ভূমিকা পালন করে না। বরং তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নিজেদের জীবনযাত্রার বাস্তব অবস্থা।
বিশ্ব পরিস্থিতি কেমন—এমন প্রশ্ন করা হলে অনেক ভোটার আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা না করে নিজেদের আয়, ব্যয় এবং বাজারদরের কথা বলতে শুরু করেন। সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোতে বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য তাঁদের উদ্বেগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সুপারমার্কেটে মাংস কিনতেও আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে—এমন অভিজ্ঞতা তাঁদের রাজনৈতিক মূল্যায়নকে প্রভাবিত করছে।
এখানেই ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার বড় সংঘাত তৈরি হয়েছে। তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সেই পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। বরং যুদ্ধের কারণে ব্যয় বাড়ছে, জ্বালানির বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে খরচের নতুন চাপ যুক্ত হচ্ছে।
এদিকে প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির অভিযোগও মানুষের অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। ফলে ভোটারদের কাছে সমস্যাগুলো আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে থাকছে না। তাঁরা নিজেদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার সঙ্গে প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন।
এটি রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অনেক ভোটার প্রথমে কোনো নেতাকে দুর্নীতিগ্রস্ত বা অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে সিদ্ধান্ত নেন না। বরং তাঁরা প্রথমে নিজেদের জীবনে সমস্যার মুখোমুখি হন। এরপর সেই অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতা, অনিয়ম ও দুর্নীতিকে দায়ী করেন।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক নেতার চরিত্র নিয়ে আগাম উদ্বেগ না থাকলেও তাঁর শাসনের ফলাফল খারাপ হলে সেই চরিত্রের ত্রুটিগুলো মানুষের কাছে ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
জনতুষ্টিবাদের সীমাবদ্ধতা
ট্রাম্পের অভিজ্ঞতা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির একটি মৌলিক দুর্বলতাও সামনে এনেছে। এই রাজনীতি সাধারণত প্রচলিত প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে কাজে লাগায়। রাষ্ট্রকে নতুনভাবে পরিচালনা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, প্রশাসনকে দক্ষ করা এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের মতো প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করে।
কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য যে প্রশাসনিক দক্ষতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করা অনেক বেশি কঠিন।
যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া ডজ প্রকল্পের কথাই ধরা যাক। রিপাবলিকানদের কাছে এটি ছিল প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। পরে রিফর্ম ইউকেও একই ধরনের ধারণাকে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর পরিবর্তে নানা বিতর্ক ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে।
একইভাবে ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি এখন অনেকের কাছে কঠোরতার পাশাপাশি অমানবিক ও অপরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও রাজনৈতিক অবস্থান ভোটারদের অসন্তোষের আরেকটি কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এই অভিজ্ঞতা ব্রিটেনের রাজনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। লেবার পার্টির প্রতি মানুষের সমর্থন নিয়ে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তার বিপরীতে অ্যান্ডি বার্নহামের মতো নেতারা কিছুটা রাজনৈতিক সুবিধা পাচ্ছেন। মূলত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বিকল্প হিসেবে তাঁকে দেখার প্রবণতা থেকেই এই সমর্থন বাড়ছে।
কিন্তু শুধু একজন নেতার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া অন্য একজনের জন্য স্থায়ী রাজনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করে না। সামনে বাজেটে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কঠিন আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়বে, তখন সরকারবিরোধী অসন্তোষ আবারও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক হতাশা দূর করা সম্ভব হবে না।
রাজনীতিতে শেষ কথা বলে ফলাফল
ট্রাম্পের অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি নির্বাচনী বিজয় এনে দিতে পারে, কিন্তু কার্যকর শাসন নিশ্চিত করতে পারে না। প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
আরেকটি বিপজ্জনক দিকও রয়েছে। ভোটাররা অনেক সময় কোনো নেতার অযোগ্যতা বা তাঁর প্রস্তাবিত নীতির সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে আগেভাগে সতর্ক হন না। তাঁরা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখে তাঁকে ক্ষমতায় আনেন। এরপর সেই নেতা ও তাঁর নীতির ব্যর্থতা যখন বাস্তব জীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন তাঁদের সমর্থন কমে যায়।
সমস্যা হলো, তত দিনে ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হতে পারে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সাধারণ মানুষকে দিতে হতে পারে।
ব্রিটেনও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। ফারাজের জনপ্রিয়তা কিংবা রিফর্ম ইউকের নির্বাচনী সম্ভাবনা বিচার করার সময় ট্রাম্পের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করা উচিত হবে না। যে রাজনৈতিক মডেলকে একসময় বিশ্বজুড়ে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল, তার বাস্তব প্রয়োগ এখন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রশ্নের মুখে।
ফারাজ ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্যে কতটা উচ্ছ্বসিত ছিলেন, সেটিও ব্রিটিশ ভোটারদের মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, কোনো রাজনৈতিক নেতার বিচার শুধু তাঁর প্রতিশ্রুতি দিয়ে হয় না; তিনি কাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করছেন এবং ক্ষমতায় গেলে কী ধরনের ফলাফল তৈরি করতে পারেন, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া তাই কেবল একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক সংকট নয়। এটি এমন এক রাজনৈতিক ধারার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করছে, যার ওপর ভর করে ব্রিটেনেও ক্ষমতার বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে রিফর্ম ইউকে। ভোটাররা যদি এই অভিজ্ঞতা থেকে সামান্যও শিক্ষা নেন, তাহলে ভবিষ্যতে একই ধরনের রাজনৈতিক ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ড্যানিয়েল ফিঙ্কেলস্টাইনের আরও লেখা
ফ্রান্সের দাঙ্গা: রাজনীতির আড়ালে লুটপাট ও অপরাধের বাস্তবতা
অস্ত্রের স্বাধীনতা নাকি নিরাপত্তার ভ্রান্তি: রাজনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে যে ধারণা











