ইসরায়েলে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের মতো স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শনিবার প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ আইজেনকোটকে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও একক বৃহত্তম রাজনৈতিক জোট হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
তবে সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ পেয়েছেন আইজেনকোট। নির্বাচনের পর পার্লামেন্টে বিভিন্ন দলের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনিই সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছেন।
সরকার গঠনে কঠিন সমীকরণ
আইজেনকোটের হাতে সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় রয়েছে। প্রয়োজন হলে এই সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো যাবে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাঁকে বেশ কয়েকটি কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণ মোকাবিলা করতে হবে।
তাঁর সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। প্রথমত, গুরুত্বপূর্ণ আইন ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন। দ্বিতীয়ত, আগে যেসব কট্টরপন্থী ধর্মীয় দলের সঙ্গে তাঁর জোট করার বিরোধিতা ছিল, তাদের সঙ্গে সমঝোতা। তৃতীয়ত, নেতানিয়াহুর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, তিনটি পথের কোনোটিই সহজে বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আইজেনকোট ব্যাখ্যা করেছেন, তিনি আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোটে যেতে চান না। অথচ এসব দলের সমর্থন পেলে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পার্লামেন্টে আসনের হিসাব
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে একক দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি ২৭টি আসন পেয়েছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী জোটের মোট আসন ৫৩টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।
অন্যদিকে আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২১টি আসন। মধ্য-বাম থেকে ডানপন্থী অবস্থানের চারটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন দল নিয়ে তাঁর জোটের মোট আসন ৪৮টি। ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দল পেয়েছে মোট ১৯টি আসন, যা দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে তাদের অন্যতম বড় সাফল্য।
আইজেনকোট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে অন্য একজন প্রার্থীকে সুযোগ দেওয়া হতে পারে। সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্ট নতুন প্রার্থী মনোনীত করতে পারবে। পুরো প্রক্রিয়ার জন্য প্রায় ১০০ দিনের সময়সীমা রয়েছে। এর মধ্যে কেউ সরকার গঠন করতে না পারলে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রথম মিজরাহি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা
৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তিনি ইসরায়েলের মিজরাহি সম্প্রদায়ের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। এই সম্প্রদায়ের ইহুদিদের পূর্বপুরুষদের শিকড় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায়।
সাবেক এই সেনাপ্রধান ২০২২ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় স্বল্প সময় দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বিরোধী শিবিরে ফিরে যান।
বিরোধী দলে যাওয়ার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমালোচনা করেন তিনি। নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোনো সরকারে যোগ দেবেন না বলেও স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন।
আইজেনকোটের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয়টিও জড়িয়ে রয়েছে। ২০২৩ সালের পর গাজায় যুদ্ধে অংশ নিয়ে তাঁর এক ছেলে ও দুই ভাতিজা নিহত হয়েছেন।
নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিননীতি নিয়ে অবস্থান
নির্বাচনী প্রচারে নিজের সামরিক অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন আইজেনকোট। বিশেষ করে ২০০৬ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত তাঁর কথিত ‘দাহিয়েহ নীতি’ তুলে ধরেছেন। এই নীতির মূল ধারণা হলো, কোনো হামলার জবাবে প্রতিপক্ষের ওপর ব্যাপক ও অসম মাত্রার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা।
তবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সমালোচনাও করেছেন তিনি। ২০২৩ সালের পর থেকে এ ধরনের সহিংসতা বেড়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও উত্তেজনা তৈরি করেছে।
নেতানিয়াহুর জোটের কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের বিরোধিতা করেন আইজেনকোট। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে পশ্চিমা কয়েকটি দেশ তাঁদের ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেও আইজেনকোটের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের দলগুলোকে এক জায়গায় আনা। তাঁর এই প্রচেষ্টা সফল হবে, নাকি ইসরায়েলকে আবারও নির্বাচনের পথে যেতে হবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।












