ব্রিটিশ কৌতুকশিল্পী রাসেল ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রকাশ করা সাংবাদিকদের অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর আইনজীবী ইয়ান উইন্টার। অভিযোগ ছিল, ২০২৩ সালে দ্য সানডে টাইমস ও চ্যানেল ফোরের অনুসন্ধানী অনুষ্ঠানে কয়েকজন নারীর পরিচয় গোপন রেখে দেওয়া বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে সাংবাদিকেরা আইন ভেঙেছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করেছেন। তবে আদালত তাঁর এই যুক্তি গ্রহণ করেননি।
ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উইন্টার। বিচার শুরুর কয়েক দিন আগে তিনি আদালতে মামলাটি বাতিলের আবেদন করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের কারণে সম্ভাব্য বিচারকেরা প্রভাবিত হতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, নারীদের অভিযোগ পুলিশকে না জানিয়ে প্রকাশ করায় সাংবাদিকেরা বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছেন এবং আদালত অবমাননার অপরাধ করেছেন।
আবেদনটি প্রথমে রুদ্ধদ্বার শুনানিতে বিবেচনা করা হয়। পরে তা প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয়।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
আদালতে লিখিত বক্তব্যে উইন্টার দাবি করেন, দ্য সানডে টাইমস, চ্যানেল ফোর এবং তথ্যচিত্রটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হার্ডক্যাশ প্রোডাকশনসের প্রকাশিত প্রতিবেদন বেআইনি ও অপরাধমূলক। তাঁর মতে, এসব প্রকাশনা আদালত অবমাননা এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টির শামিল।
তবে বিচারক বেনাথান তাঁর যুক্তি নাকচ করেন। আদালতের বিবেচনায়, ২০২৩ সালে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে পুলিশের কোনো তদন্ত চলছিল না, তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। ফলে তখন সক্রিয় বিচারপ্রক্রিয়া না থাকায় আদালত অবমাননার অভিযোগ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়নি।
উইন্টার আরও প্রশ্ন তোলেন, তথ্যচিত্রে অভিযোগ করা নারীদের আদৌ অস্তিত্ব ছিল কি না। তাঁর দাবি ছিল, অভিযোগগুলো পেশাদার অভিনেত্রীদের মাধ্যমে আবেগপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে বিচারক বলেন, ব্র্যান্ডের ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। তাই মামলাটি বাতিল করার প্রয়োজন দেখছেন না তিনি।
অভিযোগকারীর পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন
২০২৩ সালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ‘নাদিয়া’ ছদ্মনামে পরিচিত এক নারী দাবি করেছিলেন, ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে ব্র্যান্ড তাঁকে ধর্ষণ করেছিলেন। তবে ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে ঘটেছে বলে ব্র্যান্ডের বিচার চলাকালে ওই অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

নাদিয়া জানান, নিজের পরিচয় প্রকাশ্যে আসার আশঙ্কায় তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেননি। তাঁর ভাষ্য, অভিযোগের প্রমাণ যাচাই করতে ব্র্যান্ডের আইনজীবীদের সামনে তিনি প্রস্তুত। কিন্তু একজন নারীর নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে বাধ্য হওয়াটাই তাঁর কাছে অযৌক্তিক।
তিনি বলেন, অন্য নারীদের সহায়তা করতে এবং নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে নীরব থাকার অনুশোচনা কাটাতে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
সাংবাদিকতার পক্ষে রাজনীতিক ও আইনজীবীরা
ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে মূল অনুসন্ধানকে সমর্থন করেছেন যুক্তরাজ্যের বিচারমন্ত্রী অ্যালেক্স নরিসসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক ও আইনজীবী। নরিসের মতে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গুরুতর অন্যায় সামনে এনেছে এবং অন্য নারীদেরও কথা বলার সাহস জুগিয়েছে।
বিরোধী কনজারভেটিভ দলের সংসদ সদস্য ও ছায়া বিচারমন্ত্রী নিক টিমোথি জানিয়েছেন, মামলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে কিছু গুরুতর প্রশ্ন তিনি আগামী সপ্তাহে সংসদে তুলবেন। তবে তাঁর মতে, এ ঘটনা মুক্ত সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব কমায় না; বরং সত্য প্রকাশে সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
যুক্তরাজ্যের সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ডমিনিক গ্রিভও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উইন্টারের অভিযোগকে অসংগত বলে মন্তব্য করেছেন। চ্যানেল ফোরের সংবাদ বিভাগের পরিচালক লুইসা কম্পটন বলেন, জনস্বার্থে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ করা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ কাজকে বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।
দোষী সাব্যস্ত ব্র্যান্ড, সাজা ঘোষণা আজ

গত সপ্তাহে সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে বিচারের পর ব্র্যান্ডকে একটি ধর্ষণ এবং তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আরও দুটি ধর্ষণের অভিযোগ এবং শালীনতাবিরোধী আচরণের চেষ্টার একটি অভিযোগ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাঁর সাজা ঘোষণার কথা আজ।
যুক্তরাজ্যে ফৌজদারি তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। আদালত অবমাননার আইন ভঙ্গ করলে সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিক কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড এবং সীমাহীন অর্থদণ্ড হতে পারে। যৌন অপরাধের অভিযোগকারী ব্যক্তির পরিচয় আজীবন গোপন রাখার অধিকারও রয়েছে।
রায়ের পর দ্য সানডে টাইমসের এক সাংবাদিকের সঙ্গে উইন্টারের তর্ক হয়। তিনি অভিযোগ করেন, ওই সাংবাদিক ব্র্যান্ডের ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন করেছেন। পরে উইন্টার জানান, তিনি নিজেই নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশাগত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বার স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ডের কাছে পাঠিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি।













