যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পরিচয় নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে তিনি ক্রমেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে নিজের নীতিগত অগ্রাধিকারকে সামনে আনছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। নির্বাচনে দলটির পরাজয়ের পেছনে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া, ইরান যুদ্ধ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভ্যান্স তাঁর সাম্প্রতিক নির্বাচনী বক্তব্যে ট্রাম্পের অর্জনের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনী সমাবেশের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, সংযত পররাষ্ট্রনীতি এবং জননিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে সামনে এনেছেন তিনি। এসব ইস্যুতে নিজের অবস্থানকে রিপাবলিকান রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন ৪২ বছর বয়সী এই ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমায় কৌশল বদল

নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে ভ্যান্সের বক্তব্যে ট্রাম্পের নাম ও তাঁর বিতর্কিত নীতিগুলোর উপস্থিতি কমে আসে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং অভিবাসীদের বহিষ্কারের মতো বিষয় এড়িয়ে নিজের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
ভ্যান্স ও তাঁর উপদেষ্টারা মনে করছেন, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, পররাষ্ট্রনীতিতে সংযম এবং জননিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর বক্তব্য ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যেই এসব বিষয়ে ভ্যান্স নিজেকে একজন প্রধান মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তবে ২০২৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি তিনি। ট্রাম্পও তাঁকে নিজের উত্তরসূরি হিসেবে সমর্থন জানাননি। তারপরও রিপাবলিকান শিবিরে সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে ভ্যান্সকে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিদের একজন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ট্রাম্পের বিশাল ভোটার জোট ধরে রাখার পাশাপাশি বর্তমান প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক বিতর্ক ও নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে নিজেকে আলাদা করা।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থান
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে ভ্যান্স আরও স্পষ্টভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেন এবং দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে পর্যালোচনা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেন তিনি।
এটি ছিল যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে তাঁর সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ্য অবস্থান। এর আগে ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে ভ্যান্সের মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনা থাকলেও এবার তিনি সরাসরি যুদ্ধের বিরোধিতা করেন।
তবে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভ্যান্সের এই বক্তব্যকে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তাঁর বক্তব্য প্রকাশের বিষয়ে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস আগেই অবগত ছিলেন বলেও জানা গেছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ক্ষতি হয়েছে বলে স্বীকার করলেও যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে ভুল বলতে রাজি হননি। বুধবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অন্য কিছু করতেন না।
নির্বাচনের পর ট্রাম্পের বড় ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রসহ কয়েকজন রক্ষণশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভ্যান্সের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এতে রিপাবলিকানদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
২০২৮ সালের নেতৃত্বের লড়াইয়ে নতুন অবস্থান
ভ্যান্সের বক্তব্য শুধু নির্বাচনী পরাজয়ের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর মাধ্যমে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের কোন নীতিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, সেই বিতর্কও সামনে এসেছে।
রিপাবলিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাওয়া রাজনৈতিক প্রভাব ও বক্তব্যের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভ্যান্স ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করতে চাইছেন।
তবে তাঁর এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে যেসব অঙ্গরাজ্যে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন, সেখানেও দলটি পরাজিত হয়েছে।
ওহাইওর গভর্নর পদপ্রার্থী বিবেক রামাস্বামীর একটি বিজ্ঞাপন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওই বিজ্ঞাপনে নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাক্টনের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা হয়েছিল। এমন কৌশল কিছু এলাকায় রিপাবলিকানদের ভোট কমিয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রিপাবলিকান শিবিরেও পরাজয়ের কারণ নিয়ে মতভেদ
মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিপর্যয়ের পর রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যে পরাজয়ের কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।
টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়ে দল যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে পারেনি। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস মনে করেন, পরাজিত প্রার্থীরা অভিবাসন ও লিঙ্গপরিচয়সংক্রান্ত বিতর্কে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। অথচ তথ্য সংরক্ষণকেন্দ্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এখনো নির্বাচনী পরাজয় নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান জানাননি।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে ভ্যান্স ভোটারদের কাছে রিপাবলিকানদের পক্ষে ভোট চাওয়ার সময় স্বাস্থ্যসেবা ও দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচিতে জালিয়াতির তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এসব বিষয়কে তিনি অভিবাসননীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত করেন। তবে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির দাম নিয়ে প্রায় নীরব ছিলেন তিনি। ট্রাম্পের নামও খুব কম উচ্চারণ করেছেন।
উত্তর ক্যারোলাইনার একটি নির্বাচনী সমাবেশে ভ্যান্স বলেছিলেন, তিনি চান তাঁর সন্তানরা এমন একটি দেশে পরিবার গড়ে তুলুক, যে দেশ সমৃদ্ধ, স্বাধীন ও সম্ভাবনাময়। সাধারণ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিশ্চিত করাই তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য।
ট্রাম্পের ছায়া থেকে বের হওয়া কতটা সম্ভব
২০২৮ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা যে কোনো রিপাবলিকান প্রার্থীকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে ট্রাম্প যদি দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে বড় ভূমিকা রাখেন, তাহলে ভ্যান্সের জন্য সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হতে পারে।
কারণ রিপাবলিকানদের প্রাথমিক মনোনয়ন লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর আস্থা প্রয়োজন। আবার জাতীয় নির্বাচনে জয় পেতে হলে মধ্যপন্থী ও ট্রাম্পবিরোধী ভোটারদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হতে হবে।
এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই ভ্যান্সের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তাঁর নতুন বক্তব্য সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির প্রাথমিক ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা, রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং ইরান যুদ্ধের পরিণতি শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।












