বাজারে মাছ, ডিম, দুধ, মুরগি ও মাংসের দাম বাড়ায় এসব খাবার কেনা কমিয়ে দিচ্ছেন অনেক তৈরি পোশাকশ্রমিক। সংসারের খরচ সামলাতে তাঁদের খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়ছে পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এর প্রভাব শুধু ক্ষুধা মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘদিন এমন খাদ্যাভ্যাস চলতে থাকলে শরীরের কর্মক্ষমতা, রক্তের স্বাস্থ্য ও হাড়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণায় দেশের পোশাকশ্রমিকদের খাদ্যাভ্যাসে ক্যালসিয়ামসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ঝুঁকি উঠে এসেছে।
তবে কোনো শ্রমিক মাছ, ডিম, দুধ বা মাংস খাওয়া কমিয়েছেন বলেই তাঁর নির্দিষ্ট রোগ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ঝুঁকি নির্ভর করে এসব খাবারের পরিবর্তে তিনি কী খাচ্ছেন, প্রতিদিন কতটা খাবার পাচ্ছেন এবং শরীরে কোন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি রয়েছে তার ওপর।
শ্রমিকদের খাদ্যতালিকায় পুষ্টির ঘাটতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ঢাকা ও ময়মনসিংহের দুটি পোশাক কারখানার ৮০১ জন শ্রমিকের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির অবস্থা পর্যালোচনা করেন। এতে অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে বিভিন্ন অণুপুষ্টি উপাদান অপর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণের ঝুঁকি পাওয়া যায়।
গবেষণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে ক্যালসিয়াম গ্রহণের স্বল্পতা। অধিকাংশ শ্রমিকের ক্যালসিয়াম গ্রহণের পরিমাণ ছিল প্রয়োজনীয় গড় মাত্রার অর্ধেকেরও কম। আয়রন, জিঙ্ক, রিবোফ্লাভিন ও ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণের পরিমাণও প্রয়োজনীয় মাত্রার সমান বা তার নিচে ছিল। গবেষকেরা একই সঙ্গে অপুষ্টি ও অতিরিক্ত ওজন—দুই অবস্থারই উপস্থিতি লক্ষ করেন।
তবে গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে। ফলে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের খাদ্যাভ্যাসে কী পরিবর্তন এসেছে, তা এই গবেষণা দিয়ে সরাসরি জানা সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব বুঝতে নতুন জরিপ প্রয়োজন।
রক্তস্বল্পতা ও ক্লান্তির ঝুঁকি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আয়রনের ঘাটতি পুষ্টির অভাবজনিত রক্তস্বল্পতার অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া ভিটামিন বি১২, ফলেট, ভিটামিন ‘এ’ ও রিবোফ্লাভিনের ঘাটতিও রক্তস্বল্পতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
রক্তস্বল্পতা হলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছানো ব্যাহত হয়। এর ফলে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং শারীরিক পরিশ্রমের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। কারখানায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করা কিংবা শারীরিক পরিশ্রম করতে হয় এমন শ্রমিকদের জন্য এসব সমস্যা দৈনন্দিন কাজকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
তবে এসব উপসর্গ দেখা দিলে শুধু খাদ্যঘাটতিকেই কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রকৃত কারণ জানতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি।
দুধ কমলে হাড়ের স্বাস্থ্যে প্রভাব
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার ক্যালসিয়ামের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দীর্ঘদিন প্রয়োজনের তুলনায় কম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করলে হাড়ের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে দুধ না খেলেই ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হবে, এমন নয়। খাদ্যতালিকায় অন্য ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার থাকলে সেখান থেকেও শরীরের প্রয়োজনের একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব।
একইভাবে মাছ, ডিম, মুরগি ও মাংস থেকে প্রোটিনসহ বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। এসব খাবার কমে গেলে ডাল, ছোলা, শিমজাতীয় খাবার, শাকসবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর বিকল্পের মাধ্যমে খাদ্যতালিকায় ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু শুধু ভাত ও সীমিত কয়েক ধরনের খাবারের ওপর নির্ভর করলে শরীরের সব পুষ্টি উপাদানের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হতে পারে।
শুধু পেট ভরলেই পুষ্টি নিশ্চিত হয় না
বাংলাদেশের খাদ্যভিত্তিক পুষ্টিনির্দেশনায় শস্যের পাশাপাশি শাকসবজি, ফল, মাছ, মাংস, ডিম, ডাল ও দুধজাত খাবার পরিমিত পরিমাণে এবং বৈচিত্র্য বজায় রেখে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সুষম খাদ্যের মূলনীতি হিসেবে পর্যাপ্ততা, ভারসাম্য ও বৈচিত্র্যের ওপর গুরুত্ব দেয়।
শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি শুধু তাঁরা মাছ বা মাংস কিনতে পারছেন কি না, তা নয়। তাঁদের প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত শক্তি, প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এ জন্য বর্তমান বাজারদরে শ্রমিক পরিবারগুলো কী ধরনের খাবার কিনছে, সপ্তাহে কত দিন মাছ, ডিম ও দুধ খাচ্ছে, কোন খাবার বাদ দিচ্ছে এবং নারী শ্রমিকদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা বা অন্যান্য পুষ্টিঘাটতি কতটা রয়েছে, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ প্রয়োজন।
শ্রমিকদের রক্ত পরীক্ষা, খাদ্যতালিকা জরিপ এবং আয়-ব্যয়ের তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পুষ্টিগত ঝুঁকির সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হবে।
মাছ, ডিম, দুধসহ পুষ্টিকর খাবারের দাম বাড়ায় শ্রমিকদের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য কমে গেলে রক্তস্বল্পতা, ক্লান্তি ও অন্যান্য পুষ্টিগত সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে নতুন জরিপ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রয়োজন।












