২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার সেই ভয়াবহ দিন পেরিয়ে গেছে প্রায় ২৫ বছর। কিন্তু সময় যতই এগিয়েছে, সেই দিনের ক্ষত ততটা মুছে যায়নি। বরং যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, যারা সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এবং যারা খুব ছোট থাকায় পুরো ঘটনা বুঝতে পারেননি—সবার জীবনেই ৯/১১ রেখে গেছে ভিন্ন ধরনের ছাপ।
নিউইয়র্কের ফায়ার সার্ভিসের এক দমকলকর্মীর সন্তান কলিন ম্যাকশেনের বয়স তখন মাত্র সাড়ে চার বছর। সেদিন তার বাবা মারা যান। এত ছোট বয়সে ঘটে যাওয়া সেই দিনের খুব বেশি স্মৃতি তার নেই। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে হারানোর শূন্যতাকে তিনি নতুন করে উপলব্ধি করতে শুরু করেন।
কলিনের মনে আছে, সেদিন তার মা তাকে এবং তার যমজ ভাইকে প্রিস্কুল থেকে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর তারা বাড়িতে টেলিভিশনে ঘটনাগুলো দেখেন। পরে মায়ের এক বান্ধবীর বাড়িতেও যান। ওই বান্ধবীর স্বামীও ছিলেন একজন দমকলকর্মী।
তখন তারা এতটাই ছোট ছিল যে আসলে কী ঘটছে, তা বোঝার মতো বয়স হয়নি। টেলিভিশনের পর্দায় ভয়াবহ দৃশ্য দেখলেও তার গভীরতা তাদের কাছে স্পষ্ট ছিল না।
কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কলিন বুঝতে শুরু করেন, তিনি শুধু বাবাকে হারাননি—হারিয়েছেন বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগও।
তার ভাষায়, প্রিয় কাউকে হারিয়ে তাকে মনে করার যে কষ্ট, তার অভিজ্ঞতাটা ঠিক তেমন নয়। বরং তার কষ্টটা অনেকটা এমন—তিনি বাবাকে খুব কাছ থেকে জানার সুযোগই পাননি। ফলে বাবাকে হারানোর শোকের সঙ্গে মিশে আছে বাবার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠতে না পারার এক গভীর আক্ষেপ।
কলিনের বাবা ১২ বছর পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছিলেন। মৃত্যুর আগে মাত্র ১৮ মাস দমকল বিভাগে ছিলেন। কিন্তু নিউইয়র্কের ফায়ার ডিপার্টমেন্টে যোগ দেওয়া ছিল তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা।
বাবার সেই পেশাগত স্বপ্নই যেন ছেলের জীবনেও ছাপ ফেলেছিল। কলিন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনিও দমকলকর্মী হতে চেয়েছিলেন।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি দমকল বিভাগে নিয়োগের পরীক্ষা দেন। যদিও তখনও তার বয়স নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ২১ বছরে পৌঁছায়নি। এরপর তিনি কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু নিজের স্বপ্ন থেকে সরে যেতে পারেননি। তার মনে হয়েছিল, কলেজে থাকা যেন মূলত অপেক্ষা করার সময় পার করা।
দুই বছর পর তিনি কলেজ ছেড়ে দেন। ততদিনে দমকল বিভাগে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে যাচ্ছিল। মা তাকে অন্য পেশার কথাও ভাবতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন, ছেলের লক্ষ্য অনেক আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে।
দমকল প্রশিক্ষণ একাডেমির নিয়ম, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিবেশও কলিনের কাছে ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সেখানে নিজের জায়গা অর্জন করতে চেয়েছিলেন। বাবার পরিচয়ের কারণে যেন কোনো ধরনের বিশেষ সুবিধা না পান—এ বিষয়েও তিনি সচেতন ছিলেন।
তার কাছে দমকলকর্মী হওয়া শুধু একটি চাকরি ছিল না। এটি ছিল বাবার রেখে যাওয়া এক ধরনের উত্তরাধিকার।
প্রশিক্ষণ একাডেমির একটি সাধারণ মুহূর্তও তাই কলিনের কাছে হয়ে উঠেছিল অসাধারণ স্মৃতি। দমকল বিভাগের অনেক নিয়ম ও রীতিনীতি বছরের পর বছর খুব একটা বদলায় না। প্রশিক্ষণের সময় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তার মনে হয়েছিল, হয়তো তার বাবাও কোনো একদিন ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন।
হয়তো তিনিও কোনো প্রশিক্ষকের ধমক খাওয়ার আশঙ্কায় নিজের পোশাকের একটি বোতাম ঠিক আছে কি না, তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন।
বাবার সঙ্গে কলিনের ভাগ করে নেওয়া স্মৃতি খুব বেশি নেই। কিন্তু প্রশিক্ষণ একাডেমির সেই অভিজ্ঞতা তাকে বাবার সঙ্গে এক অদ্ভুত, পরোক্ষ সংযোগের অনুভূতি দেয়।
৯/১১-এর গল্প তাই শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার ইতিহাস নয়। এটি হাজারো পরিবারের ব্যক্তিগত ইতিহাসও। কারও কাছে এটি প্রিয়জন হারানোর স্মৃতি, কারও কাছে শৈশব হারানোর গল্প, আবার কারও কাছে এমন একজন মানুষকে জানার আকাঙ্ক্ষা—যাকে তারা খুব অল্প সময় পেয়েছিল।
একটি ভয়াবহ দিনের প্রভাব শুধু সেই দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রজন্ম বদলায়, শিশুরা বড় হয়, নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর অনুপস্থিতি থেকে যায় পরিবারগুলোর জীবনে।
কলিন ম্যাকশেনের গল্প সেই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবেরই একটি উদাহরণ। ৯/১১-এর দিন তিনি এত ছোট ছিলেন যে ঘটনার ভয়াবহতা বোঝার ক্ষমতা তার ছিল না। কিন্তু এক শতকের এক-চতুর্থাংশ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পথে তিনি ধীরে ধীরে বুঝেছেন—সেদিন তিনি শুধু একজন বাবাকে হারাননি, হারিয়েছেন এমন এক সম্পর্কের সম্ভাবনাও, যা হয়তো তার পুরো জীবনকে অন্যভাবে সমৃদ্ধ করতে পারত।
৯/১১-এর ২৫ বছর পরও তাই সেই দিনের গল্পগুলো শেষ হয়ে যায়নি। প্রত্যক্ষ স্মৃতি ম্লান হতে পারে, কিন্তু তার উত্তরাধিকার বয়ে বেড়াচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মও।












