যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি বাড়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন ভারতের তরুণদের একটি বড় অংশ। উচ্চশিক্ষা ও তুলনামূলক ভালো চাকরির সুযোগের আশায় ইউরোপে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
এরই একটি উদাহরণ ২৬ বছর বয়সী সিদ্ধালিঙ্গ পুজারি। ভারতের বেঙ্গালুরুর একটি ব্যস্ত শ্রেণিকক্ষে তিনি নিয়মিত জার্মান ভাষা শিখছেন। ভাষা শেখার উদ্দেশ্য সাহিত্য বা সংস্কৃতি চর্চা নয়; তার লক্ষ্য জার্মানিতে গিয়ে নার্স হিসেবে কাজ করা।

বেঙ্গালুরু থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরের নিজের গ্রামের একটি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কাজ করতেন পুজারি। পরে জার্মানিতে থাকা তার কলেজের কয়েকজন পরিচিতের কাছ থেকে সেখানে নার্সদের ভালো বেতন ও চাকরির সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর তিনি পুরোনো চাকরি ছেড়ে জার্মানিতে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন।
পুজারি জানান, জার্মানিতে একজন নার্সের মাসিক আয় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ডলার হতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত ছুটি ও নির্ধারিত বিশ্রামের সুযোগও তাকে আকৃষ্ট করেছে। এর বিপরীতে ভারতে তার আগের চাকরিতে মাসে প্রায় ১২৫ ডলার আয় করতেন এবং অনেক সময় নার্সদের টানা কয়েক সপ্তাহ বিরতি ছাড়াই কাজ করতে হতো।
জার্মান ভাষা শেখার পথটিও তার জন্য সহজ নয়। ইংরেজি অল্পবিস্তর জানলেও তার মাতৃভাষা কন্নড়। নিজের ভবিষ্যৎ বদলানোর আশায় তিনি জীবনযাত্রার খরচ চালাতে ঋণও করেছেন।
পুজারি বলেন, এই যাত্রা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে এবং কখনো কখনো হাল ছেড়ে দেওয়ার কথাও মনে হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা তাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিচ্ছে।
শুধু পুজারি নন, ভারতের আরও অনেক তরুণ এখন ইউরোপকে সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়ায় আগের তুলনায় বিকল্প গন্তব্যের গুরুত্ব বাড়ছে।
ভারত সরকারের হিসাবেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতীয়দের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দুই বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতীয় প্রবাসীর সংখ্যা ২৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৭ লাখে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ এবং কানাডায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে যুক্তরাজ্যে ভারতীয় প্রবাসীর সংখ্যা ৩১ শতাংশ কমেছে বলে সরকারি হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ইউরোপের ভবিষ্যৎও পুরোপুরি অনিশ্চয়তামুক্ত নয়। জার্মানিসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ফলে অভিবাসন নীতি ভবিষ্যতে আরও কঠোর হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তারপরও ভালো বেতন, উন্নত কর্মপরিবেশ, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনা ইউরোপকে ভারতের তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল ও দক্ষ পেশার কর্মীদের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চাহিদা তাদের আগ্রহ আরও বাড়াচ্ছে।
ফলে অভিবাসনের বৈশ্বিক মানচিত্রে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। একসময় ভারতীয় তরুণদের প্রধান পছন্দের তালিকায় থাকা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠছে।












