এ বছর চিকিৎসায় নোবেল পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডাইসারথ এবং জার্মানির পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল। সোমবার সুইডেনের স্টকহোমে ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি এই ঘোষণা দেয়। আলোতে সাড়া দেওয়া আয়ন চ্যানেল আবিষ্কার এবং অপটোজেনেটিকস পদ্ধতি তৈরিতে অবদানের জন্য তাঁরা এই সম্মান পেলেন। পুরস্কারের ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা তিনজনের মধ্যে ভাগ হবে। মার্কিন মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১২ লাখ ডলার। নোবেল কমিটি বলেছে, এই পদ্ধতি মস্তিষ্কের মানচিত্র তৈরির এমন সুযোগ দিয়েছে, যা একসময় কল্পনাতেই ছিল।
অপটোজেনেটিকস এমন এক পদ্ধতি, যাতে আলো ফেলে জীবন্ত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ চালু বা বন্ধ করা যায়। এর মূলে আছে এক ধরনের শৈবালের আলো-সংবেদী প্রোটিন। শৈবাল এই প্রোটিন দিয়ে আলোর দিকে এগোয়। বিজ্ঞানীরা এই প্রোটিন স্নায়ুকোষে বসিয়ে কোষটিকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় বের করেন। এর ফলে বোঝা সম্ভব হয়, মস্তিষ্কের কোন কোষ কোন কাজের জন্য দায়ী। স্মৃতি, অনুভূতি আর আচরণ কীভাবে তৈরি হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এই পদ্ধতি এখন গবেষকদের বড় হাতিয়ার। আগে মস্তিষ্কের কোনো অংশ নিয়ে পরীক্ষা করতে হলে পুরো এলাকার কোষ একসঙ্গে উদ্দীপিত করতে হতো। নতুন পদ্ধতিতে বেছে বেছে নির্দিষ্ট কোষকে লক্ষ্য করা যায়, তা-ও মিলিসেকেন্ডের হিসাবে।
নোবেল অ্যাসেম্বলির সেক্রেটারি জেনারেল টমাস পার্লমান বলেছেন, পদ্ধতিটি এখন বিশ্বজুড়ে গবেষণাগারে মস্তিষ্কের রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি জানান, তিন বিজয়ীর সবার সঙ্গেই যোগাযোগ করা গেছে। খবর শুনে তিনজনই একে অন্যের সঙ্গে পুরস্কার ভাগ করে নিতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করেন। তাঁরা একে অন্যকে বন্ধু বলে উল্লেখ করেন। ফোন যখন আসে, তখন ডাইসারথ গভীর রাত পর্যন্ত একটি গবেষণাপত্র নিয়ে কাজ শেষে সবে ঘুমাতে গিয়েছিলেন। চিকিৎসায় নোবেল ঘোষণার পর স্টকহোমের সংবাদ সম্মেলনে পর্দায় তিন বিজয়ীর ছবি দেখানো হয়।
কার্ল ডাইসারথ যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি একাধারে চিকিৎসক ও স্নায়ুবিজ্ঞানী। মস্তিষ্কের স্নায়ুপথ বোঝার নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে তাঁর কাজ পরিচিত। হেগেমান ও নাগেল আলো-সংবেদী প্রোটিনের মৌলিক গবেষণায় পথ দেখিয়েছেন। অনেক বিজ্ঞানী তিনজনের এই কাজকে স্নায়ুবিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখেন। মৌলিক বিজ্ঞানের একটি আবিষ্কার কীভাবে চিকিৎসা গবেষণার চেহারা বদলে দিতে পারে, এই পুরস্কার তার উদাহরণ। হেগেমান ও নাগেলের গবেষণা শুরু হয়েছিল শৈবালের প্রোটিন নিয়ে। পরে ডাইসারথ সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে প্রাণীর মস্তিষ্কে পদ্ধতিটি প্রয়োগের পথ তৈরি করেন।
চিকিৎসায় নোবেল দিয়েই শুরু হলো এবারের নোবেল মৌসুম। ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ধাপে ধাপে অন্য বিভাগের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। মঙ্গলবার পদার্থবিজ্ঞান ও বুধবার রসায়নে পুরস্কার ঘোষণার কথা রয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুরোগের গবেষণা এখনো সীমিত। এমন আবিষ্কার সেই গবেষণার জন্য নতুন দরজা খুলে দেয়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এটি মৌলিক বিজ্ঞানে বিনিয়োগের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। তরুণ গবেষকদের জন্যও বার্তাটি স্পষ্ট: প্রকৃতির ছোট্ট এক শৈবালের রহস্য থেকেও বড় চিকিৎসা গবেষণার পথ তৈরি হতে পারে।












