জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির জন্য তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে দায়ী করে স্থানীয় সরকার মামলা করতে পারবে কি না, এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শুরু হয়েছে। মামলাটির রায় শুধু কলোরাডোর বোল্ডার শহরের একটি মামলার ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে একই ধরনের আরও কয়েক ডজন মামলার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সোমবার নতুন নয় মাসের বিচারিক কার্যক্রম শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত। এদিন আদালতে শুনানি হয় বোল্ডার শহর ও কাউন্টির করা একটি মামলায়। মামলায় তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও কানাডাভিত্তিক সানকর এনার্জির বিরুদ্ধে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতীতে হওয়া এবং ভবিষ্যতে হতে পারে, এমন বিভিন্ন ক্ষতির জন্য কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করছে।
বোল্ডারের অভিযোগ, জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন তীব্র হয়েছে এবং এ বিষয়ে ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার মতো কর্মকাণ্ডও কোম্পানিগুলো করেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এই মামলার শুনানিতে নির্ধারণ করা হচ্ছে না। মূল প্রশ্ন হলো, রাজ্য ও স্থানীয় সরকারগুলো এ ধরনের মামলা করার আইনি সুযোগ রাখে কি না।

তেল কোম্পানির যুক্তি কী
এক্সনমোবিল ও সানকর এনার্জি যুক্তি দিয়েছে, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ফেডারেল সরকারের কর্তৃত্ব রয়েছে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় পরিবেশ আইন স্থানীয় বা রাজ্য পর্যায়ের এমন মামলা করার সুযোগ সীমিত করে।
কোম্পানিগুলোর পক্ষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনও অবস্থান নিয়েছে। তাদের বক্তব্য, বোল্ডারের মামলা চলতে দেওয়া হলে দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও শহর একই ধরনের মামলা করতে পারে। এতে একই কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আইনি দাবি উঠবে এবং জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ওপর ব্যাপক আইনি চাপ তৈরি হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস শুনানিতে দুই পক্ষকেই কঠিন প্রশ্ন করেন। একদিকে তিনি জানতে চান, অন্য ক্ষেত্রগুলোতে রাজ্যের আদালত সীমান্তের বাইরে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের প্রভাব নিয়ে মামলা চালাতে পারলে জলবায়ু মামলার ক্ষেত্রে তা কেন ভিন্ন হবে। অন্যদিকে বোল্ডারের আইনজীবীকে তিনি প্রশ্ন করেন, শহরটির পক্ষে রায় গেলে দেশের প্রায় প্রতিটি রাজ্যের কোনো না কোনো পৌরসভা একই ধরনের মামলা করলে পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ৬০ সরকার মামলা করেছে
এক্সন ও সানকরের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬০টি রাজ্য ও স্থানীয় সরকার জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির বিরুদ্ধে এ ধরনের কয়েক ডজন মামলা করেছে। এসব মামলায় মোট ক্ষতিপূরণের দাবি কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তাই সুপ্রিম কোর্ট যদি তেল কোম্পানিগুলোর পক্ষে রায় দেয়, তাহলে এসব মামলার অনেকগুলোই খারিজ হয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হতে পারে। আর বোল্ডারের পক্ষে রায় হলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে আরও মামলা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আদালতে মতভেদের ইঙ্গিত
সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে ছয়জন রক্ষণশীল ও তিনজন উদারপন্থী বিচারপতি রয়েছেন। তবে এই মামলায় রক্ষণশীল বিচারপতি স্যামুয়েল আলিটো নিজেকে প্রত্যাহার করেছেন। ফলে মামলাটির রায় দেবেন আটজন বিচারপতি।
আলিটোর আর্থিক নথি অনুযায়ী, কয়েকটি তেল ও গ্যাস কোম্পানির শেয়ার তাঁর মালিকানায় রয়েছে। তবে এক্সনমোবিল বা সানকর এনার্জির শেয়ার তাঁর নেই।
শুনানিতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের কাছেই বিচারপতিরা কঠিন প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে আদালত শেষ পর্যন্ত কোন অবস্থান নেবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়। এমনকি আট বিচারপতির মধ্যে সমান চার-চার ভোট হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকতে পারে।
রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট কাভানাফ তেল কোম্পানিগুলোর যুক্তির প্রতি তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল অবস্থান দেখান। তিনি বলেন, আদালতের আগের রায়গুলো থেকে আন্তঃরাজ্য বায়ু ও পানি দূষণের বিষয়গুলো ফেডারেল আইনের আওতায় পড়ার বিষয়টি বেশ স্পষ্ট।
অন্যদিকে উদারপন্থী বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র প্রশ্ন তোলেন, ফেডারেল ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট থাকার কারণে কেন রাজ্য আইনের অধীনে এ ধরনের মামলা করার সুযোগ থাকবে না। তিনি মনে করিয়ে দেন, ক্লিন ওয়াটার অ্যাক্টের ক্ষেত্রে আদালত রাজ্য আইনের অধীনে কিছু ধরনের মামলা চলার সুযোগ রেখেছে।
বিচারপতি কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসনও মামলাটি এখনই সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত হস্তক্ষেপের পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, মামলাটির আরও কিছু বিষয় নিম্ন আদালতে নিষ্পত্তির প্রয়োজন হতে পারে।

ক্ষতির তালিকায় আগুন, খরা ও বন্যা
বোল্ডার কর্তৃপক্ষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের ওপর যে ব্যয় তৈরি হচ্ছে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ চাচ্ছে। এর মধ্যে অবকাঠামো মেরামত, জরুরি ব্যবস্থাপনা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাবের মতো খরচ রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত দাবিগুলোর মধ্যে দাবানল, খরা ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, এ বৈজ্ঞানিক বিষয়টি জলবায়ু-সংক্রান্ত মামলাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
তবে তেল কোম্পানিগুলো বলছে, এসব বৈশ্বিক জলবায়ু প্রভাবের জন্য তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা চালানোর অনুমতি দেওয়া হলে তা রাজ্য ও স্থানীয় সরকারের ক্ষমতার সীমা অনেক বাড়িয়ে দেবে।
অন্যদিকে বোল্ডারের পক্ষের যুক্তি হলো, স্থানীয় সরকারগুলো তাদের নিজস্ব এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া বাস্তব ও আর্থিক ক্ষতির জন্য আইনি প্রতিকার চাইতে পারবে। এ কারণে মামলাটি শুধু পরিবেশ আইন নয়, রাজ্য ও ফেডারেল সরকারের ক্ষমতার সীমা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।

রায়ের দিকে নজর বিশ্বজুড়ে
জ্বালানি কোম্পানি ও তাদের সমর্থক কয়েকটি রাজ্য গত দুই দশকে জলবায়ু দায় এবং ফেডারেল পরিবেশ আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বেশ কিছু মামলায় তুলনামূলকভাবে ভালো ফল পেয়েছে। ফলে বোল্ডারের মামলা তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
সুপ্রিম কোর্ট যদি তেল কোম্পানিগুলোর পক্ষে যায়, তাহলে জলবায়ু ক্ষতির জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির বিরুদ্ধে স্থানীয় ও রাজ্য পর্যায়ের আইনি পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত হতে পারে। বিপরীতে বোল্ডারের অবস্থান টিকে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের মামলার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং বিপুল আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি সামনে আসতে পারে।
আদালতের সিদ্ধান্ত আগামী বছরের জুনের মধ্যে আসতে পারে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দায় কার ওপর কতটা বর্তাবে এবং স্থানীয় সরকারগুলো সেই ক্ষতির জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবে কি না, এ প্রশ্নের উত্তর এখন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের হাতে।












