ইরানের সম্ভাব্য ড্রোন হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটি থেকে প্রায় এক ডজন বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সংবেদনশীল সামরিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি ও এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। একাধিক গোয়েন্দা সূত্রে হামলার সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়ার পর সপ্তাহান্তে রয়্যাল এয়ার ফোর্স ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়।
ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন ২০২৫ সালের জুনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যে ধরনের ব্যাপক ড্রোন হামলা চালিয়েছিল, সম্ভাব্য ইরানি হামলাতেও তেমন কৌশল ব্যবহারের আশঙ্কা ছিল। ওই হামলায় শতাধিক ছোট সশস্ত্র ড্রোন পণ্যবাহী ট্রাকে করে রাশিয়ায় ঢোকানো হয়েছিল এবং পরে সেগুলো বিমানঘাঁটির কাছে ব্যবহার করা হয়। এতে রাশিয়ার দীর্ঘপাল্লার বোমারু বহরের আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়েছিল।
ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে সন্দেহজনক তৎপরতা
বোমারু বিমানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে। ওই সময় ঘাঁটির বাইরে সাদা রঙের ভ্যানে থাকা পাঁচ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। তাদের কাছে ড্রোন বা বিস্ফোরক পাওয়া না গেলেও পেট্রোল পাওয়া যায়। পরে আরও একজনকে আটক করা হয়। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা সন্দেহ প্রকাশ করেন, ইরান তাদের অর্থ দিয়ে থাকতে পারে। তবে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা তখনও স্পষ্ট হয়নি।

পুলিশের তদন্তে পরে সপ্তম একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। লন্ডনে ২২ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ নাগরিককে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনার সন্দেহে আটক করা হয়েছে বলে জানায় ব্রিটিশ পুলিশ।
ব্রিটিশ এক কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তারের ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করলেও বড় ধরনের ড্রোন হামলার সম্ভাবনাই শেষ পর্যন্ত বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নিশ্চিত করেছেন যে হুমকির কারণেই বিমানগুলো সরানো হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিদ্ধান্তটিকে অতিরিক্ত সতর্কতার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমানগুলো ব্রিটেন থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য ঘাঁটি থেকে প্রয়োজন হলে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সক্ষমতা বহাল রয়েছে।
ড্রোন হামলার নতুন ঝুঁকি
ব্রিটেনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি ষড়যন্ত্রের সন্ধান মিলেছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, যুক্তরাজ্যের একটি উচ্চনিরাপত্তার সামরিক ঘাঁটিতে সমন্বিত ড্রোন হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মূলত অপেক্ষাকৃত সীমিত নাশকতা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে অপরাধী নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সহিংস কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনাকে ঘিরে। ফেয়ারফোর্ডের ঘটনায়ও গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের গাড়ি থেকে বিস্ফোরক বা অন্য কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির উপপরিচালক আলি ভায়েজের মতে, যদি ওই তৎপরতার পেছনে ইরান থেকে থাকে, তাহলে এটি ব্রিটিশ ভূখণ্ডে এমন একটি অভিযানের প্রাথমিক ধাপ নেওয়ার সক্ষমতার ইঙ্গিত হতে পারে। হামলা বাস্তবে না ঘটিয়েও এর মাধ্যমে ইউরোপের মাটিতে যুদ্ধক্ষেত্র সম্প্রসারণের সক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।

ফেয়ারফোর্ড থেকে বি-১ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ইউরোপের সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগও সামনে এনেছে। তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন এখন ব্যয়বহুল ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক সরঞ্জামের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক হাজার ডলারের ড্রোনের হামলায় বিলিয়ন ডলারের বোমারু বিমান বহর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের সামরিক গবেষক রবার্ট টোলাস্টের মতে, হামলায় বিমান ধ্বংস না হলেও কোনো ঘাঁটির দুর্বলতা প্রকাশ পেলে তা বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতেই এখন একই ধরনের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ফেয়ারফোর্ডের দীর্ঘ সামরিক ইতিহাস
ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে ব্যবহার করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৪ সালের ৬ জুন নরম্যান্ডিতে ডি-ডে অভিযানে প্যারাট্রুপার নামানোর অভিযানও এই ঘাঁটি থেকে পরিচালিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ঘাঁটির সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে বোমা হামলার অভিযানও যুক্ত হয়েছে।
ইউক্রেনের রাশিয়ায় চালানো বড় ড্রোন অভিযানের পাশাপাশি ইসরায়েলও ইরানের ভেতরে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে। সাধারণ যানবাহনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা ড্রোন ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল। এর ফলে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ১২ দিনের বিমান হামলার পথ তৈরি হয়।
তদন্ত এখনও চলছে

ফেয়ারফোর্ডের ঘটনার পর যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত হুমকির মাত্রা ‘গুরুতর’ পর্যায়েই রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তদন্তে এমন কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি, যা থেকে বলা যায় যে ইরান বা অন্য কোনো প্রতিপক্ষ ঘাঁটির নিরাপত্তা ভেদ করে বিস্ফোরক ড্রোন বা অন্য কোনো সরঞ্জাম স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল।
ব্রিটিশ সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মুঠোফোন, গাড়ির ড্যাশবোর্ড ক্যামেরা ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করছে। তাদের সঙ্গে ইরানের কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, সেটিই তদন্তের অন্যতম বিষয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সাদা ভ্যানে করে ফেয়ারফোর্ডের কাছে অবস্থান করছিলেন। গাড়িগুলোতে বিস্ফোরক না পাওয়া গেলেও পেট্রোলভর্তি পাত্র পাওয়া যায়। এ কারণে ভ্যানগুলোতে আগুন লাগানোর কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।
তদন্তকারীরা আরও খতিয়ে দেখছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের একজন কেন ব্রিটেনের জরুরি নম্বরে ফোন করেছিলেন। তিনি গ্রেপ্তারের প্রায় এক ঘণ্টা আগে রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে ফোন করেছিলেন। পরে স্থানীয় একজন নাগরিকও একই ঘটনা সম্পর্কে ফোন করেন। ওই ব্যক্তি পরিকল্পনার পুরো বিষয় জানতেন কি না, অথবা সামরিক স্থাপনার কাছে পৌঁছে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ফোন করেছিলেন কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
তবে ঘটনাটির সামরিক প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমান ইংল্যান্ডের পরিবর্তে দক্ষিণ ডাকোটা থেকে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পাঠালে অতিরিক্ত জ্বালানি ও উড্ডয়ন সময় প্রয়োজন হবে। ইংল্যান্ডের কটসওল্ডস অঞ্চল তেহরান থেকে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ মাইল কাছাকাছি হওয়ায় ফেয়ারফোর্ডের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক ব্রিটিশ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পিটার রিকেটসের মতে, ফেয়ারফোর্ড থেকে বিমান সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ইরান নিজেদের পক্ষে সাফল্য হিসেবে দেখাতে পারে।
ফেয়ারফোর্ডের ঘটনা তাই শুধু একটি ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নয়; আধুনিক যুদ্ধে কম খরচের ড্রোন কীভাবে ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোর জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে, সেটিও সামনে এনেছে।












